শামসুর রাহমান যে কমিটির সভাপতি, যে কমিটির অনেকে নাস্তিক, অনেকে কোরআন কোনওদিন পড়ে দেখেনি, ছুঁয়ে দেখেনি, সেই কমিটিকে বলতে হয়, দাবি করতে হয়, আমরা কোরআনের পক্ষ শক্তি। এটিই বুঝিয়ে দেয় যে মৌলবাদ বিরোধী শক্তি এখন প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে মৌলবাদীদের বাধা দিতে। এখন যদি কোরআনকে ব্যবহার করলে বাধার কাজটি ভাল হয়, তবে এটিকে ব্যবহার করতেও আপত্তি নেই। এই প্রতিরোধ কমিটি একটি ভুল করছে, আমার মনে হয়। কেবল জামাতে ইসলামীকে মওদুদীবাদী বলে দোষ দিয়ে নিজেদের কোরআনের পক্ষ শক্তি বলে লাভ হবে না কিছু। কারণ জামাতে ইসলামী এই আন্দোলনে কেবল যোগ দিয়েছে, আন্দোলন জামাতে ইসলামী দ্বারা শুরু হয়নি, হরতালের ডাকও জামাত দেয়নি। সুতরাং প্রতিরোধ কমিটি জামাতে ইসলামীকে কোণঠাসা করতে চাইলে অন্য মৌলবাদী শক্তিদের কিছু যায় আসে না। তারা মওদুদীবাদীও নয়, তারা জামাতের নয়, কিন্তুু তাদের শক্তি অনেক বড়, জামাতকে সঙ্গে না নিলেও তাদের চলবে। আসলে জামাতে ইসলামীকে ওরা সঙ্গে নেয়নি। জামাতই গিয়ে ভিড়েছে বড় মৌলবাদী আন্দোলনে।
নতুন এক নিয়ম শুরু হয়েছে। মত বিনিময় সভা। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট মতবিনিময় সভা করবে পরশুদিন।
এদিকে মোর্চার বক্তারা যে কোনও ত্যাগের বিনিময়ে আগামী ৩০ জুন আহূত হরতাল সফল করে তোলার জন্য সকলের প্রতি আহবান জানাচ্ছেন। আগামী ৩০ জুনের হরতাল জাতিকে সুস্পষ্ট দুটি ভাগে ভাগ করেছে। ঐদিন প্রমাণ হবে কারা কোরআন হাদিসের পক্ষে, এবং কোন দল বিপক্ষে। তসলিমা, আহমদ শরীফের দালালরা হরতাল প্রতিহত করার ডাক দিয়েছে। তাদের সেই স্বপ্ন কোনওদিন বাস্তবায়িত হবে না।
খেলাফত মজলিস, প্রতিরোধ আন্দোলন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, তাহাফফুজে হারমাইন, ঈমান বাঁচাও দেশ বাঁচাও, ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন, জমিয়াতুস সাহাবা, মসজিদ পরিষদ বাংলাদেশ, ঢাকা সাহিত্য সংস্কৃতি কেন্দ্র, পোস্তগোলা ট্রাক মালিক সমিতি, ইসলামী সমাজ কল্যাণ পরিষদ, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র মজলিস, অপসংস্কৃতি প্রতিরোধ কমাণ্ড, অনুপম সাহিত্য সংসদ এরকম কয়েক হাজার ইসলামপন্থীদের সংগঠন সভা সমাবেশ করে হরতালের পক্ষে সমর্থন জানাচ্ছে। জামাতে ইসলামী পবিত্র আশুরা উপলক্ষে আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। অন্য কোনও বছর আশুরা কোনও ঘটনা নয়, এ বছর একটি ঘটনা বটে। মতিউর রহমান নিজামী এই অনুষ্ঠানে এজিদের বিরুদ্ধে ইমাম হোসেনের আপোসহীন সংগ্রামের ইতিহাস বর্ণনা করেন। খোলাফায়ে রাশেদীনের পর ইসলামের নেতৃত্ব নির্বাচনের মৌলিক পদ্ধতিকে বিকৃত করে রাজতন্ত্র কায়েম করা হয়েছিল। ইসলামী জনতার স্বতঃস্ফূর্ত আস্থা ও সমর্থনই হল ইসলামে নেতা নির্বাচনের স্বীকৃত পদ্ধতি। নবী করিম ওরফে হযরত মোহাম্মদ ওরফে আল্লাহর পেয়ারা