–কি করে জানেন?
–অবজারভারে ছাপা হয়েছে।
–ও।
–মিনিস্ট্রি থেকে বলে দেওয়া হয়েছে যে তসলিমা আইনের বাইরে নয়। আইন থেকে পালিয়ে আছে সে, তাকে নিরাপত্তা দেয়ার প্রশ্ন ওঠে না। কিছু মুসলিম দেশের ডিপ্লোমেট আবার বলছে যে বাংলাদেশ সরকার যা করছে ঠিক করেছে, তসলিমার শাস্তি হওয়া উচিত।
তন্ময় হয়ে খবর শুনি ঝর মুখে।
–অ্যামবাসাডাররা যখন নাক গলাচ্ছেন তোমার ব্যাপারে, তখন নিশ্চয়ই ভাল কিছু একটা হবে। ওরা যদি বলে তোমাকে জামিন দিতে, জামিন হয়েও যেতে পারে। আমি বলি, সরকার এখন দেশ সামলাবে না বিদেশ সামলাবে? দেশ তো আগে।
–গরিব দেশের আবার দেশ আগে!
–মুসলিম দেশগুলোর কাছ থেকে তো অর্থনৈতিক সুবিধে পাচ্ছে। সৌদি আরবের কথাই ধরুন না, হাজার হাজার বাংলাদেশের লোক কাজ করে ওখানে, তার ওপর ওদের টাকায় বড় বড় এনজিও হয়েছে, হাসপাতাল হয়েছে। মুসলিম দেশের কথাই বা সরকার শুনবে না কেন!
–তাও কথা।
ঝ অনেকক্ষণ চুপ করে থাকেন। হঠাৎ উঠে যান। ঘণ্টাখানিক পর ফিরে আসেন হাতে দুটো পত্রিকা নিয়ে। একটি পত্রিকা লুফে নিই। ঝর হাতে আরেকটি।
হাজার হাজার মৌলবাদীর মিছিলের ছবি তো আছেই। আরেকটি ছবি আমাকে আমূল কাঁপিয়ে দেয়, সেটি হকার সংগ্রাম পরিষদের ছবি। গতকাল সাপ নিয়ে মিছিল করেছে হকাররা। ব্যানারে লেখা তসলিমা নাসরিন ও আহমদ শরীফসহ সকল ধর্মদ্রোহী রাষ্ট্রদ্রোহীদের ফাঁসি/ জনকণ্ঠসহ সকল ধর্মদ্রোহী পত্রিকা নিষিদ্ধ কর ব্লাসফেমি আইন প্রণয়ন কর/ ৩০ জুন দেশব্যাপী অর্ধদিবস হরতাল পালনের দাবিতে/ বিক্ষোভ মিছিল/ বাংলাদেশ হকার সংগ্রাম পরিষদ। সাপ নিয়ে মিছিল করা হকাররা সার্ট প্যান্ট পরা। কারও মুখে দাড়ি নেই, কারও মাথায় টুপি নেই। হকাররা বলেছে যদি তসলিমাকে ফাঁসি না দেওয়া হয়, তবে সারা শহরে তারা দশ লক্ষ বিষাক্ত সাপ ছেড়ে দেবে।
দেখেছেন খবরটা? ঝর দিকে বাড়িয়ে দিই কাগজ।
ঝ বলেন, আপনি আপনি করা ছাড়ো তো। তুমি বলে স−ম্বাধন কর। আপনি স−ম্বাধন আমার বিচ্ছিজ্ঞর লাগে।
কি কাণ্ড! হঠাৎ করে এখন তাঁকে কি করে আমি তুমি বলি! তুমি বলার চেয়ে ভাববাচ্যে কথা চালিয়ে যাওয়া আমার পক্ষে সুবিধের।
–ন্যাশনালিস্ট ডেমোক্রেটিক এলায়েন্সের মহাসচিব আনোয়ার জাহিদ বলেছেন, হরতাল প্রতিহতকারীদের দাঁতভাঙা জবাব দিতে হবে। ভাবা যায়! আনোয়ার জাহিদ কি করে মৌলবাদীদের সঙ্গে মিশে গেলেন!
ঝ শুনে বললেন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি জাগপার নেতা শফিউল আলম প্রধানও তো ভিড়েছে গিয়ে ওই দলে।
–কি রকম অবাক করা কাণ্ড ঘটছে দেশে!
