–স্বপ্ন স্বপ্ন স্বপ্ন …. বসে বসে স্বপ্ন দেখলে কচু হবে। কাজ করতে হবে। বাস্তব জগতের মুখোমুখি হতে হয়। হয়েছো কখনও? কখনও গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে মেয়েদের সঙ্গে কথা বলেছো? কথা বলতে হবে তাদের ভাষায়। জানো তাদের ভাষা? আমি চুপ করে থাকি। মাথাটি ধীরে ধীরে নত হতে থাকে।
–দেশের আশি ভাগ মেয়ে অশিক্ষিত। তুমি যে দাবি করছ তুমি মেয়েদের জন্য লেখ, কজন মেয়ে তোমার লেখা পড়তে পারে? কোন মেয়েরা তোমার লেখা পড়ছে? লেখাপড়া জানা মেয়েরা পড়ছে। লেখাপড়া জানা মেয়েদের স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ থাকে, তারা যদি সুযোগ না নেয়, তবে সেটা তাদের দোষ। যাদের স্বাবলম্বী হওয়ার ইচ্ছে, যাদের সুযোগ নেই, তাদের সাহায্য করতে হবে।
হঠাৎ উঠে পড়লেন ছ। অনেকক্ষণ বসে থাকলে পিঠে তাঁর যন্ত্রণা হয়। তাঁর এখন শুয়ে বিশ্রাম নিতে হবে দু ঘণ্টা।
আমি উঠে যাই ঘরে। ঘরে বসে থাকি। নিজেকে বড় তুচ্ছ, বড় অকর্মণ্য, বড় বোকা বলে মনে হতে থাকে। নিজের ওপর আমার রাগ হতে থাকে, ঘৃণাও হতে থাকে। নিজের দু গালে দুটো চড় কষাতে ইচ্ছে করে।
৩. অতলে অন্তরীণ – ১২
পনেরো জুন, বুধবার
ঙ আসেন ছর বাড়িতে। ঙ ছকে চেনেন ভাল করে। একসময় তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহপাঠী ছিলেন। ছ ঙকে তাঁর ঘরে নিয়ে সেই তাঁদের আগের সময়ের গল্প করেন। দীর্ঘক্ষণ। এত জোরে কথা বলেন ছ যে আমার ঘর থেকে সেসব কথা শোনা যায়। ঙ কি বলছেন, তা শুনতে চেয়েও পারি না, ঙর স্বর অনেক খাদে। ছর গল্পের মধ্যে খানিকটা ফাঁক পেয়ে ঙ আমার সঙ্গে দেখা করার অনুমতি চান ছর কাছে। অনুমতি পেলে ঙ আমার ঘরে ঢোকেন। ঙকে দেখে কি যে ভাল লাগে আমার! একদমে জিজ্ঞেস করি, জামিনের খবর কি কিছু জানেন? ক কি জানেন জামিন হবে কি না? উকিলের কাছে ক বা আপনি কেউ গিয়েছিলেন? মৌলবাদীদের এই উত্থান ঠেকাতে কোনও দল কি পথে নামবে না? কর কাছে কি আমার দাদারা কেউ গিয়েছিলেন? আমার বাড়ির মানুষগুলো কি বেঁচে আছে? আমার উকিল কি আশা ছেড়ে দিয়েছেন? জনকণ্ঠের সাংবাদিকদের তো জামিন হয়েছে, আমার হবে না কেন?
