বাহ চমৎকার। খালি মাঠ পেয়েছো, খেলে যাও। গোল দিয়ে যাও যত ইচ্ছে। তোমাদের তো বাধা দেওয়ার কেউ নেই। বীভৎস কাণ্ড ঘটিয়ে যাচ্ছে! প্রতিদিন, তোমাদের কোনও বিরোধী দল তোমাদের মত পথে নামছে না আজও। সুতরাং জয় তোমাদের। মেরে ফেলো আমাকে। মেরে ফেলো যত বুদ্ধিজীবী আছে দেশে সবাইকে, বন্ধ করে দাও প্রগতির পক্ষের সব পত্রিকা। আইন আনো ব্লাসফেমির বিরুদ্ধে। ইসলামি শাসন কায়েম কর। মেয়েদের ধরে ধরে পুড়িয়ে ফেলো, পাথর মারো। তোমাদের জয় হবেই ইনশাল্লাহ।
দুপুরে খাবার দিয়ে যায় কাজের মহিলা। গোগ্রাসে শুরু করি। ফাঁসির আসামীদের তো ভাল খেতে হয়। খেয়ে নাও তসলিমা, মাছ মাংস খেয়ে নাও, কাল হয়ত তোমার আর খাবার সুযোগ হবে না। বলি কিন্তু খেতে গিয়ে দেখি পারছি না। সুস্বাদু খাবার, কিন্তু খেতে ইচ্ছে করে না, দুমুঠো খেয়েই মনে হয় গলা পর্যন্ত ভরে গেছে খাবারে। বমি বমি লাগে।
বিকেলে ভেজানো দরজা খুলে ছ ঢোকেন ঘরে।
চল, বারান্দায় বসবে চল।
বারান্দায়? চমকে উঠি প্রস্তাব শুনে।
ঘরের মধ্যে যার লুকিয়ে থাকতে হয় দরজা জানালা বন্ধ করে, সে কিনা বাইরের আলো দেখবে! মাথায় শাড়ির আঁচল তুলে দিয়ে ছর পেছন পেছন গিয়ে বারান্দার একটি চেয়ারে বসতে হয়। ভেতর বারান্দাতেই তিনি আমাকে ডেকেছেন বসতে। এখানে বসলে আশেপাশের বাড়ি থেকে কারও দেখার সুযোগ নেই। চেয়ারে হেলান দিয়ে তিনি বলেন, আমার বাড়িতে কত আণ্ডারগ্রাউণ্ড পার্টির লোক এসে থেকেছে। আমি জানি কি করে তাদের রাখতে হয়।
এরপর তিনি বলতে থাকেন সেই কথাগুলো, যেগুলো আজ সকালেই তিনি বিস্তারিত বলেছেন। কি করে তিনি এই জায়গায়, যেই জায়গায় তিনি এখন, এসে পৌঁছলেন, কত কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে তাঁর, মনের জোর তাঁর কি রকম প্রচণ্ড ছিল।
হঠাৎ বললেন, আমি একটা জিনিস বুঝতে পারি না, তোমার মত নিরীহ মেয়ে, যার গলায় স্বর নেই, মনে তেজ নেই, তোমাকে মোল্লারা মারতে চায় কেন?
আমি মাথা নত করি।
জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কী লেখ যে মোল্লারা ক্ষেপে যায়?
–ওই ধর্ম নিয়ে লিখেছিলাম বলে।
–ধর্ম নিয়ে কী লিখেছিলে?
–আসলে ধর্ম তো মেয়েদের স্বাধীনতার পথে বাধা ..
ধমকে ওঠেন ছ। –কে বলল তোমাকে বাধা?
ধমকে চমক লাগে।
–আমার যে এনজিওতে এত মেয়েরা কাজ করে, গ্রামের মোল্লারা কি কোনও রকম অসুবিধা করতে পেরেছে? চেয়েছিল দুএকবার, পারেনি। আমি সোজা মসজিদের ইমামের কাছে গিয়েছি কোরান নিয়ে। কোরানের সুরা পড়ে পড়ে তর্জমা করে দিয়ে এসেছি, বলেছি এই দেখ কি লেখা, এখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে মেয়েদের অধিকারের কথা..। কোরান তারা আমাকে শেখাবে কি, আমিই তাদের শিখিয়েছি।
–তাহলে কি আপনি মনে করেন যে ধর্মীয় আইনে মেয়েদের ..
