৩০ তারিখে হরতাল সফল করার জন্য টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত ধর্মপ্রাণ মানুষ জেগে উঠেছে। জামাতে ইসলামী ১৭ই জুন দাবি দিবস পালন করার ঘোষণা দিয়েছে। ফ্রীডম পার্টি আর যুব কমাণ্ড মৌলবাদী দলের দাবি সমর্থন করে ইসলামী মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজেদের রাজনৈতিক বক্তৃতা করে যাচ্ছে। এই দলের মূল শষনু আওয়ামী লীগ, আওয়ামী লীগকে উদ্দেশ্য করে বলে যাচ্ছে, ভারতীয় দালালচক্র পুনরায় দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে, শেখ হাসিনা ধর্মবিদ্বেষী তসলিমার পক্ষ সমর্থন করে বিবৃতি দিয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। জামাতে ইসলামী ফ্রীডম পার্টির সঙ্গে এক মঞ্চে দাঁড়াচ্ছে। জামাতে ইসলামী বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ দু দলেরই যদিও সমালোচনা করছে, কিন্তু জামাতের নেতারা জানে আগামী নির্বাচনে দুই বড় দলের একটির সঙ্গে তাদের দলকে মেলাতে হবে। শেখ হাসিনা এখন মৌলবাদী দলের খুব বিপক্ষে যাবার চিন্তা করছেন না, কারণ আগামী নির্বাচনে বিএনপিকে হারাতে হলে তাঁর দরকার জামাতে ইসলামির সহযোগিতা। এই মৌলবাদী উত্থানে আশ্চর্যভাবে শেখ হাসিনা নীরব। ক্রমাগত দোষ দিয়ে যাচ্ছেন যাবতীয় কিছুর জন্য বিএনপিকে। কিন্তু জামাতে ইসলামী বা অন্য মৌলবাদী দলের বিরুদ্ধে রা শব্দ নেই। জামাতে ইসলামীর মত মূল্যবান এ মুহূর্তে আর কোনও রাজনৈতিক দল নেই। বিএনপিও চাইছে জামাতে ইসলামীকে হাতে রাখতে। শেখ হাসিনার জন্য এ একটি অস্বস্তিকর অবস্থা, বুঝতে পারি। এখন মৌলবাদীদের জাগরণ থামাতে তিনি যদি আন্দোলনে নামেন, তবে তাঁকে ধর্মবিরোধী হিসেবে দোষ দেওয়া হবে। এই কাজটি তিনি করতে রাজি নন। কারণ মৌলবাদীর ভোট না জুটলেও তিনি দেশের পঁচাশি ভাগ মুসলমানের ভোট থেকে বঞ্চিত হতে চান না। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা করার বিরুদ্ধে বললেও তসলিমার মামলার বিরুদ্ধে তিনি একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। কারণ জনকণ্ঠের সাংবাদিকদের গায়ে ধর্মহীনতার কালি তত নেই, যত আছে তসলিমার গায়ে। মূলত জনকণ্ঠের সাংবাদিকরা সকলেই আস্তিক, তাঁদের কেউ কখনও কোনওদিন দাবি করেননি যে তাঁরা ধর্মপ্রাণ মুসলমান নন। তসলিমার পক্ষে মুখ খুললে হাসিনার কোনও লাভও নেই, কারণ তসলিমার কোনও দল নেই, জনসমর্থন নেই।
গতকাল সংসদে তসলিমা নাসরিন প্রসঙ্গ উঠেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আবদুল মতিন চৌধুরীকে ব্যাখ্যা করতে হয়েছে যে আমার পাসপোর্ট আটক করা হয়েছিল এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। আমার অপকর্মের জন্য এই মামলা করার আগেও যে এই সরকার আমাকে কিছু শাস্তি দিয়েছে সে সম্পর্কে বলে তিনি প্রশ্নকারী সাংসদদের শান্ত করেন। এদিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন কমিটি ও জাতীয় সমন্বয় কমিটির ঢাকা মহানগরীর আহবায়ক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া উর্দুভাষী স্বরাষ্ট্র সচিবের অপসারণ দাবি করে বিবৃতি দিয়েছেন। বলেছেন, বাঙালিরা বুকের রক্ত দিয়ে লড়াই করে মাতৃভাষা বাংলা ভাষাকে অর্জন করেছে। স্বাধীন দেশে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের একজন সচিব হয়ে রাষ্ট্রীয় ভাষাকে অস্বীকার, হেয় প্রতিপন্ন, অবমাননা করে সচিব বলেছেন যে তাঁর মাতৃভাষা বাংলা নয়, উর্দু, এতে প্রমাণ হয় যে তিনি এ দেশের নাগরিক নন। একজন বিদেশী নাগরিক, ভিন্নভাষী রাষ্ট্রীয় উμচপদে ক্ষমতায় থাকতে পারে না।
ছোট খাটো ভুল ষনুটি ধরে ছোট খাটো দল প্রতিবাদ করছে। কিন্তু মূল যে ইস্যু ইসলাম, সেটি নিয়ে কথা বলার সাহস কোনও দলেরই নেই। কেউ জোর বলতে পারছে না যে না আমরা ইসলামি শাসন চাই না, ব্লাসফেমির বিরুদ্ধে আইন চাই না, তসলিমা ধর্মদ্রোহী হলেও তাঁর ফাঁসি আমরা চাই না। আমরা বাক স্বাধীনতায়, মুক্ত চিন্তায় বিশ্বাস করি। যদি ধর্মের গীত গাওয়ার অধিকার থাকে মানুষের, ধর্মের সমালোচনা করারও অধিকার তেমন আছে।
আজকের আরেকটি খবর, মৃত্যুর হুমকি থেকে বাঁচার জন্য তসলিমার পরিবার আইনবিদদের সাথে আলোচনা করছেন।
মৃত্যুর হুমকি আমার পরিবারও পাচ্ছেন। আমার মৃত্যু হয় হোক, আমার কারণে কেন নিরপরাধ কিছু মানুষের মৃত্যু হবে! চোখে কি জল জমছে আমার। জমছে। দুফোঁটা জল পত্রিকায় মৃত্যুর হুমকি শব্দদুটোর ওপর টুপ করে পড়ে। তসলিমার পরিবার — এই শব্দদুটোয় আমি আলতো করে আঙুল রাখি। যেন স্পর্শ করছি আমার বাবাকে মাকে, স্পর্শ করছি দাদাদের, স্পর্শ করছি ইয়াসমিনকে, ভালবাসাকে। জীবনে আর হয়ত ওদের সঙ্গে দেখা হবে না আমার। তাই স্পর্শ করি। মা নিশ্চয়ই কাঁদছেন দিন রাত। বাবার চোখে তো জল কখনও দেখা যায় না, এ সময় তিনিও সম্ভবত কাঁদছেন। কাঁদছে ইয়াসমিন। বাড়িতে নিশ্চয়ই নাওয়া খাওয়া বন্ধ সবার। আমার কি হয় সেই ভয় তো আছেই, তার ওপর এখন নিজেদের কি হয় তা নিয়েও আশঙ্কা। গভীর গম্ভীর আশঙ্কার সঙ্গে মানুষ কতদিন একটানা বাস করতে পারে!
চোখের জল কাগজে আরও পড়ে, যখন পড়ি কুমিল্লার ছোট একটি শহর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছোট একটি গ্রাম নাসিরনগর থেকে ছোট একটি মানুষ আজহারুল ইসলাম সরকারের লেখা ছোট একটি পত্রিকা সংবাদে ছোট একটি চিঠি–সরকারের বোধগম্য হওয়া উচিত যে মোল্লাতন্ত্রের ফতোয়ায় সমগ্র দেশ আজ আক্রান্ত। সেই ফতোয়াবাজদের মদদে সরকার যদি তসলিমা নাসরিনকে গ্রেফতার করেন তবে জাতির বিবেক কলঙ্কিত হবে। মুক্তচিন্তার স্বাধীনতায় কারও হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। তাই এসব অপতৎপরতা বন্ধে এবং জননন্দিতা তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা প্রত্যাহারের জোর দাবি জানাচ্ছি।
৩. অতলে অন্তরীণ – ১১
চৌদ্দ জুন, মঙ্গলবার
