অবকাশে বাবার চেম্বারে তিন দফা হামলা। বাড়ি চেম্বার ভাঙচুর। জানিনা বাবা বা দাদার গায়ে কটা চাপাতি বা রামদার কোপ পড়েছে। জানিনা বাবার রক্তচাপ এই দুশ্চিন্তায় কতটা বেড়েছে। হৃদপিণ্ডে আরও একটি ধাককা লেগেছে কি? মস্তিষ্কে কি রক্তক্ষরণ হচ্ছে! কিছু একটা হচ্ছে নিশ্চয়ই। বাবাকে দেখেছি সামান্য কিছু ঘটলেই তাঁর রক্তচাপ এমন বেড়ে যায় যে হৃদপিণ্ডের ক্রিয়া বন্ধ হয় হয় এমন অবস্থা হয়, রক্তচাপ দ্রুত কমানোর জন্য নিফিডিপিন ট্যাবলেট দুটো তিনটে গিলে তিনি মৃত্যুকে ঠেকিয়ে রাখেন। বাবা কি এই ভয়ংকর সময়ে যখন তাঁর সামনে দিয়ে প্রতিদিন যাচ্ছে তাঁর কন্যাকে খুন করার জন্য বিশাল বিশাল মিছিল, তাঁর চোখের সামনে অবকাশের দেয়াল আর চেম্বারের দরজায় লাগানো হচ্ছে পোস্টার, কুখ্যাত মুরতাদ তসলিমার ফাঁসি চাই, তিনি কি পারছেন রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে! যে কোনও মুহূর্তে এসে যাওয়া মৃত্যুকে আর ঠেকাতে ঠেকাতে পারার তো কথা নয়! পত্রিকা কি সব খবর পায় আর! এমনও হতে পারে, বাবাকে ওরা কুপিয়েছে। পাঞ্জাবির তলে তো ওরা রামদা নিয়ে ঘোরে, কত কত মানুষকে তো কুপিয়ে মেরেছে, কোরবানির গরুর মত মানুষের গলা জবাই করেছে ওরা! বাবাকেও কি ওরা জবাই করবে, কুপিয়ে মারবে! জেল থেকে বেরিয়ে কি আমি আমার বাবাকে জীবিত দেখতে পাবো না! যন্ত্রণা হচ্ছে বুকে, যন্ত্রণাটি বুক থেকে ছড়িয়ে পড়ছে সারা শরীরে। কাল বায়তুল মোকাররম মসজিদ থেকে হাজার হাজার লোকের মিছিল শান্তিনগরে গিয়ে উত্তেজিত হয়েছে! কেন উত্তেজিত হয়েছে! আমার অ্যাপার্টমেণ্টে গিয়ে আমার আত্মীয়দের গলা কাটার জন্যই তো! পুলিশ তো আর ওদের বাধা দেবে না এখন। কাল কি শুনতে হবে যে আমার পরিবারের চারজন অথবা পাঁচজন সদস্যকে খুন করা হয়েছে! চোখ বুজে বসে থাকি। হাতের পত্রিকা হাতে ঝুলতে থাকে। পত্রিকায় তপন দের ছবি। গতকাল দৈনিক খবরের সাংবাদিক তপন দে যখন মিছিলের ছবি তুলছিল, পুরানা পল্টনের মোড়ে মৌলবাদীরা তার ক্যামেরা কেড়ে নিয়ে ভেঙে ফেলেছে, প্রচণ্ড মেরেছে তপন দেকে, শেষ পর্যন্ত কিছু সাংবাদিক তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তপন দে পুলিশের সাহায্য চেয়েছিল, পুলিশ সাহায়্য করেনি, সামনেই নিষিক্রয় দাঁড়িয়েছিল।
জামাতে ইসলামি এবং আর সব মৌলবাদী দলের সঙ্গে এখন আরও রাজনৈতিক দল যোগ হয়েছে, ফ্রীডম পার্টি –শেখ মুজিবর রহমানের হত্যাকারীরা যে রাজনৈতিক দলটি বানিয়েছে সেটি তো আছেই, একসময়ের বাম রাজনীতিবিদ আনোয়ার জাহিদ তাঁর দল নিয়ে ঢুকে গেছেন ইসলামি ঐক্যে, শফিউল আলম প্রধান একসময়ের প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের নেতা, তিনিও তাঁর জাগপা দল নিয়ে ঢুকেছেন। মৌলবাদীদের বিশাল বিরাট শক্তি দেখে