–এদের কোনও চরিত্র নেই। এরা যে দিকে দেখে ঢেউ, সেদিকেই পাল তোলে।
–এ সময় আওয়ামী লীগ কি করছে? তারা কি আন্দোলনে নামবে না?
–ছাত্রলীগের ছেলেপেলেরা তো ক্ষেপে আছে আওয়ামী লীগের নেতাদের দিকে। ছাত্রদের মধ্যে এখনও কিছু আদর্শ অবশিষ্ট আছে। তারা পথে নেমেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে মৌলবাদবিরোধী আন্দোলনে নামার কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
–এরকম আগে কখনও শুনিনি। সাধারণত আওয়ামী লীগ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ছাত্রলীগ তা অনুসরণ করে।
–বিদঘুটে অবস্থা।
–আমার মনে হয় না এত বড় মৌলবাদী দলের বিরুদ্ধে কেবল ছোট ছোট দল বাসদ জাসদ, ছাত্ররা আর সাহিত্যিক সাংস্কৃতিক কর্মীরা পেরে উঠবে।
নিচে ফোন বাজছে। ঝ দ্রুত উঠে চলে যান। ঝর অপেক্ষায় বসে থাকি, ফোন সেরে তিনি ফিরে আসবেন এ ঘরে, এই অপেক্ষা। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও ঝর পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় না। ঝ কি একবার আসবেন না! একবার অন্তত! মেঝেতে শুয়ে পড়ি পত্রিকা খুলে। দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদকীয়টির শিরোনাম পশ্চিম ও তসলিমারা। ক্লান্ত চোখদুটো সম্পাদকীয়টিতে। ‘মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষার প্রতি বিশ্ববাসীর সচেতনতা ক্রমশই বাড়ছে, এটা অত্যন্ত সুলক্ষণ। অন্যায়ভাবে, বেআইনীভাবে এক মানুষ আরেক মানুষের ওপর নির্যাতন করবে কিংবা এক গোষ্ঠী আরেক গোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ণ চালাবে এটা হওয়া উচিত নয় এবং তা হতে দেওয়াও উচিত নয়। এদিক থেকে যখন আমরা কাউকে কিংবা কোনও মানবাধিকার সংস্থাকে বা কোনও পত্র পত্রিকাকে মানবাধিকারের পক্ষে সোচ্চার হতে দেখি, তখন তাকে আমরা স্বাগত জানাই। কিন্তু ইদানীং মানবাধিকার রক্ষার নামে এমনসব অবিবেচক অর্বাচীন তৎপরতা চালানো হচ্ছে যা প্রকৃতপক্ষে মানবাধিকারেরই পরিপন্থী হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোতে এই অপতৎপরতা আজ খুব বেশী চলছে। তারা এমনসব কথা বলছে যাতে মনে হয় খুনীকে ফাঁসি দেওয়া যাবে না এবং অপরাধীর গায়ে হাত দেওয়াও অন্যায় হবে। জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হিসেবে তসলিমা নাসরিনের কথা এখানে উল্লেখ করা যায়। তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। তিনি এখন পলাতক। পুলিশ তাকে ধরার জন্য চেষ্টা করছে। পশ্চিমা দৃষ্টিতে এটা নাকি ভীষণ অন্যায়। মানবাধিকারের দারুণ খেলাফ। এটা নাকি কারও মুখ বন্ধ করার শামিল। এ ধরনের কথা লেখা হচ্ছে ওয়াশিংটন পোস্টের মত কাগজে ডবল কলাম হেডিং এ। শুধু পত্রিকায় লেখাই নয়, রীতিমত ঝড় তোলা হয়েছে অপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত তসলিমা নাসরিনের পক্ষে। যার জন্যে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে শেষ পর্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করতে হয়েছে। দুর্বল দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলে তসলিমা নাসরিনের নাম পর্যন্ত উল্লেখ না করে শুধু এইটুকু বলেছে যে দেশের আইনে সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত ও সমুন্নত রাখার বিধান রয়েছে। কোনও ব্যক্তি পলাতক অবস্থায় আইনের ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে অবশ্যই আইনগত নিরাপত্তা দাবি করতে পারে না। এর দ্বারা আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সুস্পষ্টভাবেই বলেছেন, তসলিমা নাসরিন আইনের কাছে আত্মসমর্পণ করে সকল নাগরিকের মতই আইনের সহযোগিতা ও নিরাপত্তা লাভ করতে পারেন। কিন্তু তসলিমা নাসরিন তা করছেন না। কারণ অপরাধীরা আইনকে ভয় পাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পশ্চিমা অপপ্রচারকারীরা এই সাদা কথাটা বোঝেন না, এটাই চরম বিস্ময়ের ব্যাপার। অথচ আমরা জানি, পশ্চিমা কোনও দেশেই, বিশেষ করে মানবাধিকারের পক্ষে সোচ্চার দেশগুলোতে, যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অপরাধীদেরকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হয় না। এই তো সেদিন খুনের দায়ে অভিযুক্ত সাবেক ফুটবলার ও জে সিম্পসনকে ধরার জন্য পুলিশ জল স্থল আকাশ জুড়ে কী অভিযানই না পরিচালনা করল। সব দোষই দোষ, সব অপরাধই অপরাধ। ও জে সিম্পসন দুজন মানুষকে খুন করেছেন আর তসলিমা নাসরিন খুন করেছেন কোটি কোটি হৃদয়কে। কোটি কোটি হৃদয়ের যন্ত্রণা থেকেই তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে মামলা এবং তাকে ধরার প্রচেষ্টা। ও জে সিম্পসনের মতই সে ক্রিমিনাল। ও জে সিম্পসনকে ধরার জন্য যদি মার্কিন পুলিশ তার পিছু নিতে পারে, তাহলে তসলিমা নাসরিনকে ধরার জন্যও বাংলাদেশের পুলিশ চেষ্টা করতে পারে। এই প্রচেষ্টায় বাধ সাধার অর্থ মানবাধিকারের বিরুদ্ধাচরণ করা। আমরা মনে করি, পশ্চিমারা তসলিমা নাসরিনের মত লেখকদের পক্ষে যে তৎপরতাই চালাক তার সব কিছুই মানবাধিকারের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। বস্তুত পশ্চিমা কিছু দেশ এই ক্ষেষেন অজ্ঞতার কারণেই হোক কিংবা বিদ্বেষদুষ্ট হয়েই হোক দ্বিমুখী নীতি অনুসরণ করছে। তারা তাদের আইন প্রয়োগ করলে দোষ নেই, কিন্তু আমরা আমাদের আইন প্রয়োগ করতে পারব না। পশ্চিমাদের এই দ্বিমুখীতার মূলে, আমাদের মতে, বিদ্বেষের চেয়ে অজ্ঞতাই বেশি কাজ করছে। তারা তাদের আইন ও মূল্যবোধকে যতটা বোঝেন, আমাদের আইন ও মূল্যবোধ সম্পর্কে ততটাই অজ্ঞ। কিন্তু তাদের অজ্ঞতা এতটা গভীর হতে পারে তা আমাদের বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয়। আমরা একটা জাতি। আমাদের একটা ধর্ম আছে, আদর্শ আছে। সেই ধর্ম ও আদর্শ অনুসারে বিচার, সামাজিকতা ও জীবন পরিচালনার জন্য স্বতন্ত্র বিধান রয়েছে, যেগুলোকে বাদ দিলে আমরা তখন আর কোনও জাতি থাকি না। আমাদের জাতির সদস্য যারা, তারা আমাদের আদর্শ ও আইনের অধীন। তসলিমাও তাই। এই তসলিমা অপরাধ করলে তার বিচার আমাদের আদর্শ আইনের মাধ্যমেই হবে, মার্কিন কিংবা অন্য কোনও দেশের আইন ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে নয়। আমাদের এই জাতিগত অধিকারকে জাতিসংঘ সনদও নিশ্চিত করেছে। সুতরাং পশ্চিমা দেশগুলো যখন আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে, তখন তারা শুধু জাতিগত অধিকার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনই নয়, জাতিসংঘের সনদও পদদলিত করে। আমরা এই বিষয়টির দিতে পশ্চিমের সংশ্লিষ্ট মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আমাদের তসলিমা নাসরিনদের মত ঘটনায় নাক না গলাবার জন্য তাদের প্রতি আহবান জানাই।’
