ঝ হঠাৎ বললেন, আজ তসলিমার শহর থেকে এগ্রিকালচার ইউনিভার্সিটির ১৮০ জন শিক্ষক তসলিমার ফাঁসি দাবি করেছেন।
–তসলিমার কোনও বাড়ি নেই, শহর নেই, দেশ নেই। আমি মন্তব্য করি।
জ আর ঝ দুজনেই পরস্পরের দিকে চেয়ে ছোট ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
তিরিশ তারিখে কী হবে জ অনুমান করতে পারছেন না। একটা কি জানি কি হয় কি জানি কি হয় পরিবেশ পুরো দেশে। একাত্তরের মত মনে হয় জ র কাছে, একাত্তরের মার্চ মাসটির মত ভয়াবহ, অনিশ্চিত। যেন সত্যি সত্যি একটা যুদ্ধ লাগছে।
ঝ সিগারেটের ধোঁয়া শূন্যে ছেড়ে দিয়ে বলেলেন, দুঃখ এই, এবারের যুদ্ধে বড় শক্তিটি মৌলবাদী গোষ্ঠীর, আর ছোট শক্তি প্রগতিশীলদের।
জ মাথা নাড়েন, আসলে তসলিমা ইস্যুটিই বুঝিয়ে দিল মৌলবাদীরা কত বড় শক্তি এ দেশে। বদমাশগুলো কি করে সারা দেশ কাঁপিয়ে তুলছে.. । আমরা তো ভেবেছিলাম মৌলবাদী দল নিতান্তই ছোট কিছু। পাত্তাই দিই নি কখনও।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে জ বললেন, এই দেশ মৌলবাদীদের হাতে চলে যাচ্ছে, এ কথা আমি বিশ্বাস করতে পারি না।
কে পারে বিশ্বাস করতে! এসব তো অবিশ্বাস্য ঘটনা। ঝ বলেন।
ঝ নিশ্চিন্তে অনেকক্ষণ বসতে পারেন এ ঘরে আজ রাতে। কারণ বাড়ির লোকেরা জানে তাঁর কাছে একজন অতিথি এসেছেন। ঝ আড়াইতলার ছোট ঘরটিতে বসে তাঁর সঙ্গে কথা বলছেন। ঝ এমনকী নিচ থেকে ট্রেতে করে খাবার নিয়ে এলেন। অতিথির জন্য খাবার। কারও ভ্রু কুঞ্চনের কিছু নেই।
জ যখন চলে যাচ্ছেন তাঁকে বড় কাতর কণ্ঠে অনুরোধ করি একবার যেন তিনি শান্তিনগরে আমার বাড়িতে যান। আমার বাবা মা ভাইবোনেরা কেমন আছে, বেঁচে আছে কি না দেখে আসেন।
জ কথা দেন তিনি যাবেন। কথা দেন তিনি আবার আসবেন আমাকে দেখতে।
৩. অতলে অন্তরীণ – ২৪
সাতাশ জুন, সোমবার
–এই মেয়ে, তুমি তো মরে যাচ্ছে!!
–মরে যাচ্ছি, কই নাতো! এখনও তো আমার নাড়ি চলছে ভাল। শ্বাসও নিচ্ছি। মরছি বলে তো মনে হয় না। তাছাড়া রোগ তো কিছু নেই যে মরব।
–কি রোগ জানি না। তবে শখের মরা অনেকে তো মরতে চায়, সেরকম মরছ তুমি। –মরলে তো ভালই, একরকম বাঁচা। তখন আর কোনও দুশ্চিন্তা থাকবে না যে কেউ বুঝি আজই রামদা দিয়ে আমার গলাটা কেটে ফেলল।
–দুশ্চিন্তা কোরো না, বাঁচো। বাঁচার মত চমৎকার জিনিস আর নেই।
–আমার কাছে কিন্তু তা মনে হয় না। বাঁচাটাকে এখন আমার বড় দুঃসহ লাগে।
–এখন মনে হচ্ছে। কিন্তু ঝড় ঝঞ্ঝা কেটে গেলে তখন কিন্তু মনে হবে না।
–কাটবে কি কখনও?
