ভাবি নাক গলালেই বা লাভ কি! আমাকে যে কোনও দিন খুঁজে পেয়ে যাবে পুলিশ অথবা মোল্লার দল। জেলে দেবে অথবা ফাঁসি দেবে। জেলের ভেতরে অথবা বাইরে যে কোনও জায়গায় খুন হব উন্মাদ মোল্লাদের হাতে। নিজের ভবিষ্যতটি আমি বেশ দেখতে পাচ্ছি। পালিয়ে কতদিন বেঁচে থাকতে পারব! বিশাল বিশাল লাঠি হাতে মিছিল হচ্ছে, ওরকম একটি লাঠির একটি ঘা মাথায় খেলেই তো মরে পড়ে থাকব! জীবন আমার ফুরিয়েছে, বুঝি, যতই খোপের মধ্যে বসে থাকি না কেন! জীবনটির জন্য মায়া হতে থাকে! খামোকা ক, ঙ আর ঝ কে কষ্ট দেওয়া। তার চেয়ে নেমে পড়ি রাস্তায়। বলি যে এই আমি, আমাকে যা ইচ্ছে করার তোমাদের কর, করবেই যখন, এখনই কর। এভাবে ইঁদুরের মত বেঁচে থাকতে আর ইচ্ছে করে না, তার চেয়ে মরে যাওয়াই ভাল। একটি অদৃশ্য মৃত্যু এসে আমার পাশে শোয়। আমি মৃত্যুটিকে দেখতে থাকি। মৃত্যুর আপাদমস্তক দেখি, মৃত্যুর স্বাদ গন্ধ নিই। মৃত্যুকে খুব চেনা চেনা লাগে। এই মৃত্যু কতবার যে কাছে এসেছে আমার, কতবার যে পাশে বসে থেকেছে, পাশে শুয়েছে।’
৩০ জুনের হরতাল প্রতিরোধের শক্তি কারও নেই — গতকাল কয়েকশ সভায় সমাবেশে এই বাক্যটি বার বার উচ্চারিত হয়েছে। মুসলমানের এই দেশে কোরানের ইজ্জত রক্ষার জন্য এই হরতাল হচ্ছে। কারও শক্তি নেই হরতাল থামায়। ধর্ম ও দেশদ্রোহিতা নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত তারা প্রয়োজনে রক্ত দিয়ে হলেও আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুয়ত বাংলাদেশ এর সদর দফতরে জরুরি সভা হচ্ছে। মুসলিম লীগ বলেছে, পবিত্র কোরান, ইসলাম ও মুসলমানদের ইজ্জত রক্ষার জন্য এই হরতাল। শায়খুল হাদিস মাওলানা আজিজুল হক বলে বেড়াচ্ছেন, এই হরতালের সঙ্গে দলীয় রাজনীতির কোনও সম্পর্ক নেই, সর্বস্তরের জনগণ এই আন্দোলনে যোগ দিচ্ছে। ছাত্র শিবির সর্বস্তরের ইসলাম বিশ্বাসী ছাত্র জনতাকে এই আন্দোলনে যোগ দিতে বলছে। মাদ্রাসার ইমামরা বলছেন, হরতাল প্রতিহত করতে কোনও নাস্তিক বা ধর্মনিরপেক্ষবাদী ময়দানে এলে তাদেরকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হবে। নাস্তিকরা বাংলাদেশের সকল ধর্মের, জনগণের শষনু। সবাইকে ধর্ম রক্ষার জন্য জেহাদে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। ইসলামের ইজ্জত রক্ষায় আমরা শহীদ হতে চাই। সরকার এখনও কুলাঙ্গার তসলিমাকে গ্রেফতার করতে পারেনি। এই সরকারের ক্ষমতায় থাকার কোনও অধিকার নেই। আমরা আইন তুলে নিতে চাই না, কিন্তু সরকার যদি তাকে গ্রেফতার না করে তবে আমাদের যুবকরা কোনও পদক্ষেপ নিলে সে জন্য সরকারকেই দায়ি থাকতে হবে। ইসলামের প্রশ্নে কোনও আপোস নেই। জাগপা বিক্ষোভ মিছিল করেছে শহরে, ঐতিহাসিক