এ দুটো লেখা আমার মন ভাল করে দেয়। দেশের প্রধান দুজন বুদ্ধিজীবী আজ আমার কথা স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করতে কোনও দ্বিধা করেননি, এবং এ সময়ে সব চেয়ে জরুরি যে বিষয়টি, মৌলবাদীদের প্রতিহত করা, তার আহবান তাঁরা জানিয়েছেন। আমার আর মনে হতে থাকে না যে আমার ফাঁসির ব্যাপারটি আজ খুব বড় একটি ইস্যু। আমার মাথার চেয়ে অনেক মূল্যবান এই দেশটি। দেশটিকে মৌলবাদের কবল থেকে রক্ষা করা এখন সবচেয়ে জরুরি। আমার দুঃখ হয়, মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলনে আমার অনুপস্থিতির জন্য। আমাকে ব্যস্ত থাকতে হবে নিজের ফাঁসিটি ঠেকাতে। ব্যস্ত থাকতে হবে যায় যায় জীবনটিকে যেতে না দিতে। ঙর বাড়িতে আমি, অথচ ঙর সঙ্গে মন খুলে কথা বলার সুযোগ নেই। ঙ এ ঘরে আমার সঙ্গে কথা বললে শব্দ শুনে নিচতলা থেকে যে কেউ উঠে আসতে পারে ওপরে। যে কারও সন্দেহ হতে পারে যে এ ঘরে ঙ ছাড়া অন্য কেউ আছে। ঙ যদি তাকে বাধা দেয় এ ঘরে ঢুকতে, তখন তার সন্দেহ আরও ঘন হতে পারে যে এই ঘরে নিশ্চয়ই নিষিদ্ধ কেউ আছে। এবং তখন এই সন্দেহ একজন থেকে আরেকজনে সংক্রামিত হবে, এবং অবশেষে রাষ্ট্র হবে। নিঃশব্দে বসে থাকা, নিঃশব্দে শ্বাস ফেলা এখন আমার জন্য যেমন জরুরি, ঙর জন্যও তেমন। আমি আমাকে আর ঙকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য শ্বাস বন্ধ করে বসে থাকি, যখনই সিঁড়িতে কারও পায়ের শব্দ শুনি। দোতলায় ঙর শোবার ঘরের পাশেই এই লাইব্রেরি ঘরটি। নিচের তলায় অন্যদের ঘর, বৈঠক ঘর, রান্নাঘর, খাবার ঘর ইত্যাদি। ঙ সকালে আমাকে পত্রিকা দিয়ে গেছেন পড়তে, আর ইশারায় বলে গেছেন, বাথরুমে যেতে হলে যেন একটি টোকা দিই টেবিলে, তাতে তিনি বুঝবেন, আশেপাশে দেখবেন কেউ আছে কি না, তারপর আমাকে ইঙ্গিত করলে আমি ঙর ঘরে দ্রুত ঢুকে লাগোয়া বাথরুমটি যেন ব্যবহার করি। ঙ পাশের ঘরে শুয়ে বসে বই পত্রিকা পড়বেন, কান খাড়া থাকবে আমার টোকায়। আর যেহেতু বাড়ির খাবার আমাকে দেওয়া সম্ভব নয়, আমার জন্য তিনি বাইরে থেকে খাবার নিয়ে আসবেন। দুশ্চিন্তায় গলা জিভ এমন শুকিয়ে আছে ঙর যে কথা তিনি চাইলেও শব্দ করে বলতে পারেন না।
মৌলবাদবিরোধী আন্দোলনে ৩০ জুনের হরতাল প্রতিরোধ কর্মসূচির আহবান প্রথম কোনও রাজনৈতিক দল জানায়নি, জানিয়েছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। ২৭টি সাংস্কৃতিক সংগঠন একাত্মতা প্রকাশ করেছে জোটের সঙ্গে। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়, আরণ্যক, ঢাকা থিয়েটার, নাট্যচক্র, দেশ নাটক, নাট্যকেন্দ্র, ঢাকা নাট্যম, পদাতিক নাট্য সংসদ, গ্রাম থিয়েটার, মুক্ত নাটক দল, নবধারা নাট্য সম্প্রদায়, ঢাকা সুবচন, বাংলাদেশ থিয়েটার, প্রেক্ষাপট, ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠী, গণশিল্পী সংস্থা, ঢাকা থিয়েটার মঞ্চ, স্বরশ্রুতি, কণ্ঠশীলন, মুক্তধারা, কারক নাট্য সম্প্রদায়, শ্রোত আবৃত্তি সংসদ, নটরাজ, দিব্য ঢাকা, বিশ্ববিদ্যালয় চারু শিল্পী পরিষদ। বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) আহবায়ক খালেকুজ্জামান এক বিবৃতিতে মৌলবাদী শক্তি কর্তৃক আহুত ৩০ জুনের হরতাল প্রতিহত করার জন্য সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আহবানকে স্বাগত জানিয়েছেন। বলেছেন, ‘মৌলবাদী শক্তি দীর্ঘদিন থেকেই গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল ধ্যান ধারণার ওপর আঘাত হানার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। ফলে তসলিমা নাসরিনকে উপলক্ষ্য করে ফতোয়াবাজ মৌলবাদী শক্তি বিভিন্ন মতামতের মধ্যে উন্মুক্ত তর্ক বিতর্কের পরিবেশ হরণ করতে চায় যা মত প্রকাশ ও লেখকের স্বাধীনতার পরিপন্থী।’ এদের অপতৎপরতা প্রতিহত করার জন্য সর্বস্তরের গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল মহল ও ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার আহবান জানিয়েছেন তিনি। আজ বিকেল ৫ টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করবে বাসদ। জাতীয় ছাত্রলীগের সভাপতি আশেক খান ও সাধারণ সম্পাদক সুরঞ্জন ঘোষ ফতোয়াবাজ, ধর্মান্ধ, কট্টর মৌলবাদী ও স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিকে রাজনৈতিকভাবে, সামাজিকভাবে প্রতিহত করার জন্য দেশের সকল রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রতি আহবান জানান। ওয়ার্কাস পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য হায়দার আকবর খান রনো বলেছেন ধর্মের আবরণে নৈরাজ্য সৃষ্টি ও ক্ষমতা দখলের চক্রান্তের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে সজাগ থাকতে হবে। ওয়ার্কাস পার্টি ৭ দফা কর্মসূচী নিয়ে ২৭ জুন সমাবেশ করবে। ২৭ জুন ঐক্যবদ্ধ নারীসমাজ ফতোয়াবাজদের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার আহবান জানিয়ে মিছিল করবে। বাংলাদেশ লেখক শিবির হরতাল প্রতিরোধ করার জন্য আহবান জানিয়েছে। আজ গণতান্ত্রিক ছাত্র ঐক্য পরিষদ প্রেস ক্লাবের সামনে সমাবেশ করবে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পরিষদ থেকে হরতাল প্রতিরোধের আহবান জানানো হয়েছে।
আবার একটু শোনা যাচ্ছে যে মৌলবাদীদের হরতাল নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারক মহলে বিরোধ চলছে। দেশে আওয়ামী লীগ কোনও হরতাল ডাকলে সরকার থেকে হরতালের বিরুদ্ধে বাণীর পর বাণী দিতে থাকে, কিন্তু এবারের হরতালের ব্যাপারে একেবারে নিশ্চুপ। কিন্তু কিছু কিছু বিএনপির মন্ত্রী হরতাল বন্ধ করার কথা প্রধানমন্ত্রীর কাছে বলেও কোনওরকম মুখ খোলাতে পারেননি। বিরোধী দলের কেউ কেউ বলছে, যে, সরকারই এই হরতাল করাচ্ছে।
ওদিকে ইবলিসের দোসর তসলিমার ফাঁসির দাবিতে ৩০ জুন হরতাল সফল করার জন্য সভা সমাবেশ মিছিল চলছেই সারাদেশে। ইসলামী ঐক্যজোট ৩০ জুন যে করেই হোক হরতাল করার কথা বলছে। মুসলিম লীগ বলছে। মসজিদে মসজিদে সভা হচ্ছে। ফজলুল হক আমিনী চকবাজারের শাহী মসজিদ চত্বরের বক্তৃতায় বলেছেন, ‘আমাদের ঘোষিত ৩০ জুন তারিখের হরতাল হবে কোরানের ইজ্জত রক্ষার জন্য হরতাল। এই হরতাল প্রতিহত করার শক্তি এদেশে নেই। এই জমিনে আল্লাহর কোরানকে অবমাননা করা হয়েছে, ইনশাল্লাহ এই জমিনেই কোরানী শাসন কায়েম হবে। বর্তমান সংসদে যে অচলাবস্থা চলছে, কোরানী প্রতিষ্ঠা ছাড়া এ অবস্থা থেকে উন্নতি সম্ভব নয়। এদেশের সংসদ চলবে কোরানের বিধান অনুযায়ী, অন্যথায় শান্তি আশা করা যায় না। জাতি আজ দুই শিবিরে বিভক্ত, একদল হল কোরানের ইজ্জত রক্ষা করতে চায়, অন্যদল চায় ইসলাম ও কোরানকে মিটিয়ে দিতে। আগামী ৩০ তারিখেই প্রমাণ হবে কারা থাকবে আর কারা ধুলোয় মিশে যাবে।’
