সকাল হয়। পাখির, মানুষের, যানবাহনের শব্দ শুনে বুঝি সকাল। বন্ধ জানালাটির ফাঁকে আটকে থাকা টুকরো টুকরো সাদা আলো দেখে বুঝি যে বাইরে সকাল। শুয়ে থাকতে ভাল লাগে না। বসে থাকি। একটানা বসে থাকতেও আর কতক্ষণ ভাল লাগে! একসময় দাঁড়াই। দাঁড়িয়ে থাকি। কতক্ষণ আর ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা যায়। হাঁটি। খুব আস্তে পা ফেলে এক পা দু পা। কিন্তু মনে হতে থাকে পা ফেলার শব্দ খুব জোরে হচ্ছে। নিচতলায় শুনতে পাচ্ছে কেউ। অগত্যা বসে থাকি। সকাল দুপুরের দিকে হেলে পড়ে, আমি হেলে পড়ি মেঝেয়। ঝিমঝিম করে মাথা। শরীর অবশ অবশ লাগে।
যখন ঝ ঢুকলেন ঘরে, তখন বিকেল। ঝ আপিস থেকে ফিরে ফাঁক খুঁজছিলেন এ ঘরে আসার। ছেলে ঘুমিয়ে গেলে, ওদিকে কাজের মানুষগুলো একটু জিরোতে গেলে ঝ তাঁর নিজের ভাতের থালাটি নিয়ে উঠে এলেন এ ঘরে। ঝর ভাগের ভাতে আমার ভাগ বসাতে হয়। যে থালাটি ঢাকনা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, সেটির মধ্যে আমার জন্য ভাত তুলে দেন ঝ। তরকারি, মাছ সমান সমান ভাগ করেন। এই অর্ধেকে না হবে আমার, না হবে ঝর। কিন্তু এ ছাড়া আর করার কিছু নেই। এবাড়ির দক্ষ রাঁধুনি যখন পাঁচজনের জন্য রাঁধেন, তখন পাঁচজনের জায়গায় ছ সাতজনও খেতে পারে, কিন্তু বাড়তি খাবার কি করে এ ঘরে পাচার করবেন ঝ! কোনও উপায় নেই। অন্তত ঝ কোনও উপায় দেখছেন না। পাচার করলে জানাজানি হবেই। হলে বাড়ির সকলের সন্দেহ হবে যে ওপরতলায় কোনও প্রাণী নিশ্চয়ই বাস করছে। প্রাণীটি কে, তা জানার জন্য তারা কৌতূহলী হবে। এটি ঝর বাড়ি হলেও, কাজের মানুষগুলো ঝর প্রতিটি আদেশ উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করলেও ঝ এখন কাউকে বলতে পারছেন না যে এ বাড়িতে তাঁর একজন অতিথি আছে। অতিথির জন্য ঝর এ বাড়িতে যা ইচ্ছে তা করার অধিকার থাকলেও আমার জন্য একটি আলাদা থালায় ভাত বেড়ে আনতে পারেন না তিনি, ঝকে হাত গুটিয়ে রাখতে হয়। হাতের পায়ে পায়ে আশঙ্কা, কেউ জেনে যেতে পারে অতিথির পরিচয় এবং জানিয়ে দিতে পারে আশেপাশের কাউকে। তারপর এক কান থেকে একশ কান। এইসব ঝামেলার চেয়ে ঝ মনে করেন তাঁর নিজের খাবার থেকে আমাকে ভাগ দেওয়াটাই নিরাপদ। ঝর জন্য কষ্ট হয়। আপিস করে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে আধপেট খাচ্ছেন। নিজের ভাগে আমি কৌশলে কম খাবার নিতে চেষ্টা করি।
খেয়ে ঝ একটি সিগারেট ধরান। মেঝেতেই আধশোয়া হয়ে সিগারেট ফোঁকেন। গলা চেপে, প্রায় শব্দহীন স্বরে বললেন যে আপিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে তিনি বিশাল এক মিছিল দেখেছেন মোল্লাদের। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, হরতাল যদি করে ফেলতে পারে মোল্লারা তবে সব্বনাশ হয়ে যাবে। এটা এখন বড় একটা চ্যালেঞ্জ আমাদের জন্য। মোল্লারা ডাকলেই যে হরতাল হয় না এ দেশে, তা আমাদের প্রমাণ করতেই হবে।
ঝর হাতে তাঁর তারহীন ফোনটি। তার কণ্ঠস্বর যদি কারও কানে যায়, ভেবে নেবে বুঝি ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলছেন তিনি। ঝর কাছে সরে এসে ঘরের বাইরে শব্দ না যায়, এমন স্বরে বলি,আপনার কি মনে হয় হরতাল বন্ধ করা সম্ভব হবে?
