শেষের এই কথাগুলি খুব প্রয়োজনীয়। –‘যে প্রতিক্রিয়াশীল, ফ্যাসিবাদী, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপশক্তির দাপট বাড়ছে বৈ কমছে না, তাদের বিরুদ্ধে সুদৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহবান জানাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তির প্রতি। প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের প্রতি। এই অশুভ শক্তিকে প্রতিহত করতে না পারলে বিপণ্ন হবে আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতি। মানবতাবাদী, প্রগতিশীল চিন্তাধারা রুদ্ধ হয়ে যাবে। আমরা নিমজ্জিত হব মধ্যযুগীয় অন্ধকারে, কূপমণ্ডুকতায় আবিল হয়ে উঠবে আমাদের জীবন। যাদের পূর্বসুরীরা কাজী নজরুল ইসলামের মত মহৎ প্রাণ কবিকে কাফের আখ্যা দিতে পারে, তারা এ দেশের সৃজনশীল লেখক ও ভাবুকদের বাকরুদ্ধ করতে এতটুকু দ্বিধা করবে না। এখন থেকেই সেই পাঁয়তারা চলছে তাদের। আমরা কি এদের বশ্যতা স্বীকার করবো, না কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রেখে এই অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবো, এর সদুত্তর এই মুহূর্তেই দিতে হবে আমাদের। নইলে বড় বেশি দেরি হয়ে যাবে। যেসব ফতোয়াবাজ মনে করে যে তাদের বিরুদ্ধে কথা বলা মানেই ইসলামের বিরুদ্ধে কথা বলা তারা ফণা তুলেছে, সেই ফণা দেখিয়ে অনেককে দলে টানার অপচেষ্টায় মেতেছে। সূক্ষ্ম রাজনৈতিক তত্ত্ব বিশ্লেষণ বাদ দিয়ে এখন ঐক্যবদ্ধভাবে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এই ফণার ছোবল থেকে বাঁচাতে হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে। লক্ষ লক্ষ মানুষের আত্মত্যাগে অর্জিত আমাদের প্রাণের স্বদেশকে পাকিস্তান বানানোর চক্রান্তকে নস্যাৎ করতে হবে।’
আজ কবীর চৌধুরী আর সৈকত চৌধুরী দুজন মিলে একটি কলাম লিখেছেন আজকের কাগজে। মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়? এই প্রশ্ন তাঁদের। কলামটি আমার প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করেছেন, মামলার ব্যাপারটি তুলে মন্তব্য করেছেন, আবেগ এবং যুক্তির কথা বলেছেন। জ্ঞধর্ম পুরোপুরিভাবেই ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি ও বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে সঞ্চারিত হয়, মানুষ যখন আবেগের স্রোতে গা ভাসায়, তখন যুক্তির চোখ অন্ধ হয়ে যায়। বলেছেন, যুক্তি মানুষকে সভ্য হতে শেখায়, প্রগতি, কল্যাণ এবং এবং সভ্যতার ধারাবাহিত ক্রমবিকাশের গতিবেক ত্বরান্বিত করে। অন্ধ আবেগ সকল যুক্তির শালিনতাকে বর্বর ভাবে বর্জন করে, যা স্বাভাবিকভাবেই মানবসমাজ এবং মানবতাবাদের গুরুতর ক্ষতি সাধন করে। আর আবেগের এই সর্বগ্রাসী ক্ষুধা সঙ্গত কারণেই কুসংস্করাচ্ছত, অজ্ঞ, পশ্চাৎপদ ও দারিদ্র্যপূর্ণ জনজীবনে জায়গা করে নেয়। কারণ নিয়তিবাদী মানুষ ধর্মগ্রন্থ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং জীবন যাপনে ধর্মের পারলৌকিক বীজমন্ত্রে দীক্ষিত হয়। আবার এই আবেগকে পুঁজি করে একদল কায়েমী স্বার্থপর বংশীবাদক সমাজে তাদের সীমাহীন লালসার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেয়। একচোখা, বৈষম্যপূর্ণ এই সমাজব্যবস্থায় নিপীড়নের শিকার জন সাধারণ মানুষ। রিক্ত নিঃস্ব এই মানুষগুলো পরবর্তীকালে আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না যার ফলশ্রুতিতে সভ্যতার ক্রমবিকাশ ব্যবস্থায় পুরোপুরি ধস নামে। ..