বান্দা ওরফে আললাহর রসুলের পর চার জন খলিফা একই সঙ্গে মসজিদের ইমামতি ও রাজনৈতিক দিক নির্দেশনা দান করেছেন। নিজামী সেই খলিফার আমলের সুন্দর ব্যবস্থার কথা স্মরণ করেন এবং তেমন ব্যবস্থা এখন এ দেশে চান সৃষ্টি করতে। নিজামী বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্য হয়ে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে কী অবলীলায় বলে গেলেন, বর্তমানে যেসব মুসলিম দেশে শরিয়তি আইন কানুন চালু রয়েছে সেগুলোকে ইসলামী রাষ্ট্র বলা যায় না কারণ সেখানে ইসলামী পদ্ধতিতে নেতৃত্ব নির্বাচনের ব্যবস্থা নেই। তিনি কোনও রাজতন্ত্র চান না, গণতন্ত্র চান না, তিনি সত্যিকার ইসলামতন্ত্র চান এ দেশে। তসলিমা এবং ধর্মদ্রোহী মুরতাদদের সম্পর্কে বললেন, কারবালার শহীদদের মত আপোসহীনভাবে জীবনপণ সংগ্রাম চালাতে পারলে আমাদের বিজয় সূর্যের মত নিশ্চিত। নাফরমানের জীবন যাপনের চেয়ে আল্লাহর পথে সংগ্রামরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ অধিকতর শ্রেয়। নিজামী তো বলেছেনই, বাকি নেতারাও জেহাদে মৃত্যুবরণ করার পরামর্শ দিয়েছেন। মহররমের মাস। ইমাম হোসেন মুহম্মদের মেয়ের ঘরের নাতি কারবালায় এজিদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে প্রাণ দিয়েছেন। তাই আজ সেই উদাহরণ টেনে এনে জামাতে ইসলামীর নেতারা বলছেন, ইমাম হোসেনের শাহাদাত অন্যায়ের বিরুদ্ধে জীবন্ত প্রতিবাদ হিসেবে সর্বকালব্যাপী প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। সত্য থেকে বিচ্যুত না হয়ে শাহাদাত বরণ করা শ্রেয়, আজকের দিনে এই শিক্ষার বড় প্রয়োজন। ১৪শ বছর আগে ইমাম হোসেন যে আদর্শের জন্য জালিমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে জীবন দান করেছিলেন আজ সেই আদর্শ ইসলাম, আল কুরআন ও আল্লাহকে নিয়ে ষড়যন্ত্র চলছে, আল্লাহর দরবারে শাহাদাতের নজরানা পেশ করতে পারলে বিজয় আমাদের সুনিশ্চিত।
কী ভয়ংকর আহবান। নেতারা শাগরেদদের বলেই দিলেন, প্রয়োজনে মৃত্যু হোক তোমাদের, এই মৃত্যু পবিত্র, এই মৃত্যু হলে শহীদ হবে, এই মৃত্যু বেহেস্ত নিশ্চিত করবে। নেতারা আসলেই কয়েকটি মৃত্যু কামনা করছেন। মৃত্যু হলে এদেশীয় ঢংএর রাজনীতি শুরু করতে পারবেন তাঁরা। হরতালকারী এবং হরতালপ্রতিরোধকারীর মধ্যে কোনও সংঘর্ষে যদি হরতালকারীদের কেউ নিহত হয়, তবে মহানন্দে হরতালকারীরা লাশের রাজনীতি শুরু করবে। লাশ দেখলে আবেগ উথলে ওঠে জনতার, ইসলাম যে সত্যিই খুন হচ্ছে, তা অনুভব করে সাধারণের ধর্মীয় অনুভূতি শত গুণ বৃদ্ধি পাবে, সরকার বিপাকে পড়ে শেষ পর্যন্ত ব্লাসফেমি আইন চালু করতে বাধ্য হবে, সরকারের মধ্যে যে মৌলবাদী একটি দল আছে, সেই দলটিই চাপ দিয়ে আইনটি করাবে। এর মধ্যে সরকারের নীতিনির্ধারক মহলে হরতাল নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এক দল হরতালের পক্ষে, আরেকদল বিপক্ষে। পক্ষের দলটি শক্তিশালী।
