অথচ ইসলামের শিক্ষা হচ্ছে পরমতসহিষ্ণুতা। কারও মতের বা ধর্মের সঙ্গে অমিল হলেই তাকে হত্যা করতে হবে এমন কথা ইসলামে নেই। বরং পবিত্র কোরান মানুষকে যে কোনও ধর্ম গ্রহণ এবং বর্জন করার স্বাধীনতা প্রদান করেছে। যেমন ধর্মের ব্যাপারে কোনও প্রকার জোর জবরদস্তি নাই(সুরা বাকারা), যার ইচ্ছা হয় বিশ্বাস করুক আর যার ইচ্ছা হয় অস্বীকার করুক (সুরা কাহাফ), উপদেশ গ্রহণ করে যে চায় সে তার প্রভুর পথে চলতে পারে(সুরা দহর), ঈমান আনার জন্য কাউকে বাধ্য করা যায় না(সুরা ইউনুস)। এরকম আরও অজস্র দৃষ্টান্ত হাদীস শরীফে এবং মহানবীর (সাঃ) জীবনাদর্শে খুঁজে পাওয়া যাবে। পবিত্র মককা বিজয়ের পর মহানবী ইসলামের কট্টর শত্রুদেরও হত্যা কিংবা কোনওধরনের নির্যাতন করার অনুমতি দেননি। বরং তিনি সকল ধর্মের ও মতের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন সেদিন। আর বিদায় হজ্বের সেই মহামূল্যবান সতর্কবাণী তো সকলেরই জানা। আমাদের প্রিয় নবী স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, তোমরা ধর্ম লইয়া বাড়াবাড়ি করিও না। ধর্ম লইয়া বাড়াবাড়ি অনেক জাতির ধ্বংসের কারণ হইয়াছে।
ধর্ম বিশ্বাস থেকে বিচ্যূত হওয়া বা ধর্মের বিরুদ্ধাচরণের জন্য মহানবী (সাঃ) কখনই কোনও ব্যক্তিকে হত্যা বা অন্য কোনওরূপ শাস্তির আদেশ দেন নি। ধর্মের অবমাননাকারীদের বিরুদ্ধে কোনওরূপ জাগতিক শাস্তির বিধান থাকলে মহানবী (সাঃ) অবশ্যই তা পালন করতেন। কেননা ইসলামের সম্মান ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার ক্ষেষেন নবী করীম (সাঃ) ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। তিনি যে পন্থায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা এবং তা রক্ষা করেছেন সে পদ্ধতি বাদ দিয়ে অশান্তি ও অরাজকতা সৃষ্টিকারী সমস্ত কার্যকলাপপ্রকৃত মুসলমানদের কাছে কখনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ইসলাম রক্ষা অবশ্যই ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শের ভিত্তিতেই করতে হবে। তা না হলে এটা ইসলামের জন্য শুধু দুর্নামই বয়ে আনবে না, বরং সমূহ ক্ষতিরও কারণ হবে। আমরা যেন ভুলে না যাই যে আল্লাহর প্রবর্তিত ধর্মের, জাতির এবং মানবতার প্রধান শত্রু হচ্ছে প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদী চক্র। ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা থেকে এই মৌলবাদীদের অবস্থান বহু দূরে। ইসলামের দোহাই তুলে এরা তাদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করতে তৎপর – যা তারা ১৯৭১ এ হাসিল করতে পারেনি। এই অপশক্তি আবারও একটি গণহত্যাযজ্ঞের ষড়যন্ত্রে মেতেছে। অতএব, এই ভণ্ড, নরঘাতক, ধর্ম ব্যবসায়ী, ধর্মের অপব্যাখ্যাকারী এবং ফতোয়াবাজ চক্রকে এখনই প্রতিহত করা প্রতিটি দেশপ্রেমিক ও ধর্মপ্রাণ নাগরিকের পবিত্র দায়িত্ব বলে আমরা মনে করি।
সচেতন লেখক, শিল্পী ও নাগরিক সমাজ।