ঙর কপালে বিন্দু বিন্দু দুশ্চিন্তা। ঙ আমার সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি, কেবল বললেন, এই সময়ে কি করা উচিত আমাদের, কিছু বুঝতে পারছি না। জামিনের ব্যাপারে তোমার উকিল এখনও এগোতে পারছেন না।
হঠাৎ ছ চিৎকার করে ঙকে ডাকলেন। ঙকে আমার ঘর ছাড়তে হল। ছ চা খেতে ডেকেছেন ঙকে। ও ঘরে চা বিস্কুট দেওয়া হয়েছে। আমার খুব ইচ্ছে করছিল ছর ঘরে আমিও যাই, কিন্তু আমাকে না ডাকলে আমার যে ওঘরে ঢোকা উচিত হবে না। আমি একটি ডাকের অপেক্ষায় থাকি। অপেক্ষায় থাকি ঙ আবার আমার ঘরে ঢুকবেন। অপেক্ষার অস্থিরতা একবার আমাকে বিছানা থেকে উঠে চেয়ারে বসায়, চেয়ার থেকে আবার বিছানায়। আধঘন্টা পার হলে ভেজানো দরজা ঠেলে ঘরে উঁকি দেন ছ, ছর ঘাড়ের পেছনে ঙর মাথা। ছ বললেন, ঙ চলে যাচ্ছেন। ঙ পেছন থেকে কেবল বললেন, যাচ্ছি তসলিমা।
ঙর কপালে তখনও বিন্দু বিন্দু দুশ্চিন্তা। আমার চোখের আকুলতাটি ঙ পড়তে পারেন। আমিও পড়তে পারি ঙর ব্যগ্রতা আমার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলার। কিন্তু পরিস্থিতি আমাদের সে সুযোগ দেয় না।
ছ কি কারণে আমাকে ঙর সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলতে দিলেন না, তা আমি বুঝতে পারি না। ঙ তো এ বাড়িতে আমার সঙ্গে দেখা করতেই এসেছিলেন। ঙর জন্য মায়া হয় আমার। ঙ চলে গেলে ছ আমার ঘরে এলেন। বসে তিনি বলতে লাগলেন, কি করে তিনি নিজের পায়ে দাঁড়ালেন, কে কে তাকে সাহায্য করেছিল, কে কে করেনি, তাঁর কন্যারা কে কোথায়, কি করছে ইত্যাদি। ছ র কন্যারা বড় বড় ডিগ্রি নিয়েছে, বড় বড় কাজ করছে। কেউ দেশে থাকে, কেউ বিদেশে থাকে। ব্যস্ত জীবন তাদের। ছর জীবন খুব সার্থক জীবন। খুব সুখী তিনি। অতৃপ্তির লেশমাত্র নেই। কিছু পাওয়া হয়নি বলে কোনও আফসোস নেই ছর। ছ জীবনে যা চেয়েছিলেন, তারও চেয়ে বেশি পেয়েছেন। এত সুখী তৃপ্ত মানুষটির দিকে তাকিয়ে থেকে থেকে হঠাৎ আমার মনে হয় সব অর্জন করা ছ তাঁর পিঠের যন্ত্রণার মত একটি সূক্ষ্ম একাকীত্বের যন্ত্রণাতেও ভোগেন।
৩. অতলে অন্তরীণ – ১৬
উনিশ জুন, রবিবার
শামসুর রাহমান কলাম লিখেছেন ভোরের কাগজে, নইলে বড় বেশি দেরি হয়ে যাবে। শুরুতে বলেছেন জ্ঞআমরা যারা লেখক শিল্পী এবং সাংবাদিক তারা আজ অত্যন্ত উদ্বিগ্ন এবং বিপন্ন। দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষে আমরা স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি। পথে নেমেছি, বহু ঝুঁকি নিয়ে লড়াই করেছি আমরা। .. স্বৈরশাসককে হটিয়ে আমরা উল্লসিত হয়েছিলাম, তিন জোটের রূপরেখা বাস্তবায়িত হবে ভেবে আশান্বিত হয়েছিলাম। .. জনগণের রায়ে একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হল। বহুদিন পর গণতন্ত্রের উজ্জ্বল মুখ দেখার আশায় উদগ্রীব হয়ে রইলাম। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতাসীন হয়েই বেমালুম ভুলে গেল তিন জোটের রূপরেখার কথা। গণতন্ত্রের লেবাসের আড়ালে স্বৈরাচারই বহাল রয়েছে। বর্তমান সরকারের ক্রিয়া কলাপে আজ গণতন্ত্র সঙ্কটাপন্ন। গণতন্ত্রের একটি প্রধান শর্ত বাক স্বাধীনতা। প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বাক স্বাধীনতা খর্ব করার কোনও অবকাশ নেই। যত মত তত পথ। প্রত্যেকেরই নিজের মত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। ঈশ্বরে বিশ্বাসী কোনও ব্যক্তি যেমন নিজের মত প্রকাশ করতে পারবেন, তেমনি