ঙ এলেন দুপুরে খুশির খবর নিয়ে। আজ বুদ্ধিজীবীদের বিবৃতি ছাপা হয়েছে পত্রিকায়। সই যোগাড় করেছেন ঙ। তসলিমার বিরুদ্ধে মামলা মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। গতকাল শুক্রবার বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীগণ এক বিবৃতিতে বলেন, সরকার ইচ্ছাকৃত ভাবে আইনের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে লেখিকা তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে মৌলবাদী চক্রের সঙ্গে একাত্ম হয়েছে। সরকারের এ আচরণকে সততা ও নাগরিকের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী অভিহিত করে বিবৃতিতে এর নিন্দা এবং তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, সরকার তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে, লেখিকা তার সত্যতা অস্বীকার করে নিজের অবস্থান পরিষ্কারভাবে ব্যক্ত করেছেন। লেখিকা স্পষ্ট করে বলেছেন, তিনি পবিত্র কোরান সংশোধনের কথা বলেননি, সুতরাং তিনি যে কথা বলেননি সে কথা দ্বারা কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার অভিযোগ অবাস্তব এবং অলীক। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, শরিয়া আইন সংশোধনের দাবি করার অধিকার সকল নাগরিকের আছে এবং এ দাবি ইতিমধ্যে একাধিক মহল থেকে উত্থাপিত হয়েছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এ ব্যাপারে সরকারের আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে ইতিমধ্যে বিল দাখিল করেছে।
মৌলবাদী শক্তির চাপে পড়ে সরকারের এই আচরণের আমরা নিন্দা করি এবং তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে যে মামলা করা হয়েছে তা অবিলম্বে প্রত্যাহার করার দাবি জানাই। আমরা লেখিকার ও তার পরিবারের নিরাপত্তার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি। উগ্র মৌলবাদীরা বারবার তসলিমা নাসরিনসহ দেশের কয়েকজন বরেণ্য বুদ্ধিজীবীর প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে, অথচ সরকার এদের বিরুদ্ধে কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করে লেখক ও সাংবাদিকদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। আমরা এই দুঃসহ পরিস্থিতির অবসান চাই। অবাক হয়ে লক্ষ্য করছি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত এই সরকার একটির পর একটি গণতন্ত্রবিরোধী কর্মে লিপ্ত হয়ে পড়ে গণতন্ত্রকে ক্রমশ বিপন্ন করে তুলছে।
বাইশ জন বুদ্ধিজীবী সই করেছেন, কে এম সোবহান, খান সারওয়ার মুরশিদ, শামসুর রাহমান, কবীর চৌধুরী, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, কলিম শরাফী, মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, ফয়েজ আহমেদ, রফিকুননবী, কাইউম চৌধুরী, আমিনুল ইসলাম, হাশেম খান, মোহাম্মদ রফিক, শফি আহমেদ, হায়াৎ মামুদ, পান্না কায়সার, আসাদুজ্জামান নূর, আলী যাকের, হারুন হাবীব, নাসিরুদ্দিন ইউসুফ, আখতারুজজ্জামান, আলী আনোয়ার..।