–জানি না। কিন্তু যদি কাটে! আচ্ছ!, তুমি তো আগে কখনও এমন হতাশ ছিলে না কিছুতে! সবসময়ই একটি ্ আশা নিয়ে, একটি স্বপ্ন নিয়ে প্রচণ্ডভাবে বেঁচে থাকতে। চারদিকে এত শত্রুতা, এত হুমকি, তার পরও তো পরোয়া করোনি।
–এখনের সঙ্গে কি তখনের তুলনা চলে!
–হ্যাঁ তা ঠিক, এখন অন্যরকম। এখন তোমার কিছুতেই ঘর থেকে এক পা বেরোনো চলবে না। এখন বাইরের কারও জানা চলবে না, তুমি কোথায় আছো।
–এই জীবন আমার জঘন্য লাগছে। এই জীবন থাকার চেয়ে না থাকা ভাল। এই ইঁদুরের জীবন আমি আর যাপন করতে পারছি না। ভয়ের চোটে গর্তে লুকিয়ে আছি, এ আমি ভাবতেই পারি না। আমি তো কখনও এমন ছিলাম না। কখনও তো লুকোইনি কোথাও। জীবনে তো কম বিপদ আসেনি।
–তোমার তো উপায় নেই আর। আগের বিপদ আর এখনকার বিপদে অনেক পার্থক্য আছে। অনেক কিছু ভাল না লাগলেও মেনে নিতে হয়। তোমাকে মেনে নিতে হবে জীবনটির জন্য। জীবনের মত মূল্যবান কিছু তো আর নেই। কষ্ট সহ্য কর। সহ্য কর আগামীর কথা ভেবে।
–আমার কোনও আগামী আছে বলে আমার মনে হয় না।
–বাজে কথা বোলো না। এখন তোমার খারাপ সময় যাচ্ছে বলে ভেবো না সবসময় সময় খারাপই যাবে। কত বড় বড় নেতারা এভাবে বছরের পর বছর কাটিয়েছেন। কমুনিস্ট পার্টি যখন নিষিদ্ধ ছিল, তখন বড় বড় কমুনিস্ট নেতা এভাবেই লুকিয়ে থেকেছেন। এই কদিনে তুমি অতিষ্ট হয়ে গেলে চলবে কেন!
–আমি তো বড় কোনও রাজনৈতিক নেতা নই। আমি সাধারণ এক মানুষ। সাধারণ কিছু লেখা লিখেছি।
–না, তুমি সাধারণ লেখা লেখোনি। সাধারণ কথা লিখলে দেশজুড়ে তোমার বিপক্ষে এমন আন্দোলন হত না।
–আমার পক্ষে কেউ নেই। এই যে এখন মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলন হচ্ছে, এরা তো আমার পক্ষের কেউ নয়। কেউ আমাকে পছন্দ করে না।
–কে বলেছে! তোমার পক্ষে অনেক মানুষ আছে এ দেশে।
–বারো কোটি লোকের মধ্যে বারো জন পক্ষে থাকলে কী লাভ!
–লাভের কথা ভাবো কেন! আগে তো এমন করে ভাবতে না! আগে তোমার নিজের যা ইচ্ছে করত, তাই করতে। লাভ হবে বলে তো কিছু করনি। লাভ ক্ষতি নিয়ে মোটেও ভাবোনি।
–আগে হয়ত বোকা ছিলাম, তাই কিছু ভাবিনি।
–না। এখন তুমি বোকামো করছ। এখন হিসেব করছ। কেউ যদি না ভালবাসে তোমাকে, এভাবে আশ্রয় পাচ্ছে! কি করে?
–সে তো গুটিকয় মানুষ মাত্র..
–তুমি কি করে আশা কর তুমি যেসব কথা লিখেছো, তাতে লক্ষ লক্ষ মানুষ তোমাকে সমর্থন করবে! তোমার ভাগ্য ভাল যে কিছু লোক এখনও তোমার বাক স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলছে। তুমি তো সংগ্রামী মেয়ে ছিলে, কখনও তো আপোস করনি, কখনও সত্য চাপা দিয়ে রাখোনি, কখনও পাছে লোকে কিছু বলবে বলে কিছু করা থেকে নিজেকে বিরত রাখোনি। এখন তুমি যদি এভাবে নিস্তেজ হয়ে পড়ো, ভয়ে চুপসে থাকো, মরার আগেই যদি মরেই যাও, তবে তো বদমাশ মোল্লাদেরই জয় হবে।
