ছ যে ঘরে আমাকে থাকতে দিয়েছেন, তা এ পর্যন্ত যত ঘরে থেকেছি তার মধ্যে সবচেয়ে ভাল। পুরু গদির বিছানা, মাথার ওপর পাখা। বিছানার পাশে টেবিল, টেবিলে টেবিলল্যাম্প। দোযখ থেকে বেহেস্তে গেলে যেমন আনন্দ হয়, ঠিক তেমন না হলেও কাছাকাছি ধরনের একরকম আনন্দ আমার হয়। বেহেস্ত বাস অনিশ্চিত বলেই বোধহয় আমার আনন্দ হলেও আনন্দ তেমন তীব্র হয় না। বেহেস্তে আমার আয়েশের জন্য বিছানা পাতা। বিছানায় পরিষ্কার চাদর। আপাতত সুনিদ্রা যাও তসলিমা, মনে মনে নিজেকে বলি। আসলে আজকাল আমি লক্ষ্য করেছি নিজেকে অনেক সময় তসলিমা বলে আমার মনে হয় না। আগের তসলিমা আর এই তসলিমাকে আমি মেলাতে পারি না। আমি তসলিমার মত দেখতেই শুধু, আর কিছু মিল দুজনের মধ্যে নেই। সেই সাহসী মেয়েটির ফাঁসি হয়ে গেছে, এখন ধুকধুক আত্মা নিয়ে বেঁচে আছে একটি ভীতু, ভীরু, ত্রস্ত, শঙ্কিত একটি নির্জীব মেয়েমানুষ, ঘোমটা মাথার মেয়ে, নত চোখের মেয়ে, গলা শুকিয়ে আসা, জিভ শুকিয়ে আসা, স্বর বুজে আসা, একটি কাতর করুণ মেয়ে। নিজের দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝে মনে হয় এই আমাকে হাতের কাছে পেলে মোল্লাদেরও মায়া হবে মাথাটি কেটে নিতে।
বিছানায় আধশোয়া হয়ে আজকের পত্রিকাগুলো পড়ি রাতে। সুনিদ্রা কোথায় কখন পালিয়ে গেছে আমাকে একা রেখে, টের পাইনি। মিছিলের ছবির দিকে তাকালেই গা ঠাণ্ডা হয়ে যায়, টুপির সংখ্যা বাড়ছে, কালো মাথার সংখ্যাও বাড়ছে। কালো মাথা যখন সাদা মাথার সঙ্গে এক কাতারে দাঁড়ায়, সেটি শুভ লক্ষণ নয়। এবারের ব্যানার
তসলিমা নাসরিনের ফাঁসি, ব্লাসফেমি এক্ট প্রবর্তন, এবং
দৈনিক জনকণ্ঠ নিষিদ্ধের দাবিতে
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল
ইসলাম ও রাষ্ট্রদ্রোহী তৎপরতা প্রতিরোধ মোর্চা গঠনের লক্ষ্যে সমন্বয় কমিটি
বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে বা দক্ষিণ গেটে প্রথম জনসমাবেশ ঘটে, মঞ্চে বড় বড় নেতা বক্তৃতা করেন, এরপর মিছিল বেরোয় শহরের বড় বড় রাস্তায়। একটি জিনিস লক্ষ করি, বক্তৃতায় আগের চেয়ে তাপ বেশি, তেজ বেশি। লোকসংখ্যা বাড়লে মনের জোর বাড়ে, মনের জোর বাড়লে মন ক্রমে শক্ত হতে থাকে। যে যত বেশি শক্ত কথা বলতে পারে, সে তত বেশি হাততালি পায়। বিরাট সমাবেশে নেতারা বলেছেন, কুখ্যাত তসলিমা নাসরিনের ফাঁসি কার্যকর ও জনকন্ঠসহ ধর্মদ্রোহী পত্রিকাগুলো নিষিদ্ধ করতে সরকার যদি ব্যর্থ হয় তবে আগামী নির্বাচনে এই সরকার আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। জনগণের ঈমানী রোষে সরকার, তসলিমা ও জনকণ্ঠের সমর্থকদের কোনও ঠিকানা খুঁজে পাওয়া যাবে না। ধর্মদ্রোহী তসলিমাগংদের যারাই সাফাই গাইবে তাদেরও ফাঁসি দিতে হবে। বুকের তাজা রক্ত দিয়ে হলেও দ্বীনদার মুসলমানরা ধর্মদ্রোহীদের যে কোনও ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে বদ্ধ পরিকর। যে সমস্ত নেতা নেষনী ও তথাকথিত বুদ্ধিজীবী তসলিমা নাসরিন ও জনকণ্ঠের সাফাই গাইছে তারা ইহুদি ও ভারতীয় দালাল। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সময় যে সব নেতা নেষনী কোনও প্রতিবাদ ব্যক্ত করেনি তারা এখন ইসলাম বিরোধী জনকণ্ঠের পক্ষে বিবৃতি দিয়ে বেড়াচ্ছে। ধর্মদ্রোহী ও রএর এজেন্ট জনকণ্ঠের পক্ষে বিবৃতি দিয়ে শেখ হাসিনা নিজের মর্যাদা নষ্ট করেছেন। বিরোধী দলীয় নেষনী যদি তৌহিদী জনতার সমর্থন চান, তাহলে তাঁকে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। এখন কথা বলার সময় শেষ, এখন ইসলাম বিরোধীদের বিরুদ্ধে জেহাদে নেমে পড়ার সময়। এটা মহরমের মাস, এই মাস বিপ্লবের মাস, এই মাস থেকে আমরা ইসলামি বিপ্লব শুরু করলাম। আমরা জ্বালাও পোড়াও চাই না। কিন্তু আমাদের জ্বালালে আমরাও তাদের জ্বালিয়ে ছাড়ব। ভারতীয় ব্রাহ্মণ্যবাদীরা এই দেশ দখল করতে পারবে না। ইনশাল্লাহ আমরা দিল্লির মসনদে ইসলামের পতাকা উত্তোলন করব। চিহ্নিত একদল নাস্তিক অখণ্ড ভারতের বুলি আওড়িয়ে দেশে বিচ্ছিতত! আন্দোলনকে উস্কানি দিচ্ছে, তাদের শেকড় উপড়ে ফেলা হবে। তসলিমা নাসরিনের ফাঁসির দাবি যদি সরকার বাস্তবায়ন না করে তবে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে হলেও ফাঁসির দাবি জনগণ বাস্তবায়ন করে ছাড়বে ইনশাল্লাহ। সভায় সকল বক্তাই এই ফাঁসির দাবিতে ৩০ জুন দেশব্যাপী হরতাল পালনের জন্য জনগণের প্রতি আহবান জানান। ৬ দফা দাবির স্মারকলিপি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে পেশ করে ইসলামি মোর্চা, তা হল, ১. তসলিমা নাসরিনসহ ইসলাম ও রাষ্ট্রদ্রোহীদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও ফাঁসি, ২. জনকণ্ঠ ও আজকের কাগজ সহ সকল ধর্মদ্রোহী পত্রিকার প্রকাশনা নিষিদ্ধ ঘোষণা, ৩. ব্লাসফেমি এক্ট প্রবর্তন, ৪. এনজিওসমূহের অপতৎপরতা বন্ধ, ৫. রেডিওটিভিসহ সকল প্রচার মাধ্যমে ইসলামী আক্বিদা ও বিশ্বাসের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রচারণা বন্ধ, ৬. কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা করা।
জনকণ্ঠের সঙ্গে এখন আজকের কাগজ যোগ হল। পত্র পত্রিকার সঙ্গে যোগ হল রেডিও টেলিভিশন। আমার ধারণা দিন দিন ওরা আরও অনেক কিছু যোগ করবে। এখন তাদের মুঠোর মধ্যে জনগণের ধর্মীয় অনুভূতি।
আরও খবর, নারী জাতির কলঙ্ক কুখ্যাত লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে গ্রেফতার করে বিশেষ ট্রাইবুন্যালে বিচার ও জনকণ্ঠের ডিক্লারেশন বাতিল এবং ব্লাসফেমি আইন প্রণয়নের দাবিতে চট্টগ্রামে ঢাকার মত বিরামহীন সভা চলছে, মিছিল চলছে। নতুন আরও সংগঠন যোগ দিচ্ছে আন্দোলনে, আল্লামা তৈয়বিয়া সোসাইটি, কুতুবদিয়া ফাউণ্ডেশন , আলআমীন জামে মসজিদ পরিচালক কমিটি, বাংলাদেশ সোসাইটি অব ফর সোসাল ওয়েলফেয়ার। কেবল চট্টগ্রাম আর ঢাকায় নয়, সারা দেশেই এই হচ্ছে। জাতীয় সংগঠন বুঝি আর একটিও বাকি নেই, বাংলাদেশ মজলিসে হেফাজতে ইসলাম, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি, বাংলাদেশে ইসলামী জ্ঞানচর্চা কেন্দ্র, বাংলাদেশ জমিয়াতুল আনসার, মুসলিম সাহিত্য পরিষদ, মাদ্রাসাই উলুমে দ্বীনিয়া ও এতিমখানা, জাতীয়াবাদী ওলামা দল, দেশীয় চিকিৎসক ও ক্যানভাসার কল্যাণ সমিতি। আমার একটি ধারণা হয়, আন্দোলন জোরদার হচ্ছে বলে অনেকে তড়িঘড়ি কিছু সংগঠনও দাঁড় করিয়ে ফেলেছে। আমার আরও একটি ধারণা, কোনও আন্দোলন যদি বলিষ্ঠ হয়, তবে লোকে উৎসাহ পায় সেই আন্দোলনে যোগ দিতে। এমন নয় যে মৌলবাদীরাই কেবল সংগঠিত হচ্ছে, অনেক অমৌলবাদী কেবল ইসলাম ধ্বসে যাচ্ছে আশংকা করে সংগঠিত হচ্ছে। এটিই মারাত্মক।
