আজ জিয়াউল হাসান সাংবাদিক সম্মেলন করে ইসলামী বিপ্লবী আন্দোলনের মাধ্যমে মৌলবাদীদের বিপক্ষে কথা বলছেন। স্পীকারের কাছে লেখা আমার চিঠিটি পত্রিকায় ছাপা হওয়ার পর জিয়াউল হাসানের দল একটি বিবৃতি দিয়েছিল, সেটিও মৌলবাদীদের কবল থেকে আমাকে বাঁচানোর উদ্দেশে। ৩১ জন আলেমের দেওয়া বিবৃতিটি এরকম ছিল, তসলিমার নমনীয় মনোভাব শুভ লক্ষণ।মাননীয় স্পীকারের কাছে লেখা চিঠিতে তসলিমা যে নমনীয়তা ও ক্ষমা প্রার্থনাসুলভ বক্তব্য রেখেছেন তার জন্য লেখিকাকে আমরা সাধুবাদ জানাচ্ছি। আমি কখনও পবিত্র কোরান শরীফ পরিবর্তনের কথা লিখি নি বলে তিনি যে স্বীকারোক্তি করেছেন, তা শুভ লক্ষণ। তবে, তার এই বক্তব্য নতুন কোনও চালাকি কি না, আমরা তা সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছি। কোরান শরীফ নিয়ে কোনও অবান্তর কথাবার্তা ও চালাকির সুযোগ নেই। এর রক্ষক স্বয়ং আল্লাহতায়ালা। তিনি দয়ালু ও ক্ষমাশীল। তসলিমা নাসরিন যদি কায়মনোবাক্যে আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রার্থী হন এবং ইসলামের নিয়ম নীতি ও শরিয়া অনুসরণ করে জীবন যাপন করেন, তবে আল্লাহ অবশ্যই এই নাদান লেখিকাকে ক্ষমা করবেন।
নাদান লেখিকাকে আল্লাহতায়ালা ক্ষমা করছেন না। নাদান লেখিকা বসে আছে একটি আলো বাতাসহীন বন্ধ ঘরে। নাদান লেখিকার পেচ্ছ!ব পেয়েছে, পেচ্ছ!ব কি করে নিঃশব্দে করা যায়, নাদান লেখিকা তার চেষ্টা করছে প্রাণপণ। পেচ্ছ!ব পায়খানার পর ফ্লাশ করলে শব্দ হয় বলে ফ্লাশ তিনি করছেন না, যদি শব্দ চলে যায় নিচে। নাদান লেখিকা নিজের শ্বাসের শব্দটিকেও ভয় পায়। এ শব্দও যদি কেউ শুনে ফেলে! ছোট্ট ঘরটিতে শ্বাস মাঝে মাঝে বন্ধ হয়ে আসে নাদান লেখিকার। কিন্তু বন্ধ হয়েও পুরোপুরি বন্ধ হয় না। পুরোপুরি বন্ধ হয় না বলে নাদান লেখিকা বেঁচে থাকে। ঝ এলেন বিকেল বেলা। শব্দে আমি চকিতে উঠে বসি। ঝ ঘরে এলেন মানে একঝলক আলো এল ঘরে, প্রাণ এল ঘরে। নিজেকে মৃত বলে মনে হয়, কিন্তু ঝ এলে বুঝি যে বেঁচে আছি। ঝ র আপাদমস্তকের দিকে তাকিয়ে আছি। আমার চোখ থেকে ঝরতে থাকে কৃতজ্ঞতা। ঝ একটি ক্যানভাস এনেছেন, একটি ইজেল আর একটি গান বাজানোর যন্ত্র। কোনও কথা না বলে তিনি গান ছেড়ে দিলেন জোরে। বেরিয়ে গিয়ে কিছুক্ষণ পরই এক থালা ভাত তরকারি নিয়ে এলেন। গান বাজতে থাকলে অত গলা চেপে কথা না বললেও চলে। গানের শব্দের আড়ালে চাপা পড়ে যায় কথা বলার শব্দ। ঝ বললেন, তিনি আজ আপিসে যাননি। এভাবে আমাকে এঘরে রেখে আপিসে যাওয়া খুব নিরাপদ নয়। যে কোনও মুহূর্তে বাড়ির যে কেউ জেনে যেতে পারে যে এ ঘরে কোনও প্রাণী বাস করছে, এই আশংকায় তিনি আজ আপিস কামাই দিয়েছেন কিন্তু এভাবে বেশিদিন কামাই দেওয়া চলবে না। এ ঘরে তিনি এখন ইজেল আর ক্যানভাস নিয়ে এসেছেন, এগুলো আনার মানে হল তিনি যদি এ ঘরে আসেন, বাড়ির লোকেরা জানবে যে এঘরে তিনি ছবি আঁকায় ব্যস্ত। কাজের লোকদের বলে দিয়েছেন যে তিনি এখন মন দিয়ে ছবি আঁকবেন। কেউ যেন তাঁর ছবি আঁকার কাজে বিরক্ত না করে। আজও ঝর ভাগের থেকে ভাত খেতে হয় আমাকে। আধপেট খেয়েও আমার কোনও অতৃপ্তি হয় না। যখন জীবন একটি সরু সুতোয় আটকে থাকে, সুতো ছিঁড়লেই নিচে আগুনের গর্তে পড়ে যাবে শখের জীবনটি, তখন আধপেট কি সিকিপেট খাবার জোটা তো ভাগ্যের ব্যাপার, না জুটলেই বা কী!
