ঝ পত্রিকাটি চোখের সামনে তুলে ধরে বলতে থাকেন, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী ছাত্র সমাজ ও মুক্তিযোদ্ধা ছাত্র কমাণ্ড গোলাম আযমসহ সকল যুদ্ধাপরাধী ধর্মের অপব্যবহারকারী, ফতোয়াবাজ, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনার অবমাননাকারী, সংবাদপষেনর ওপর হামলাকারীদের বিচার ও ফাঁসির দাবিতে এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবিতে আগামী ৩০ জুন সকাল সন্ধ্যা হরতালের ডাক দিয়েছে। গতকাল সকাল ১১টায় আইবিএ ভবনে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী ছাত্র সমাজের এক জরুরি বৈঠকে হরতালের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ৩০ জুনের হরতালকে সফল করার জন্য ২৪ জুন সকাল ১০টায় মধুর ক্যান্টিনে একটা প্রতিনিধি সম্মেলন হবে। ওতে মহানগর কমিটির সকল সদস্য, সকল থানা, কলেজ, ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি আর সাধারণ সম্পাদকরা থাকবে। ২৫ জুন সারাদেশে সভা সমাবেশ, ২৬ জুন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সমাবেশে যোগদান, ২৮ জুন জাতীয় সমন্বয় কমিটির সমাবেশে যোগদান, ২৯ জুন সন্ধ্যায় মশাল মিছিল।
–আপনার কি মনে হয় সকাল সন্ধ্যা হরতাল হবে?
–হবে। কিন্তু এই হরতাল সফল হলে মূলত জয় হবে মৌলবাদীদের।
–কিন্তু ওরা তো সকাল সন্ধ্যা হরতাল ডাকেনি।
–না ডাকুক। কিন্তু হরতালের কথা তো ওরাই বলেছে আগে।
–দুপুরের পর তো অনেকেই গাড়ি বের করতে পারে।
–ভয়ে বের করবে না। অর্ধদিবস হরতাল হলেও অনেকে গাড়ি টাড়ি বের করতে চায় না রাস্তায়।
ঝর চোখ পত্রিকায়। বললেন, নারী প্রগতিবিরোধীদের প্রতিরোধের আহবান।
–কে আহবান জানালো?
–তাসমিমা হোসেন।
–ও।
–চেন তাসমিমাকে?
–চিনি। অনন্যা পত্রিকার সম্পাদক। ওখানে আমি কলাম লিখতাম।
–অনন্যা পত্রিকা অফিসে আলোচনা অনুষ্ঠান হয়েছে, বলেছে নারী প্রগতির বিপক্ষ শক্তির ক্রম উত্থান সমাজে এক নৈরাশ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। সালমা খান বলেছেন, দেশে নারীরা বৈষম্যের শিকার, প্রচলিত আইনে নারীদের সমস্যার সমাধান না করা গেলে প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়ন ও সংশোধন করা উচিত।
এটুকু পড়ে হেসে ওঠেন ঝ, বলেন, ওরা সালমা খানের বিরুদ্ধে ফতোয়া দেবে না? তুমি যা বলেছো, সালমা খান তো তাই বললেন।
–সালমা খান ধর্ম শব্দটি ব্যবহার করেননি।
–ধর্ম শব্দটি উচ্চারণ না করেও কিন্তু ধর্মের পাছায় বাঁশ ঢোকানো যায়। গাধা মোল্লাগুলো তো তা জানে না।
ঝর চোখ আবার পত্রিকায়, হঠাৎ বললেন, দেখ দেখ দেশের যত পীর আছে, সব নেমে পড়েছে এই আন্দোলনে। চরমোনাইয়ের পীর বলছে কুখ্যাত তসলিমাকে হত্যা করার দাবিতে হরতাল হবেই হবে। এই পীরের শিষ্য সংখ্যা তুমি কি আন্দাজ করতে পারো? লাখ লাখ। যে কোনও বড় পলিটিক্যাল লিডারের চেয়ে পীরদের জনপ্রিয়তা অনেক বেশি। চরমোনাইয়ের পীর, শর্ষিনার পীর সব নেমেছে রাস্তায়।
ঝর কথা মন দিয়ে শুনি আমি। তাঁর কপাল কুঁচকে আছে দুশ্চিন্তায়। আমি ইনকিলাবটি খুলে হাতে দিই ঝর। প্রথম পাতায় বড় বড় শিরোনাম খবরের।