আজ আটদিন পর একটি বিবৃতি। মাঝখানে এঁরাই বিবৃতি দিয়েছেন আমার মামলার পরে জারি হওয়া মামলার বিরুদ্ধে। আমি এমন একটি নাম, যে নামটি উচ্চারণ করতে লজ্জা হয়, ভয় হয়। আমি জানি যাঁরা আমার মত প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে, যাঁরা আমার লেখার সঙ্গে একশ ভাগ একমত তাঁদেরও লজ্জা ভয় যায় না। কি জানি কি বলে লোকে, এই আশংকা। কি জানি কি বিপদ ঘটে, আশংকা। আশংকার পরোয়া করে না গার্মেণ্টেসএর ওই দরিদ্র শ্রমিকেরা। সাজু, জাহেদা, লাভলী বিবৃতি দিচ্ছে, সভা করছে। গার্মেন্টসএর আরও শ্রমিক নিয়ে আমরা কজন তসলিমা পক্ষ নামে দল করে সভা করেছে আবার, লিফলেট ছেপেছে। ওরা অচেনা অজ্ঞাত মানুষ, ওদের সভা বা বিবৃতির মূল্য নেই, কিন্তু তারপরও মরিয়া হয়ে অসাধ্য সাধনে নেমেছে। ওরা যেদিন খবর শুনেছে, সেদিনই প্রতিবাদ করেছে। আর আজ যাঁরা প্রতিবাদ করলেন, ভেবে চিন্তে করেছেন, তবু তো করেছেন, করুণা করে হলেও তো করেছেন, নাও করতে পারতেন। যে বিষাদ আমাকে গ্রাস করেছিল গতকাল, তা দূর হয়। দূর হলেও দুর্ভাবনা থেকে মুক্তি জোটে না। এই বিবৃতির কারণে আমার ওপর থেকে মামলা তুলে নেওয়া হবে না, কিন্তু আমার কি অন্তত জামিন পাওয়া হবে? ঙ বললেন যে ক তাঁকে জানিয়েছেন যে আগামীকাল সকালে যে কোনও সময় সম্ভবত আমাকে আদালতে উপস্থিত হতে হবে। হঠাৎ করে আদালতে উদয় হয়ে জামিন চাইতে হবে, এমন একটি ব্যবস্থা করছেন আমার উকিল। ক প্রায়ই উকিলের কাছে খবর নিচ্ছেন কি হচ্ছে না হচ্ছে। জামিনের জন্য যখন আমার উপস্থিতির প্রয়োজন হবে, তখন যেন তাকে জানানো হয়, বলে রেখেছেন উকিলকে। ক ব্যবস্থা করবেন আমাকে আদালতে নেওয়ার। আগামীকাল কটার সময় যেতে হবে, কিভাবে যাবো তার আমি এখনও কিছুই জানি না। ঙর বক্তব্য, আগে থেকে কেউ আসলে কিছুই জানে না। উকিল ককে খবর দেওয়ার দশ মিনিটের মধ্যে আমাকে আদালতে যেতে হবে। বাতাসে খবরটি ওড়ার আগেই যেন আমি উপস্থিত হয়ে জামিন নিয়ে বেরিয়ে যেতে পারি। যাকে বলা হয় ঝড়ের বেগে। কিন্তু বেগটি আদপেই ঝড়ের হবে কি না এ বিষয়ে ঙ ঠিক নিশ্চিত নন। জামিন না হওয়াতক অনিশ্চিত প্রতিটি মুহূর্ত। জামিন আদৌ হবে কি না, হলে কবে হবে। লুকিয়ে থাকা সম্ভব আর হবে কি না, না হলে কী হবে! কে উত্তর দেবে এসবের! পুলিশের চেয়ে শত গুণ আশংকা মোল্লাদের নিয়ে। আজকাল ঘরে ঘরে মোল্লা। এ বাড়ির আশে পাশে কজন মোল্লা বাস করছে কে জানে! যদি কেউ একবার গন্ধ পেয়ে যায় আমার, কী হবে তা আমি এবং ঙ দুজনই অনুমান করতে পারি। ঙ চলে যেতে চান, তাঁকে আরও কিছুক্ষণ বসার জন্য অনুরোধ করি। ঙ আধঘন্টা থাকলেও আধ মুহূর্ত বলে মনে হয়। ক বা ঙ এলে ঘড়ির কাঁটা আচমকা লাফাতে থাকে। এ সময় আমার আপন আর কে আছে ক আর ঙ ছাড়া! ক আর ঙ না থাকলে আমার কবেই তো মৃত্যু হত। একএকটা মুহূর্ত বেঁচে থাকি, এর মানে একএকটা মুহূর্ত ক আর ঙ আমাকে বাঁচিয়ে রাখেন।