পলাশী দিবস উদযাপন করা হয়েছে, শফিউল আলম প্রধান বলেছেন, জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে এখনই নব্য মীরজাফর, উমিচাঁদ ও ঘসেটি বেগমদের আস্তানা কাশিম বাজার কুঠিতে আঘাত হানতে হবে। ২৩ বছর পর আবারও জাতীয় পুনর্জাগরণ শুরু হয়েছে। ৩০ তারিখের হরতাল কোনও গদি দখল বা হালুয়া রুটির হরতাল নয়। এ হরতাল ধর্মীয় স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষার জন্য। এটা পবিত্র কোরানের মর্যাদা রক্ষার হরতাল। ভারতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে আজাদী পাগল জনতার হরতাল। জানবাজী রেখেও এই সংগ্রাম সফল করতে হবে। এবার হরতাল প্রতিরোধ করতে যাদের মাঠে নামানো হয়েছে দেশবাসী তাদের চেনে। ক্ষমতাসীন দিল্লী লবিকে সতর্ক করে দিয়ে প্রধান বলেছেন, ‘ভারতীয় রাজাকারদের মাঠে নামিয়ে স্বাধীনচেতা ধর্মপ্রাণ মানুষের এ গণবিস্ফোরণকে দাবিয়ে দেয়া যাবে না। তসলিমাগংদের বিচার চাই। তবে যে নেপথ্য শক্তি তসলিমাদের নির্মাণ করে, যে হুকুমত ও কানুন দেশদ্রোহী ধর্মদ্রোহী শক্তিকে প্রশ্রয় দেয় ও লালন করে, দেশপ্রেমিক জনতা এবার তাদের শেকড়ও উপড়ে ফেলবে। দেশপ্রেমিকদের কর্তব্য দেশ বিক্রেতা গাদ্দার ও ধর্মদ্রোহীদের বিষদাঁত চিরতরে ভেঙে দেয়া। পলাশীর পুনরাবৃত্তি আর হতে দেয়া হবে না।’ জাতীয় যুব কমাণ্ড সারা দেশে সন্ত্রাস করে বেড়াচ্ছে, এই দলও শহরে বড় বড় সভা করে বলছে, ‘যারা আমাদের দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ এমনকি মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে রাজনৈতিক বেসাতিতে লিপ্ত রয়েছে, তাদেরকে দেশপ্রেমিক জনতার পক্ষ থেকে প্রতিরোধ করতে হবে। কেননা এরা দেশের প্রকাশ্য শষনুর চেয়েও বিষাক্ত। ৩০ জুনের হরতালে যারা বাধা দেয়ার হুমকি দিচ্ছে তারাই স্বাধীনতার অপ্রকাশ্য দুষমন। তারা স্বাধীনতার স্বপক্ষের নামে সেই তসলিমাকে রক্ষা করতে চায়, যে তসলিমা বাংলাদেশকে শুয়োরের বাচ্চা বলে গালি দিয়েছে। এমনকি বাংলাদেশের সীমানাকে রাবার দিয়ে মুছে ফেলার কথাও ঘোষণা করেছে।’
জানি না কখন পত্রিকা আমার হাত থেকে খসে পড়ে, জানি না কখন এক শরীর অবসাদ আমাকে নিস্তেজ করে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। এ কি ঘুম নাকি অন্য কিছ ! বার বার চমকে চমকে উঠি। ঘুম বা ওই অবসাদের ঘোরের মধ্যে দেখি আমার চারদিকে কিলবিল করছে সাপ। সাপ সাপ আর সাপ। বিষধর সব সাপ। হঠাৎ শরীরে সাপ উঠে আসে, আমি লাফিয়ে উঠি, চেয়ে দেখি আমাকে ছুঁয়ে আছেন ঝ। ঝ বললেন, কি হয়েছে তোমার? কাতরাচ্ছিলে ঘুমের মধ্যে।
–আমি ঘুমিয়েছিলাম?
কিঁ কিঁ করা পাখার চলার মধ্যেও আমি ঘেমে ভিজে উঠেছি।