৩০ জুনের হরতাল সফল করতে দেশব্যাপী গণজোয়ার সৃষ্টি। ব্যাপক সভা সমাবেশ ও বিক্ষোভ অব্যাহত। মোর্চার নেতারা ঢাকার বাইরে গিয়ে গিয়ে বিশাল বিশাল জনসভায় ভাষণ দিচ্ছেন। বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্র সেনা আজ বায়তুল মোকাররমে সমাবেশ করেছে, মিছিল বের করেছে। বাংলাদেশ হকার সংগ্রাম পরিষদ(বিএইচএস) এবং দেশীয় চিকিৎসক ও ক্যানভাসার কল্যাণ সমিতিও তসলিমার ফাঁসির দাবিতে ৩০ জুনের হরতালের সমর্থনে বিক্ষোভ মিছিল বের করেছে। নেজামে ইসলামি পার্টি করেছে আছর নামাজের পর। কাল ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন বায়তুল মোকাররমের সামনে থেকে বাদ আছর লাঠি মিছিল বের করবে। ইসলাম ও রাষ্ট্রদ্রোহী প্রতিরোধ মোর্চা কালও সারাদেশে বিক্ষোভ দিবস পালন করবে। আজ তারা ঢাকার মোহাম্মুদপুর টাউনহল প্রাঙ্গণে জনসভা করছে। মোর্চার কিছু নেতা ঝটিকা সফরে দেশের অন্যান্য জায়গায় জনসভায় বক্তৃতা করছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় স্মরণকালের বৃহত্তম সভা হয়েছে কাল, সভায় ৩৪ টি ইশকুল কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন, পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। মুফতী আমিনী ওখানে বলেছেন যে সরকার যদি ৩০ তারিখের হরতালের পর দাবি না মানে, তবে তারা বাহাত্তর ঘণ্টার হরতালে যাবে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে কুমিল্লার পথে থেমে থেমে বিভিন্ন সভায় মুফতি আমিনী বক্তৃতা করেন। সে কি জনপ্রিয়তা এখন মোর্চার নেতাদের! সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এক সভা থেকে আরেক সভায় দৌড়োচ্ছেন। বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি মসজিদে মসজিদে গভীর রাত পর্যন্ত জরুরি সভা করছে। দেশের প্রতিটি মাদ্রাসায় সভা হচ্ছে, প্রতিটি মাদ্রাসা থেকে মিছিল বের হচ্ছে। ইয়ং মুসলিম সোসাইটি জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ৩০ তারিখে সমাবেশ করবে, সারাদেশেও তাদের সমর্থকদের বলা হয়েছে প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ করার জন্য।
ঝ চুপ করে বসেছিলেন অনেকক্ষণ। আমি বললাম, কাল তো সংসদেও দুজন সদস্য আমাকে গ্রেফতারের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীকে বলেছে।
ঝ বললেন যে তিনি পড়েছেন এই খবর।
মাওলানা আতাউর রহমান খান আর গোলাম রব্বানী সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ৭১ বিধি অনুসারে জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয় হিসেবে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশ দিয়ে যখন কথা বলার সুযোগ পান, আইন মন্ত্রী আর প্রধান মন্ত্রীকে বলেন যে তসলিমার ফাঁসি এবং ব্লাসফেমি আইন প্রবর্তন করতে যেন কোনও দেরি না হয়। ঝ বললেন, আইন মন্ত্রী আর প্রধানমন্ত্রী তখন কী করছিলেন? নিশ্চয়ই মাথা নেড়ে সায় দিয়েছেন যে তাঁরা মোটেও এতে দেরি করবেন না!