আমি কথা শেষ করতে পারি না, তিনি বলেন, এ দেশে যে ধর্মীয় আইন আছে, তা যদি মেনে চলা হত, মেয়েদের ৯০ ভাগ দুর্দশাই কেটে যেত।
–ধর্মীয় আইনে তো….
–তালাক হলে স্ত্রীকে খরপোষ দেওয়ার কথা আছে। কজন স্বামী খরপোষ দেয় স্ত্রীকে? দেয় না। মেয়েরাও জানে না যে এত ভাল আইন তাদের পক্ষে আছে। বিয়ের সময় যে দেনমোহরের কথা বলা হয়, কজন স্বামী দেনমোহর দেয় স্ত্রীকে? দেয় না। আইন অমান্য করে। মেয়েরা যদি জানত এইসব আইনের কথা, তারা মামলা করতে পারত স্বামীদের বিরুদ্ধে। চার বিয়ের কথা বল? কোরানে স্পষ্ট লেখা আছে, যদি চারজন স্ত্রীর প্রতি সমান ব্যবহার করতে না পারো, তবে চারটে বিয়ে করবে না, একটি করবে। এটাই তো প্রমাণ যে চারটে বিয়ে না করার জন্য বলা হয়েছে। কোন স্বামী পারবে তার চার স্ত্রীকে একইরকম মর্যাদা দিতে, একই রকম ভালবাসতে? পারবে না, নতুন বউএর প্রতি তাদের বেশি আকর্ষণ থাকবে। না, ধর্ম আমাদের জন্য কোনও সমস্যা নয়। সমস্যা হল অর্থনৈতিক সমস্যা। মেয়েরা যদি শিক্ষিত হয়, স্বাবলম্বী নয়, তবেই তাদের সব সমস্যা দূর হবে। ধর্ম তো কাঠমোল্লাদের নয়, ধর্ম আমাদের। আমাদের দাবি করতে হবে যে আমরা ধর্ম মানি। ধর্মকে বাজে লোকের সম্পত্তি করতে দিলেই তারা বাজে ভাবে ধর্মের ব্যাখ্যা করবে। ইসলাম ধর্মে মেয়েদের যত মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, অন্য অনেক ধর্মেই তত মর্যাদা দেওয়া হয়নি। মেয়েরা উত্তরাধিকার সূষেন বাপের সম্পত্তি পায়, হিন্দু ধর্মে তো তা পায় না, ভারতে আইন করতে হয়েছে মেয়েদের সম্পত্তি দেবার জন্য। ইসলাম ধর্মে আছে যে সম্পত্তির ভাগ মেয়েদের দিতে হবে, কজন মেয়ে সেই সম্পত্তি সত্যিকারের পায়? পায় না, কেন পায় না? কারণ তাদের দেওয়া হয় না। ধর্মে যে অধিকারগুলো আছে, সেই অধিকার পাওয়ার জন্য আগে চেষ্টা করতে হবে। হঠাৎ করে তুমি ধর্মীয় আইন পাল্টে ফেলে একটা সমান অধিকারের আইন চালু করলে, তাতে কী হবে মনে করছো? মনে করছো ব্যাস এখন থেকে আর কোনও বৈষম্য থাকবে না সমাজে? ভুল।
আমি মন দিয়ে শুনি ছ র কথা। আমার মনে হয় না ছ কিছু ভুল বলছেন, বিশেষ করে সমান অধিকারের আইন চালু করলেই যে নিমেষে বৈষম্য দূর হবে না সে কথা। বৈষম্য তো পিতৃতান্ত্রিক সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এত সহজে এই সমাজে নারী তার অধিকার পাবে, তা আমিও মনে করি না। তারপরও আমাকে যেন তিনি ভুল না বোঝেন আমি বলি, তাঁর বলিষ্ঠ কন্ঠস্বরের পাশে আমার কণ্ঠটি বড় মৃদু, বড় নরম, বলি যে আমি কেবল ধর্ম সম্পর্কে লিখেছি তা নয়, মেয়েদের শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা লিখেছি। শিক্ষা আর অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার পাশাপাশি সমঅধিকারের আইনও যদি থাকে তবে তো আরও ভাল। সেই আরও ভাল অবস্থার জন্য আমার স্বপ্ন ছিল।
