সকালে আমার ঘরে ট্রেতে করে নাস্তা এল। রুটি তরকারি ডিম। ছ আমাকে এত সমাদর না করলেও পারতেন, কিন্তু ছ করেন। তিনি আমার নোংরা কাপড় ধুতে দেবার জন্য বলেন। ঘরের ভেতর ঘোমটায় মাথা ঢেকে বসে থাকার যুক্তি নেই, বলেন। ফাঁক ফোকর! নাহ ফাঁক ফোকর দিয়ে কেউ দেখতে পাবে না। কাজের লোক! কাজের লোকের সাহস হবে না কোনও কিছু রাষ্ট্র করা। তিনি নিজের কথা অনেকক্ষণ বললেন, ছোটবেলায় বিয়ে হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু লেখাপড়া ছাড়েননি। জীবনে অনেক বাধা এসেছে, সব বাধা অতিক্রম করেছেন নিজের একার মনোবল দিয়ে। শুনতে খুব ভাল লাগে সাহসী মেয়েদের কথা। আমি মন দিয়ে শুনি তিনি কেমন কেমন বাধার মুখোমুখি হয়েছেন, কেমন করেই বা ডিঙিয়ে এসেছেন। বিয়ে হয়েছে, বাচ্চা হয়েছে, স্বামী অত্যাচার শুরু করলে স্বামীকে তাড়িয়ে দিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন, ডিগ্রি নিয়েছেন, নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন। কারও কোনও কুকথার পরোয়া করেননি। তিনি একটি নারী উন্নয়ন সংস্থা খুলেছেন, নিরক্ষর মেয়েদের জন্য এই সংস্থার ইশকুল আছে। সেলাইএর, বুননের কাজও দিয়েছেন বেকার মেয়েদের। বললেন, মেয়েদের জন্য কিছু করতে চাও তো তোমার যেতে হবে গ্রামে, গ্রামের মেয়েরা অসম্ভব পরিশ্রমী, ওরা শিক্ষিত হলে, স্বনির্ভর হলে দেশে কোনও সমস্যা থাকবে না। আমি সায় দিই ছর কথায়। এত বড় কাজ করার সুযোগ আমার কখনও হয়নি। এখন তো বেঁচে থাকারই সুযোগ হচ্ছে না। লেখালেখি না করে গ্রামের মেয়েদের স্বনির্ভর করার কাজে সাহায্য করলে সত্যিকার কিছু করা হত, আমি বুঝি। নিজেকে বড় তুচ্ছ মনে হয়, বড় অপদার্থ মনে হয়।
ছ র পড়া শেষ হলে আজকের দুটো পত্রিকা ছ আমাকে পড়তে দেন। ৩০শে জুন হরতাল সফল করার আহবান জানানো হচ্ছে দেশের সমস্ত অঞ্চল থেকে। হরতালের কথা প্রথম তুলেছিল ইয়ং মুসলিম সোসাইটি, এরপর হরতালের প্রস্তাবটি খাচ্ছে দেশের সব মৌলবাদী রাজনৈতিক অরাজনৈতিক দল। দেশের সর্বত্র সভা মিছিল চলছে হরতাল সফল করার দাবিতে। মসজিদের নিরাপদ আঙিনা ছেড়ে মৌলবাদীরা এখন সভা করছে তাদের দাপট নেই এমন এলাকাতেও। ঢাকার গেণ্ডারিয়ায় গতকালের সভায় মুফতী আমিনী বলেছেন, মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই পাবার জন্য তসলিমা মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে। স্পীকারের কাছে লেখা আমার চিঠি সম্পর্কে বলেছেন যে আমি কোরান সংশোধনের কথা এখন অস্বীকার করছি, ভয়ে করছি। বলেছেন, সামান্য অপরাধের কারণে সরকার যদি আসামীদের গ্রেফতার করার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করতে পারে, তবে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ পবিত্রতম গ্রন্থ সম্পর্কে ধৃষ্টতাপূর্ণ উক্তি করার অপরাধে তসলিমাকে গ্রেফতারে পুরস্কার ঘোষণার বাধা কোথায়? ২৫শে জুন সকাল ১১ টায় প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশের ঘোষণা দেওয়া হয় মুফতীর দল থেকে। বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্র পরিষদের সভায় বলা হয়েছে, কুখ্যাত লেখিকা মুরতাদ তসলিমা নাসরিনকে রহস্যজনক ভাবে গ্রেফতার করা হচ্ছে না। পরিস্থিতি বেশিদূর অগ্রসর হতে না দিয়ে এখনও সময় আছে তাকে গ্রেফতার করে বিচার করা হোক। তসলিমার ফাঁসির দাবিতে আগামীকাল সংসদ ভবন ঘেরাও করার জন্য ধর্মপ্রাণ মুসলমান ভাইদের তিনি আহবান জানিয়েছেন। সচেতন মুসলিম যুব ফোরাম, মান্দারপুর ইসলামি পাঠাগার, পাঞ্জেরী পাঠাগার হরতাল সমর্থনের বিবৃতি দিয়েছে। পাঠাগারের লোক পর্যন্ত সংগঠিত হচ্ছে। পাড়ায় পাড়ায় উত্তেজনা এখন। এ কিসের লক্ষণ! আরও একটি বিবৃতি আমাকে কাঁপিয়ে দেয়। ১০১ জন আইনজীবী তসলিমার গ্রেফতার ও বিচার দাবি করেছে। ইত্তেফাকের খবরটি এরকম, বাংলাদেশে সুপ্রীম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের ১০১ জন আইনজীবী গতকাল সোমবার এক যুক্ত বিবৃতিতে ইসলামের শষনুদের