ঝ আপিস থেকে ফিরে কয়েকটি লিফলেট দিলেন আমাকে। শহরে বিলি হচ্ছে লিফলেট, তাঁর হাতেও পড়েছে। সচেতন লেখক, শিল্পী ও নাগরিক সমাজের এই লিফলেটটি কারা ছেপেছে ঝ কিছু জানেন কি না জিজ্ঞেস করেছিলাম। ঝ জানেন না। আরেকটি লিফলেট সর্বহারা পার্টির। দেশে একটিই আণ্ডারগ্রাউণ্ড দল আছে, সেটি এই সর্বহারা পার্টি। শামীম সিকদারের ভাই সিরাজ সিকদার ছিলেন সর্বহারা পার্টির নেতা, তাঁকে খুন হতে হয়েছে ৭৪ সালে। সর্বহারা পার্টির লিফলেটটি আর সব লিফলেট থেকে অন্যরকম। এখানে ধর্মের ভাল ভাল কথা ব্যবহার করে ধর্মীয় মৌলবাদীদের দমন করার কোনও চেষ্টা নেই। আণ্ডারগ্রাউণ্ড বলেই বোধহয় সম্ভব হয়েছে ওদের পক্ষে এই অবস্থান নেওয়া। লিফলেটটির শিরোনাম ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ নিপাত যাক! সাম্রাজ্যবাদ ও বড় বু−র্জায়া নিপাত যাক। এরপর ম্যালা কথা। ধর্মীয় ফ্যাসিস্টরা কি করছে দেশে, তার বর্ণনা। এরপর বলা হচ্ছে, ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীরা কোনও বিচ্ছিত শক্তি নয়, তারা এই প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্রযন্ত্র ও শাসকশ্রেণীরই অংশ। ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের পরিণতি কী হতে পারে তা দেখা যায় সারা পৃথিবী জুড়ে। এই উপমহাদেশে গত ৫০ বছরে এর বলি হয়েছেন লক্ষ লক্ষ হিন্দু মুসলিম সাধারণ জনগণ। ভারত, আফগানিস্তান, ইরান, বসনিয়া, প্যালেস্টাইন আজ হিন্দু মুসলিম খৃস্টান ও ইহুদি মৌলবাদীদের হিংস্র থাবায় জর্জরিত। ধর্ম যাই হোক না কেন, সবদেশের ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীরা জাত ভাই। এদেশে এদের আন্দোলনের পরিণতি হবে হিন্দু মুসলিম, শিয়া সুন্নী, কাদিয়ানী সুন্নী দাঙ্গা, জনগণের উপর লুটপাট, খুন, নারীদের অধিকার হরণ, বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গির উপর নিপীড়ন এবং সাধারণভাবে জনগণের মত প্রকাশের গণতান্ত্রিক অধিকার সম্পূর্ণভাবে হরণ। এদের পূর্বসুরীরাই বিজ্ঞানী ব্রুনোকে বিজ্ঞান প্রচারের দায়ে পুড়িয়ে হত্যা করেছিল, গ্যালিলিওকে বন্দী করেছিল, বেগম রোকেয়া, নজরুল, আরজ আলী মাতব্বরকে নির্যাতন করেছিল, অগণিত সমাজ বিপ্লবীকে নিপীড়ন হত্যা করেছিল।
তাই, এদেশের শ্রমিক, কৃষক, গরিব মানুষ ও প্রগতিশীল জনগণকে এই ধর্মান্ধ ধর্মব্যবসায়ী ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে যা ধর্মীয় মৌলবাদের পূর্ণ উচ্ছেদ ঘটাবে। সেটা সম্ভব শুধুমাত্র এই ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্র ও শাসকশ্রেণীকে উচ্ছেদ করেই – কারণ, এই রাষ্ট্রযন্ত্র, বড় ধনী শ্রেণী ও সাম্রাজ্যবাদী – সম্প্রসারণবাদীরাই বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামের ধর্মীয় মৌলবাদকে টিকিয়ে রাখছে। আসলে ধর্মীয় মৌলবাদীরা এদেরই অংশ।.. ধর্মীয় ফ্যাসিস্টরা ব্যাপক দাঙ্গা ও নিপীড়নের প্রস্তুতি চালাচ্ছে। জনগণের ওপর সশস্ত্র হামলা তারা শুরু করে দিয়েছে। তাই, পাল্টা বল প্রয়োগে ও অস্ত্র হাতে তাদের মোকাবেলা করতে হবে। সর্বহারা পার্টি আহবান জানাচ্ছে, এই ফ্যাসিবাদীদের উপর গেরিলা কৌশলে সশস্ত্র আক্রমণ করুন। এবং জঙ্গী গণহামলা চালান তাদের আস্তানা ও স্বার্থ কেন্দ্রগুলোর উপর। গোলাম আযম, মাওলানা মান্নান, সাইদী, নিজামী, বায়তুল মোকাররমের রাজাকার ইমামদের মত বদমাইশ পাণ্ডাদের গেরিলা কায়দায় খতম করুন। সংগ্রাম, ইনকিলাবের মত পত্রিকাগুলোর উপর সশস্ত্র আক্রমণ চালান, গণহামলা করুন। পুড়িয়ে দিন তাদের অফিস আস্তানাগুলো। যেমন কুকুর তেমন মুগুর ছাড়া প্রগতিশীল জনগণের অন্য কোনও উপায় নেই।