এমনই মুগ্ধ তাঁরা যে ভেবে নিয়েছেন এই শক্তিটিই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ক্ষমতায় আসছে, সুতরাং এই দলের সঙ্গে ভিড়ে যাওয়া এখন সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। আনোয়ার জাহিদ আর প্রধানের মুখে মৌলবাদীদের ভাষা, তসলিমার ফাঁসির জন্য তাঁরাও মিছিলের অগ্রভাগে থাকছেন, তাঁরাও স্লোগান দিচ্ছেন। গতকাল জুম্মাহর নামাজের পর হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসলমানের সভা হয় বায়তুল মোকাররমে। বক্তৃতা করেন বিখ্যাত সব ইসলামী নেতা। শায়খুল হাদিস মাওলানা আজিজুল হক বলেছেন, ধর্মদ্রোহিরা শুধু ইসলামের শষনু নয়, তারা দেশ ও জনগণেরও শষনু। ধর্মদ্রোহী নাস্তিক মুরতাদের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে তা শুধু আলেম ওলামা বা পীর মাশায়েখদের আন্দোলন নয়, দেশের সর্বস্তরের ধর্মপ্রাণ মানুষ আজ এ ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। এই আন্দোলনের বিজয় হবে ইনশাআল্লাহ। ইসলামি শাসনতন্ত্র আন্দোলনের নেতা বরগুনার পীর মাওলানা আব্দুর রশিদ বলেছেন, তসলিমা ও জনকণ্ঠ আমাদের মূল লক্ষ নয়, মূল লক্ষ হল ইসলাম ও কোরানের বিরুদ্ধে চক্রান্ত নস্যাৎ করে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠা করা। তসলিমাকে গ্রেফতার করা না হলে বিএনপি সরকারের অবস্থা ভয়াবহ হবে। মাওলানা ওবায়দুল হক এম.পি বলেছেন, সংসদে চলতি অধিবেশনেই ধর্মদ্রোহিতা বিরোধী আইন পাস করুন। অন্যথায় জনগণ ধর্মদ্রোহীদের শাস্তির ব্যবস্থা নিজেরাই করতে বাধ্য হবে। ব্যারিস্টার কোরবান আলী বলেন, জনগণের দাবিকে উপেক্ষা করা হবে আগুন নিয়ে খেলা করার সামিল। ইসলাম ও রাষ্ট্রদ্রোহী তৎপরতার প্রতিরোধ মোর্চার আহবায়ক মাওলানা মহিউদ্দিন আহমেদ নাস্তিকদের জানাজা না পড়ানোর জন্য সব মোল্লা মুসল্লির প্রতি অনুরোধ জানান। লালবাগ মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা ফজলুল হক আমিনী বলেন, ঈমান ও ইসলামের কথা বলা হলে আমাদের বলা হয় মৌলবাদী, ফতোয়াবাজ ইত্যাদি। নামাজ রোজা হজ্ব পালন করলে যদি মৌলবাদী বলা হয় তবে হাসিনা খালেদাও মৌলবাদী। আমিনী ৩০ জুনের মধ্যে বিশেষ ট্রাইবুনালে তসলিমা নাসরিনের বিচারের দাবি করেন।
৩০শে জুনের আগেই তসলিমার ফাঁসি দিতে হবে। ইসলাম ও রাষ্ট্রদ্রোহী তৎপরতা প্রতিরোধ মোর্চার পক্ষ থেকে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে নেতৃবৃন্দ ৩০ শে জুন পর্যন্ত সরকারকে চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন, এর মধ্যে তসলিমার ফাঁসি না হলে দেশব্যাপী অর্ধদিবস হরতাল এবং পরবর্তী কর্মসূচী ঘোষণা করা হবে। ৩০শে জুন হরতালের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন।