মদদ যোগাইতে পবিত্র কোরান শরীফ সম্পর্কে তসলিমা নাসরিনের অবমাননাকর উক্তিতে মুসলমানদের ধর্মীয় চেতনায় চরম আঘাত ও সমাজকে উμছৃঙ্খলতার দিকে ধাবিত করার অপপ্রয়াসে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। আইনজীবীগণ ভবিষ্যতে এই ধরনের কাজ করিতে কেহ যেন সাহস না পায় উহার দৃষ্টান্ত সৃষ্টির জন্য অবিলম্বে তসলিমাকে গ্রেফতার ও বিচারের মাধ্যমে তাহাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিদানের দাবি জানান। তাহারা বলেন, অন্যথায় উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য সকল দায় দায়িত্ব সরকারকেই বহন করিতে হইবে। বিবৃতিদানকারী আইনজীবীদের মধ্যে রহিয়াছেন এস এম আবুল কাসেম, সাবেক বিচারপতি মোঃ আবদুল ওয়াহাব, ব্যারিস্টার শহীদ আলম, ব্যারিস্টার সৈয়দ এমদাদুর রহমান, ব্যারিস্টার ফরিদ উদ্দিন, মোঃ রেজা, ব্যারিস্টার কোরবান আলী, মোঃ গোলাম মাওলা বকুল, মুঃ খলিলুর রহমান রোকনী, সৈয়দা মায়মুনা বেগম ও মোঃ মাহমুদ হোসেন।
আরও একটি খবর, প্রকাশ্যে জনসমাবেশে লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে হত্যার হুমকি ও তার মাথার দাম ঘোষণা করে তাকে হত্যা করতে অন্যকে প্ররোচিত করার অভিযোগে লেখিকার ভাই ফয়জুল কবীর নোমান গতকাল খুলনা মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে ৯ জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করেছেন। .. দাদা খুলনা গিয়েছেন মামলা করতে। মুফতী সৈয়দ নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা, যে মুফতী সেদিন আমার মাথার মূল্য এক লক্ষ টাকা ঘোষণা করেছে। মামলা করার সিদ্ধান্তটি কবে কখন নেওয়া হল, কে নিল কিছুই আমি জানি না। আমি ধারণা করি, উকিলের আপিস থেকেই দাদাকে পাঠানো হচ্ছে খুলনায়। বুক ভরে শ্বাস নিই। এই শ্বাসের সঙ্গে একটি শক্তি আমার শরীরে নেমে আসে। হাতদুটো মুষ্ঠিবদ্ধ করতে পারি অনায়াসে। হাতের মুঠিদুটো আলগা হয়ে আসে যখন খুলনায় দাদার নিরাপত্তাহীনতার কথা ভাবি। দাদার ওপর অভিযোগ ছিল আমার অনেক, বিয়ের পর তাঁর হঠাৎ বদলে যাওয়া, অসহ্য রকম কৃপণ হয়ে যাওয়া, স্বার্থপর হয়ে যাওয়া। আজ দাদাকে তাঁর সব অন্যায়ের জন্য আমার ক্ষমা করে দিতে ইচ্ছে করে। আজ মনে হয় দাদা সত্যিই আমাকে ভালবাসেন, সেই ছোটবেলায় যেমন ভালবাসতেন, তেমন আজও। সেই যে আমার জন্য জামার কাপড় কিনে আনতেন, শীলার কাছে দিতেন নানারকম কায়দা করে জামা বানিয়ে দেবার জন্য, সেই যে বিশ্ববিদ্যালয়ের খাবার পয়সা বাঁচিয়ে ফুটপাত থেকে পুরোনো জামা কিনে আনতেন, রঙ কিনে দিতেন ছবি আঁকার জন্য, আমার আঁকা রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের ছবি টাঙিয়ে রেখেছিলেন দেয়ালে, সেই যে নিজে কবিতা লিখে আমার নামে ছেপে দিতেন তাঁর পাতা পত্রিকায়, চিত্ররূপা স্টুডিওতে সঙ্গে নিয়ে ছবি তুলতেন, সিনেমায় নিয়ে যেতেন, সেই যে সেঁজুতির পাণ্ডুলিপি নিয়ে যেতেন প্রেসে, টাকা দিতেন সেঁজুতি ছাপার, এই দাদাকে আমার সেই দাদা বলে মনে হয়। দাদার সঙ্গে কখনও কি আমার আবার দেখা হবে! খুব ইচ্ছে করে তাঁকে দেখতে। কিন্তু সে কি এ জীবনে আর সম্ভব! আমার সঙ্গে কারওরই কি আর দেখা হবে! পত্রিকাগুলো সরিয়ে আমি শুয়ে থাকি, শৈশব কৈশোর এসে আমার হৃদয় জুড়ে গোল্লাছুট খেলে। গোল্লাছুট খেলাটি হঠাৎ থেমে যায়, যখন চোখ পড়ে সাহাবা সৈনিক পরিষদের কর্মসূচিতে। সিলেটে সাহাবা সৈনিক পরিষদের জনসভায় ২৩ জুন সিলেটে অর্ধদিবস হরতাল পালনসহ দু সপ্তাহের লাগাতার কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে, আজ মঙ্গলবার ১৪ই জুন থেকে ১৬ই জুন পর্যন্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের সাথে যোগাযোগ ও মতবিনিময়, ১৭ জুন বেলা দুটোয় পরিষদ কার্যালয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সাথে মতবিনিময়, ১৮ থেকে ২১ জুন জনসংযোগ সপ্তাহ পালন, ২২ জুন হরতালের সমর্থনে মিছিল ও সমাবেশ এবং ২৩ জুন অর্ধদিবস হরতাল।
