আমি ম্লান হাসি।
ঝ বললেন, ইনকিলাবের বাচ্চারা এখন কি করছে দেখেছো? ভয়েস অব আমেরিকা নাকি বলেছে অষ্ট্রেলিয়ার এক রেডিও সাক্ষাৎকারে তুমি বলেছো যে ইসলাম ধর্ম মেয়েদের কোনও মানবিক মর্যাদা দেয়নি। ইসলাম ধর্মে মেয়েদের সাথে ক্রীতদাসীর আচরণ করা হয়, এই খবরটি ফলাও করে ছেপেছে। এসব ছাপার এখন উদ্দেশ্যটি হল, যেন জনগণ যেন তোমার ওপর আরও ক্ষেপে যায়।
ঝ মেঝেতে দু পা সামনের দিকে ছড়িয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছেন। আমি আমার মাথার বালিশটি ঝর দিকে বাড়িয়ে দিই, যেন তিনি বালিশে হেলান দিতে পারেন। ঝ লুফে নেন বালিশটি। বালিশে কনুইএর ভর দিয়ে কাত হয়ে শুয়ে বললেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর খবরটা পড়েছিলে? বিদেশের পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হচ্ছে তোমার ফাঁসি চাওয়া হচ্ছে, এসব মানবাধিকার লঙ্ঘন, সরকার কিছু করছে না, তোমাকে নিরাপত্তা দিচ্ছে না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী নাকি দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিদেশে এসব খবর ছাপা হওয়ায়। বলেছেন, এদেশের আইনে সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার সম্পূর্ণ নিশ্চিত করার বিধান আছে। কিন্তু কেউ পলাতক অবস্থায় আইনের ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে আইনগত নিরপত্তার দাবি করতে পারে না।
আমি বলি, ভাবটা এমন যে আমি নিরাপত্তা চাইলে তারা এখন আমাকে নিরাপত্তা দেবেন।
ঝ হেসে বলেন, তাই বোধহয় তারা চাইছে। তুমি নিরাপত্তা চাইবে। সঙ্গে সঙ্গে তোমাকে গ্রেফতার করে জেলে ভরবে তারপর ফাঁসি দেবে। বিদেশের পত্রিকায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা লেখা হলে বলে দেবে আমরা গণতান্ত্রিক সরকার, দেশের মেজরিটি জনগণ যা দাবি করেছে, আমরা তা মিটিয়েছি। এর ওপরে তো আর কথা নেই। জনগণের দাবি পূরণ করাই তো গণতান্ত্রিক সরকারের কর্তব্য।
ঝ আরেকটি সিগারেট ধরালেন। সিগারেটে টান দিয়ে −ধাঁয়া ছেড়ে বললেন, তুমি ভয় পেও না। তোমাকে কেউই এবাড়ি থেকে ধরতে পারবে না। খুব ওয়েল প্রটেকটেড বাড়ি। দারোয়ান আছে গেইটে। কাজের মানুষগুলো থাকে নিচতলায়, নিচতলায় ড্রইংরুম, রান্নাঘর, খাবার ঘর। দোতলায় আমার শোবার ঘর। দোতলায় উঠে ঘর দোর পরিষ্কার করে তারা নিচে চলে যায়। আড়াইতলায় বা তিন তলায় দরকার না হলে ওঠে না। কিন্তু আমি বাড়িতে না থাকলে ওরা কতদূর পর্যন্ত ওঠে, তা আমার জানা নেই। সেজন্যই একটা ভয় থাকে। আমি তো এভাবে বেশিদিন আপিস কামাই দিতে পারব না। কাল তো ছুটি। পরশু থেকে আপিসে যেতেই হবে। আর শোনো, যদি এমন হয় যে বিপদের আশঙ্কা আছে, কিছু একটা হয়ে গেলে, এসেই গেল মোল্লারা এবাড়িতে, খোঁজ পেয়েই গেল, তখন কি ভেবেছি আমি, জানো?