ঝ খেয়ে দেয়ে হাঁফাচ্ছিলেন গরমে। একটি সিগারেট ধরিয়ে সেটি না শেষ করেই আবার নিচে চলে গেলেন, একটি টেবিল ল্যাম্প আর একটি টেবিল ফ্যান নিয়ে ফিরে এলেন। বগলের তলে জামার মোড়ক। ঝর এক আত্মীয় গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীর মালিক গোছের কিছু, তাঁর কল্যাণে ঘরে পরার লম্বা লম্বা জামা পেয়েছেন তিনি। দুটো আমার জন্য এনেছেন। একটি সাবান,একটি টুথপেস্ট, একটি দাঁতের মাজন জামার ভেতর থেকে বেরোলো। না চাহিতে দয়াময় দিয়াছে সকল, ক্ষুধায় আহার আর পিপাসায় জল — মনে মনে আওড়াতে থাকি। ঝকে দেখে বুঝিনি তিনি যে লক্ষ করেছেন আমার জামা নেই, দাঁত মাজার কিছু নেই, আমি যে গরমে কষ্ট পাচ্ছি, টেবিল ল্যা−ম্পর ছোট একটি আলো রাতে যখন জেগে থাকি, আমার যে প্রয়োজন হতে পারে। কাগজ কলমও দিলেন তিনি। বললেন, শুধু বসে থাকবে কেন, লিখবে।ঝঞ্চর এই ভালবাসা আমার বুকের মধ্যে ঝরনা ঝরায়।
দেশের খবর নিয়ে যখন কথা হয়, ঝ বললেন, দেখেছো, মৌলবাদ-বিরোধী দল কি করে হেরে গেল!
–হেরে গেল? কি করে?
হরতাল বন্ধ করতে পারবে না তা বুঝে গেছে। এখন তাই নিজেরাই হরতালের ডাক দিয়েছে। মৌলবাদীরা সারা দেশে অর্ধদিবস হরতালের কথা বলছে। আর দেখ আমাদের ছেলেরা কী বলছে, ঝ তাঁর হাতের ভাঁজ করা কাগজ খুলে খবরের শিরোনামটি পড়লেন, গোলাম আযমসহ সকল যুদ্ধাপরাধীর বিচার ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে ৩০ জুন সকাল সন্ধ্যা হরতাল।
আমি সত্যি সত্যি মাথায় হাত দিই। বেদনার্ত কণ্ঠে বলি–কী বলছেন? এরকম তো হওয়ার কথা না। হরতাল প্রতিরোধের কথা তো অনেকদিন থেকেই বলা হচ্ছে। এত দল মিলে এই একটা হরতাল প্রতিরোধ করতে পারবে না! এ কোনও কথা হল।
ঝ আমার দিকে ফেরেন, তসলিমা তুমি বুঝতে পারছো না কেন, হরতাল যদি হয়েই যায়, তবে প্রতিরোধঅলারা মুখ দেখাবে কি করে! তাই নিজেদের সম্মান রাখতে এই ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।