একজন নিরীশ্বরবাদীও স্বমত প্রকাশ করতে পারবেন। নিজ নিজ মত প্রকাশের জন্যে কেউ নিগৃহীত, উৎপীড়িত হবেন না — এটাই গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত। জাতিধর্ম নির্বিশেষে সবাই সমান অধিকার ভোগ করবেন। আস্তিক এবং নাস্তিকের অধিকার অভিন্ন থাকবে। ফরাসি লেখক ভলতেয়ার বলেছেন, তোমার মতের সঙ্গে আমি একমত নই, কিন্তু তুমি যাতে অকুণ্ঠচিত্তে নিজের মত প্রকাশ করতে পারো, সেজন্যে আমি আমার রক্তের শেষ বিন্দু দিয়ে লড়ব। ভলতেয়ারের এই অমর উচ্চারণ প্রকৃত গণতন্ত্রেরই বাণী। কিন্তু আমাদের দেশে কী হচ্ছে? সত্যিকার গণতন্ত্রচর্চা কি হচ্ছে এখানে? সখেদে বলতে হচ্ছে, না। মত প্রকাশের জন্য খণ্ডিত হচ্ছেন লেখক ও সাংবাদিক। মসিজীবীদের ওপর সবসময় খাঁড়া ঝুলছে। কবে কার গর্দান যাবে, কেউ বলতে পারে না। যে লেখক যা বলেননি তা লেখকটির ওপর আরোপ করে তাঁকে দণ্ড দেওয়া হচ্ছে। এখানে স্বাভাবিকভাবে তসলিমা নাসরিনের কথা এসে পড়ে। . .’ এরপর আমার প্রসঙ্গে কিছুক্ষণ বলে সাংবাদিকদের প্রসঙ্গে আসেন, আহমদ শরীফের বাড়িতে হামলার প্রসঙ্গ টানেন। তারপর বলেন, ‘বিএনপি সরকার দেশটিকে ফতোয়াবাজ ও মৌলবাদী দলগুলোর কাছে বন্ধক দিতে আদা জল খেয়ে লেগেছেন। যারা বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের বিরুদ্ধে ছিল আগাগোড়া, যাদের নেতা (গোলাম আযম) বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরেও বিদেশে স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কাজ করেছে, যারা একাত্তরে ভুল করিনি সগর্বে বলে বেড়ায়, তারাই যখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ব্যক্তিদের দেশদ্রোহী আখ্যা দেয়, তখন তাদের কী আখ্যা দেওয়া যায় তা জনসাধারণের উপরই রইল।’ এরপর, আগাগোড়া নাস্তিক শামসুর রাহমানকে খানিকটা ডিপ্লোমেট হতে হয়, তিনি বলেন, ‘ইসলাম, আমরা জানি, শান্তির ধর্ম। ইসলামের নামে যারা অশান্তির সৃষ্টি করে, ক্ষমতা দখলের জন্যে ধর্মান্ধতার আশ্রয় নেয়, ধর্মকে ব্যবহার করে সওদাগরের মত তখন কি আমরা মারহাবা মারহাবা বলে উল্লাসে ফেটে পড়ব? ইসলাম বিপন্ন, এ কথা সেই শৈশবকাল থেকে শুনে আসছি। যারা প্রকৃত আলেম এবং ধার্মিক, তাঁরা বোঝেন ইসলাম রক্ষার সর্বশক্তি আল্লাহতালার আছে। ইসলামের বিপন্নতা ঘোচানোর অজুহাতে কারো ইসলামের রাখওয়ালা সেজে অন্যদের শান্তি নষ্ট করার, দাঙ্গা ফ্যাসাদ করার কোনও প্রয়োজন নেই। যাকে তাকে মুরতাদ বলে গলাবাজি করাও নিরর্থক। যারা কোনও লেখকের মাথার বিনিময়ে লক্ষ টাকা ঘোষণা করে প্রকাশ্য জনসভায়, সর্বক্ষণ সরলমতি মানুষকে প্ররোচিত করে নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার জন্যে, সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের আবর্জনা বলার ঔদ্ধত্য দেখায়, হত্যার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে, সেসব ফ্যাসিবাদীদের বিরুদ্ধে সরকার কেন গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারি করেন না? কাউকে হত্যা করতে উৎসাহ দান কি দণ্ডনীয় অপরাধ নয়? সরকারের কাছে আমাদের আরেকটি প্রশ্ন, আপনারা হরতাল বিরোধী, হরতাল হলে আপনাদের উন্নয়নের জোয়ারে ভাটা পড়ে, এমন কথা জোরে শোরে বলে থাকেন। কিন্তু ৩০ জুন যে তথাকথিত হরতালের ডাক দেওয়া হয়েছে সে সম্পর্কে আপনারা নিশ্চুপ কেন? এই হরতাল সফল করতেই যেন নীরবে সমর্থন জানাচ্ছেন তাদের প্রতি। ..’