–কি? উৎসুক তাকাই। বুকে কাঁপুনি।
ঘরটির লাগায়ো গোসলখানার ওপর একটি ছোট খোপ আছে, হাবিজাবি বা বাড়তি জিনিসপত্র রাখার খোপ, খোপটি বন্ধ একটি কাঠের পাল্লা দিয়ে। খোপটি দেখিয়ে ঝ বললেন, তোমাকে সোজা ওখানে তুলে দেব। সারা বাড়ি খুঁজেও তোমাকে কেউ পাবে না। যদি অবস্থা খারাপের দিকে যায়, ওই ব্যবস্থাটি রইল, কি বল!
ওপরের কবুতরের খোপের মত খোপটির দিকে তাকিয়ে আমি বলি, আমি কি ঢুকবো ওখানে?
–শোনো বিপদ এলে এক ফুট জায়গাতেই পাঁচ ফুটের শরীর ঢোকানো যায়। ঢোকাতে হবে। এটাই এ বাড়ির সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা।
খোপে বাস করতে হবে শুনে মানুষ মুর্ছা যায় হয়ত, কিন্তু আমার হয় স্বস্তি। ঝ যদি এখন বলেন যে যদি দেখি মোল্লারা খবর পেয়ে গেছে যে তুমি এখানে, ধেয়ে আসছে এ বাড়ির দিকে, তখন মাটিতে একটি গর্ত করে তোমাকে আমি পুঁতে রাখব, এতেও বোধহয় স্বস্তি হবে আমার। মাটিতে পোঁতা থাকলেও বাঁচার সম্ভাবনা আছে, মোল্লাদের হাতে পড়লে নেই।
ঝ উঠে গেলেন গানের যন্ত্রটির কাছে। বোতাম টিপে টিপে রেডিওতে বিবিসি ধরলেন। বিবিসিতে বাংলা খবর চলছে। জামাতে ইসলামীর উদ্দেশ্য বিধেয় খানিকটা উল্লেখ করে বলা হল, লেখিকা তসলিমা নাসরিন এবং যেসব খবরের কাগজ তাঁর লেখা প্রকাশ করেছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে জামাতের সমর্থকরা সহিংস আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। খবরের মধ্যে কিরকিরি শব্দ হতে শুরু হল। ধুত্তুরি বলে ঝ রেডিও বন্ধ করে দেন। ওঠেন তিনি যাবার জন্য, বলেন ভেতর থেকে যেন দরজা বন্ধ করে রাখি। দরজার তালা খুলে তিনি যদি ছোট্ট একটি মৃদু টোকা দেন, তাহলে বুঝতে হবে এটি ঝ, আমি তখন ভেতরে থেকে সিটকিনি খুলে দেব।
ঝ চলে গেলে বড় খালি খালি আগে। আবার আমি একা গোলাম আযমের মুখোমুখি। মনে হতে থাকে এই জিভ বেরিয়ে আসা কাঠের গোলামটিও বুঝি আমাকে দেখে হাসছে, আমার মৃত্যু হবে শীঘ্র, এই খুশি চিকচিক করছে চোখ দুটোতে। আমি মুখ ফিরিয়ে নিই, দুহাঁটুর মাঝখানে মাথাটি রেখে ভাবতে থাকি মৃত্যু কেমন দেখতে, মৃত্যু যখন হতে থাকে, তখন কেমন লাগে শরীরে, মনে! তখন কি আমি বুঝতে থাকবো যে আমি মরে যাচ্ছি! আমি কি বুঝতে পারব যে এই পৃথিবী থেকে চিরকালের মত আমি চলে যাচ্ছি, আর কোনওদিন আমি ফিরবো না, আর কোনওদিন কারও সঙ্গে আমার দেখা হবে না, আমি বলে কেউ কোথাও আর থাকবো না! চিনচিন একটি কষ্ট আমার বুক থেকে উঠে আসে ওপরের দিকে। ওপর থেকে আবার নিচে, কষ্ট আমার সারা শরীরে মহানন্দে ভ্রমণ করে।
মধ্যরাতে আমি জেগেই ছিলাম। ঝ এলেন, এমনি এলেন। দেখতে এলেন। বাড়িতে একটি নিষিদ্ধ জিনিস থাকলে এই হয়, বার বার দেখতে ইচ্ছে হয় জিনিসটি ঠিক আছে কি না। জিনিসটি নিয়ে দুশ্চিন্তা কখনও দূর হয় না।