এদিকে মৌলবাদীরা যখন নুরজাহানকে মাটিতে পুঁতে হত্যা করছে, ধর্মের নামে অমানবিক ফতোয়া দিয়ে জনহিতকর প্রতিষ্ঠান এবং সংবাদপত্র অফিসগুলোতে হামলা চালাচ্ছে, গত ৩ জুন পুরানা পল্টন সিপিবি অফিস সংলগ্ন বইয়ের দোকান পাঠকমেলায় অবাধ লুটতরাজ এবং কোরান হাদিস শরীফের অবমাননা করেছে তখন ধর্মের ভেকধারী এই সরকার কেন তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না? গোটা জাতির কাছে আজ এই প্রশ্নের জবাব সরকারকে দিতে হবে। নয়ত সরকার, প্রগতিশীল সকাল কার্য রোধ করার মাধ্যমে নিন্দিত, ঘৃণিত, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে তুষ্ট করছে বলে প্রমাণিত হবে। মূলত এই ঘটনার মধ্য দিয়ে সরকার স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিকে মদদ যোগাচ্ছে। দলগুলোর লাগাতার সংসদ বর্জন, বাজেট অধিবেশনে বিরোদী দলগুলোর অনুপস্থিতি সম্ভাব্য রাজনৈতিক সংকট থেকে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানোর কৌশল হিসেবে সরকার এই রাজনৈতিক অপকৌশল বেছে নিয়েছে । কিন্তু এই কৌশল সরকারের জন্যে আত্মঘাতী হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিগত সময়ে তসলিমার জীবননাশের হুমকি, মাথার জন্য পুরস্কার ঘোষণা, লজ্জা উপন্যাস নিষিদ্ধকরণ এবং তসলিমার পাসপোর্ট আটককে সরকার নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিশ্বের কাছে পরিচিত করতে চেয়েছিল। অবশ্য তসলিমার নিরাপত্তার ব্যবস্থাসহ জীবননাশমূলক উস্কানিদাতাকে গ্রেফতার না করায় সরকারের প্রতি সকল সচেতন মহলের নিন্দা অব্যাহত ছিল। বর্তমানে উদ্ভূত সংকট নিরসন না করে জনগণের দৃষ্টি অন্যত্র সরানোর চেষ্টায় সরকার তসলিমার বিরুদ্ধে একতরফা এই অপতৎপরতা শুরু করেছে। কিন্তু এর ফলে দীর্ঘ সময় ধরে লুকিয়ে রাখা সরকারের মৌলবাদী রূপটি জনসমক্ষে প্রকাশ হয়ে পড়েছে। যতই এই ছদ্মবেশ খসে পড়ছে, আমরা ততই আতঙ্কিত হচ্ছি। কারণ সীমাহীন কূপমণ্ডুকতা, পশ্চাদপদ চিন্তা চেতনা সরকারের চরিষেন স্থায়ী ছাপ এঁকে দিচ্ছে। এতে করে খুব শিগগিরই আন্তর্জাতিক অঙ্গণে বাংলাদেশ মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। বস্তুত, তসলিমার বিরুদ্ধে সরকারের এই বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ সম্পূর্ণভাবে পূর্ব পরিকল্পিত। বিগত সময়ের ফতোয়ার মাধ্যমে তসলিমার মৃত্যুদণ্ডাদেশ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে তসলিমা আইনের আশ্রয় চেয়ে বসেন। বাধ্য হয়ে শুধু লজ্জা উপন্যাস নিষিদ্ধ ঘোষণা এবং পাসপোর্ট আটকের মধ্য দিয়ে সরকারকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। পরবর্তী সময়ে তসলিমার স্বপক্ষে এবং সরকারের বিপক্ষে বিশ্বব্যাপী যে জনমত গড়ে ওঠে তাতে সরকার তার পাসপোর্ট ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সরকার তককে তককে ছিল কবে, কখন, কোথায় তসলিমা সর্বজনীনতা উপেক্ষা করে নিজস্ব কোনও মন্তব্য করেন এবং সরকার তাঁর বিরুদ্ধে আইনের(!) মাধ্যমে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। এ কথা আজ সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত যে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় কর্তৃক তসলিমার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের, এবং জলে স্থলে অন্তরীক্ষে তসলিমার বহির্গমনের বিধিনিষেধের সরকারি মৌলবাদী চরিষেনর মুখোশ উন্মোচিত করে দিয়েছে, যা তাদের ক্রোধান্বিত জিঘাংসারই বহিঃপ্রকাশ। তসলিমার প্রতি সরকারের এই আগ্রাসন লেখকের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। তাই আমরা সরকারের প্রগতিবিরোধী সকল মৌলবাদী কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানাই এবং এর বিরুদ্ধে সকল প্রগতিশীল সকল বিবেকবান মানুষ, সমাজ ও সম্প্রদায়কে সোচ্চার হবার অনুরোধ জানাই।’
