–কি কাণ্ড, দেখতো! ঝ সিগারেটের একটি প্যাকেট বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, এটা রাখো তোমার কাছে। টেনশন হলে খাবে।
–রাত কত?
–দেড়টা বাজে। ঝ নাক কুঁচকে বললেন, এ বাড়িতে একদিনও তুমি গোসল করেছো?
–না।
–কেন করোনি? সেই যে জামাটা পরে আছো, এটা তো পাল্টাচ্ছে! না।
–কল ছাড়লে শব্দ হয় বলে ..
–ঠিক আছে। আমি এখন আছি এখানে। গান ছেড়ে দিচ্ছি। তুমি গোসল করে জামা পাল্টাও। তোমার গা থেকে জামা থেকে দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে।
ঝর আদেশ মেনে আমি শরীরটি উঠিয়ে গোসলখানায় নিই। আয়নায় নিজেকে দেখে চেনা যায় না। চোখের নিচে কালি, মাথার চুলগুলো আঠা আঠা, জট বাঁধা।
শরীরটিকে জলের নিচে ফেলি। ইচ্ছে করে না গোসল করতে। কী লাভ গোসল করে, গা পরিষ্কার থেকে। মরে গেলে এই শরীর দিয়ে দিয়ে কী হবে! নিজের জন্য নয়, গোসলটি আমি ঝর জন্য করি। গায়ের ঘামের গন্ধ দূর করে যখন ফিরি ঝ বললেন, চল ছাদে যাবে আমার সঙ্গে।
–ছাদে? বল কি! কেউ যদি দেখে ফেলে!
ঝকে এত আপন মনে হয় যে বলেই ফেলি তাঁকে তুমি।
–চল। এই রাতে কেউ টের পাবে না।
ঝ বারান্দার দরজা খুলে আমাকে নিয়ে ছাদে উঠলেন। ছাদে ওঠা মানে সিঁড়ি বেয়ে কোনও সত্যিকার ছাদে ওঠা নয়। টালির খাড়া ছাদে বেয়ে ওঠা। টাল সামলাতে না পারলে পড়ে গিয়ে ভর্তা হতে হবে। ঝ তরতর করে বেয়ে ওঠেন। অন্ধকারে পেছন পেছন আমি। ছাদে বসে তারা ভরা আকাশ দেখি। কতকাল আকাশ দেখি না। কতকাল তারা দেখি না। মরে গেলে, কে যেন বলেছিল, মানুষ আকাশের তারা হয়ে যায়। আমিও কি একটি ছোট্ট তারা হয়ে আমার দেশটিকে দেখব! তারা হয়ে দেখি টালির ছাদের ওপর বসে থাকা আমাকে, এক বিন্দু আমাকে। বুক ভরে শ্বাস নিই। গরমের রাতে অবকাশের ছাদে উঠে হাওয়া খেতে কি যে ভাল লাগত। আমার জীবন থেকে অবকাশ, শান্তিনগর, বাবা মা, ভাইবোন, বন্ধুবান্ধব,সাহিত্যিক সাংস্কৃতিক জগত সব হারিয়ে গেল। আমি এখন পলাতক আসামী। যে কোনও মুহূর্তে আমাকে খুন করা হবে। এই এত সুন্দর এত আশ্চর্য সুন্দর পৃথিবীটিতে আমি আর বেঁচে থাকতে পারব না। আমাকে বেঁচে থাকতে কেউ দেবে না। একবার মরে গেলে আমি তো আর কখনও কিছুতেই আবার ফিরে আসতে পারব না এই পৃথিবীর কোথাও। আমি মরে গেলে পৃথিবী যেমন চলছে, তেমন চলতে থাকবে। সবাই থাকবে, কেবল আমিই থাকব না। প্রতিরাতে এরকম আকাশে তারা ফুটবে, কেউ কেউ রাত জেগে তারা দেখবে এই আমি যেমন দেখছি, কেবল আমিই আর দেখব না। গ্রীষ্ম গিয়ে বর্ষা আসবে, বৃষ্টির রিমিঝিমি শব্দ আর কোনওদিন শুনব না, মার রান্না করা ভুনা খিচুরি আর ইলিশ ভাজাও আর খাওয়া হবে না। শরতের আকাশের আশ্চর্য সুন্দর মেঘও আমার আর দেখা হবে না। শীত আসবে, চারদিকে উৎসব শুরু হবে, ভোরের শিউলি ফুলের ঘ্রাণ নেব না, ছোটবেলার মত ভাপা পিঠে আমার আর খাওয়া হবে না, বসন্তে ফুল ফুটবে, কৃষ্ণচুড়ার লালে ছেয়ে যাবে দেশ, দেখা হবে না আমার। মৃত্যু এত ভয়ংকর কেন, এত জঘন্য কেন, এত নিষ্ঠুর কেন! হঠাৎ ছাদে বসে গায়ে ঝিরিঝিরি হাওয়া পেতে পেতে আমার এত ভাল লাগে যে আমার মরতে ইচ্ছে করে না। ঝ কে বলি, আমার মরতে ইচ্ছে করছে না।
ঝ এগিয়ে এসে আমার একটি হাত স্পর্শ করেন। ঝর হাতটি আমি শক্ত করে চেপে ধরি।