–এখনও বুঝতে পাচ্ছি না। মোল্লাদের মিছিল তো বিশাল হচ্ছে। ওরা অরগানাইজড। আমাদের গুলোই অরগানাইজড না। এর এটা ভাল লাগে তো ওর ওটা ভাল লাগে না। হাসিনা কি করছে এ সময়? কিচ্ছু না।
ঝ একটি সিগারেট আমার দিকে ছুঁড়ে দেন। সিগারেটে আগুন জ্বালিয়ে একটি টান দিতেই কাশি শুরু হয়। দু হাতে মুখ চেপে কাশি থামাই। সিগারেটটি আমার আঙুল থেকে আলগোছে নিয়ে ঝ সেটি ফুঁকতে থাকেন।
ঝ এখানে বেশি ক্ষণ বসে থাকতে পারেন না। তাঁকে খোঁজা শুরু হলে মুশকিল। তিনি চলে যান। আমি কাতর অনুরোধ করি আজকের পত্রিকাগুলো দিতে। ঘন্টা পার হলে দরজার তল দিয়ে কিছু পত্রিকা ঢুকে যায় এ ঘরে। যেন সারাদিন উপোস থাকার পর এই মাত্র কিছু খাবার জুটেছে, গোগ্রাসে খাবার গেলার মত করে গোগ্রাসে খবর গিলি।
দেশে এখন এটিই সবচেয়ে বড় সংবাদ। হরতাল এবং হরতাল প্রতিরোধ। এমনই অবস্থা এখন যে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি প্রতিরোধ জাতীয় কমিটিকে ঘোষণা দিতে হয়েছে, যে আমরাই কোরআনের পক্ষ শক্তি। ৩০ জুনের হরতালের সপক্ষে স্বাধীনতা বিরোধী সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তিসমূহ পবিত্র কোরআন শরীফকে রক্ষার জন্য হরতাল বলে যে অপপ্রচার চালাচ্ছে তা সম্পূর্ণ ভাঁওতাবাজি। কারণ এটা বিশ্বজনীনভাবে স্বীকৃত যে মওদুদী কোরআনের অপব্যাখ্যা করেছে এবং তারই সংগঠন জামাতে ইসলামী কোরআনকে বিকৃত করে অপব্যবহার করে ধর্ম ব্যবসা চালাচ্ছে। এরা আসলে ধর্মের নামে ব্যক্তি স্বার্থ, ব্যবসায়ী স্বার্থ এবং রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে চায়। তাদের এবারের টার্গেট হচ্ছে প্রগতিশীল সংবাদপষেনর কণ্ঠরোধ করা। অতএব ৩০ জুনের হরতালের সপক্ষে তাদের দাবি সর্বৈব মিথ্যা এবং জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপকৌশল। একাত্তরের হত্যাকারী ভণ্ড মওলানারা কি করে কোরআন ও ইসলাম রক্ষা করতে পারে? বরং এরা কোরআনের কথা বলে মওদুদীবাদকে রক্ষা করার হীন চক্রান্ত করছে। এদেরকেপ্রতিরোধের মাধ্যমেই পবিত্র কোরআনকে রক্ষা করা যাবে এবং এই কমিটি পবিত্র কোরআনকে রক্ষা করার জন্যই এ হরতাল প্রতিরোধের আহবান জানাচ্ছে। প্রকৃত ইসলামের ক্ষতি করার সাধ্য এ ধরনের মওলানা ও স্বার্থা−ন্বষী ধর্ম ব্যবসায়ীদের নেই। সাধারণত হরতাল ডাকা হয় অধিকার আদায়ের জন্য, অথচ ঐ অপশক্তিরা সংবাদপত্রসহ গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের জন্য এই হরতাল ডেকেছে। সভায় সর্বসম্মত অভিমত ব্যক্ত করা হয়, আমরাই কোরআনের পক্ষ শক্তি।