৩. অতলে অন্তরীণ – ২২
পঁচিশ জুন, শনিবার
ধর্মব্যবসায়ী ফতোয়াবাজরা দেশ জাতি মানবতা ও ইসলামের শত্রু
এদের প্রতিহত করুন
ইসলাম শান্তি, ন্যায় ও মানবতার ধর্ম। এ ধর্ম মানুষে মানুষে হানাহানি, সংঘাত, কলহ ওদ্বন্দ্বকে সমর্থন করে না। ধর্মকে নিয়ে বাড়াবাড়ি ও জবরদস্তি ইসলামী আদর্শের পরিপন্থী।বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ধর্মপ্রাণ ও শান্তিপ্রিয়। যুগযুগ ধরে এদেশের মানুষ ধর্ম বর্ণগোত্র নির্বিশেষে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করে আসছে। চেতনাগতভাবে তারা অসাম্প্রদায়িকএবং একে অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় যে চিহ্নিত একটিস্বার্থা−ন্বষী মহল তাদের জঘন্য রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীস্বার্থে ধর্ম ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকেব্যবহার করে আসছে এবং সুকৌশলে এদেশের সরলমতি মানুষকে আত্মঘাতী সংঘাতেরদিকে ঠেলে দেওয়ার অব্যাহত অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এই মহলটিই ১৯৭১ সালে, আমাদেরমহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ইসলাম রক্ষার অজুহাতে লক্ষ লক্ষনিরপরাধ মানুষকে হত্যা, নারীধর্ষণ ও লুণ্ঠনসহ সমগ্র জাতির বিরুদ্ধে নজিরবিহীন এক ধ্বংসযজ্ঞে লিপ্ত হয়েছিল। সেদিনেরসেই বর্বরতার স্মৃতি কোনওদিন এ দেশের মানুষের মন থেকে মুছে যাবে না। বলার অপেক্ষারাখে না এরা ইসলামের কলঙ্ক, জাতির কলঙ্ক এবং মানবতার কলঙ্ক।
ইসলাম ও মানবতার এই চিহ্নিত দুষমনরা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। মনগড়া ফতোয়াবাজির মাধ্যমে একাত্তরের মতই এদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষকে তারা আবারও একটি আত্মঘাতি সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়ার চক্রান্তে মেতে উঠেছে। এই স্বঘোষিত ধর্মরক্ষক শ্রেণী তথাকথিত ধর্ম অবমাননার শাস্তির দাবিতে লেখক, সাংবাদিক, কর্মজীবী নারী, এনজিও এবং দারিদ্র বিমোচন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ জাতীয় উন্নয়নে নিয়োজিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানসমূহের বিরুদ্ধে অপপ্রচার, কুৎসা রটনা ও বোমাবাজি সহ নানাবিধ ধ্বংসাত্মক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। নিরীহ নারী সমাজের ওপর যথেচ্ছ নির্যাতন এবং বিভিন্ন ব্যক্তির ফাঁসির দাবির পাশাপাশি যাকে ইচ্ছে তাকে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে এবং মুরতাদ কাফের ফতোয়া দিয়ে জনজীবনকে দুর্বিসহ করে তুলেছে। ধর্ম রক্ষার অজুহাতে তথাকথিত জেহাদী চেতনার ধুয়া তুলে সমাজে একটি অন্ধ উন্মাদনা ছড়িয়ে দেওয়াই এদের লক্ষ। এরা ধর্মের নামে দেশের উন্নয়ন ও গণতন্ত্রায়ণের প্রক্রিয়াকে নেতিবাচক ধারায় ঠেলে দিতে চাচ্ছে। এরাই একদা বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ইমাম গাজ্জালী, মাওলানা রুমী এবং আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলামকে কাফের ফতোয়া দিয়ে কোতল করার আহবান জানিয়েছিল।
