–বিদেশের অনেক মানবাধিকার সংগঠন, লেখক সংগঠন আমাকে নিরাপত্তা দেবার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে বলছে।
–−ছাঃ! বিদেশের সব আবেদনই ময়লা ফেলার ঝুঁড়িতে চলে যাচ্ছে, দেখ গিয়ে। দেশে কি হচ্ছে সেটা বড় কথা। আগে তো ঘর সামলাও, তারপর বাহির। আগে গদি সামলাও, তারপর অন্য কিছু। আচ্ছ! বল তো, হলিডের সম্পাদক এনায়েতুল্লাহ খান কি মৌলবাদী?
–না।
–তাঁর পত্রিকায় আজ তিনি তোমার লজ্জা বইটির সমালোচনা ছেপেছেন। ভূমিকায় সম্পাদক লিখেছেন, তুমি বিজেপির লোক, তুমি সাম্প্রদায়িক, দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার মিশন নিয়েছো। এ সময় এসব কথা লেখার অর্থ কি জানো তো! লোক ক্ষেপানো। মোল্লা লেলিয়ে দেওয়া তোমার পেছনে। সরকারকে ইন্ধন যোগানো। তুমি জেলে গেলে, তোমার ফাঁসি হলে, এরাই খুশি হবে বেশি। এরাই হাততালি দেবে বেশি। কি, চুপ করে আছো যে! কি ভাবছো!
–না, কিছু ভাবছি না।
–ভাবছো, ভাবছো তোমার কমপিউটারের হার্ডডিস্কের লেখাগুলোর কি হবে! লেখা লেখা লেখা। লেখাগুলো পুলিশেরা নষ্ট করে ফেলবে কি না ভাবছো! লেখা সব তোমার নষ্ট হয়ে যাক। পুলিশ নিয়ে নিক। লেখার কথা ভাবা বাদ দাও। বেঁচে যদি থাকো, তবে আর যাই হও, লেখক হওয়ার চিন্তাও কোরো না, আবারও বলছি। লেখক হওয়ার সাধ তোমার আশাকরি পূরণ হয়েছে। লেখক হয়ে অন্ধকার দূর করতে চেয়েছিলে, অন্ধকারই তো সবলে গ্রাস করে নিল তোমাকে। সবাই তো বাইরের আলোয় হাঁটছে, আনন্দ করছে, তুমি একা পড়ে আছো অন্ধকারে, অন্ধকারই এখন তোমার ঠিকানা। লিখে তুমি এই পেয়েছো। এই তোমার পুরস্কার। এখানে এই গুমোট ঘরটিতে বসে বসে এখন জেলখানায় অথবা কবরে থাকার মহড়া দিচ্ছ।
–কিন্তু আমার তো অনেক স্বপ্ন ছিল..
–স্বপ্ন! তুমি হাসালে। তোমার মত বেচারা আবার নানারকম স্বপ্ন দেখতেও জানত। তোমার স্বপ্নগুলো এখন মৃত, বিস্মৃত। তোমার স্বপ্নগুলো কাকে খাওয়া, চিলে নেওয়া, তোমার স্বপ্নগুলো লোকের কফ কাশির সঙ্গে পড়ে আছে। তোমার স্বপ্নগুলো লোকের জুতোয় তলায়।
–থামো, এগুলো শুনতে ইচ্ছে করে না।
–ইচ্ছে না করলেও এগুলো সত্য, তুমিও তা জানো। তুমি যে হেরে গেছো, তুমি জানো। ভেবেছিলে, তুমি সমাজের মঙ্গল কিছুটা হলেও বুঝি করতে পেরেছো, ভেবেছিলে নারী পুরুষের বৈষম্যহীনতার কথা বলে তুমি কিছুটা হলেও মানুষকে বৈষম্যের ব্যাপারে সচেতন করতে পেরেছো। ভেবেছিলে সামান্য হলেও সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, অন্ধকার, কুসংস্কার দূর করতে পেরেছো। কিμছু পারোনি তসলিমা। তুমি প্রচণ্ডভাবে হেরে গেছো। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বই লিখে তুমি সাম্প্রদায়িক আখ্যা পেয়েছো। যাদের ভেবেছিলে সহযাষনী, তারাই আজ মৌলবাদের হিংস্র থাবার মধ্যে তোমাকে তুলে দিচ্ছে। এই তোমার এতকালের সংগ্রামের পুরস্কার। এই পুরস্কার মাথা পেতে নিতে কাল বা পরশু তুমি কারাগারে ঢুকবে অথবা তুমি ফাঁসিকাঠে ঝুলবে, তুমি অবধারিত মৃত্যুর দিকে রওনা হবে। তসলিমা, তোমার জন্য খুব মায়া হয় আমার। খুব মায়া হয়। তোমার মত এমন দুর্ভাগ্য নিয়ে আর যেন কারও জন্ম না হয় এই পৃথিবীতে।
–আমাকে একা থাকতে দাও। কথা বোলো না। বিরক্ত কোরো না।
–থাকো, একা থাকো। তুমি তো একাই। ….কাঁদছো? কাঁদো তসলিমা, কাঁদো। অনেকদিন তুমি কাঁদোনি। অনেকদিন প্রাণভরে এমন করে কাঁদোনি। কাঁদো।
বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদি আমি। আমার কান্নার শব্দ যেন কোথাও যেতে না পারে, তাই শব্দটিকে আটকে রেখে কাঁদি। যখন মাথা তুলি, চ আর চর বাচ্চাজ্ঞটর কণ্ঠস্বর শুনতে পাই। এ ঘরে আমি ছাড়া আর কেউ নেই। কিন্তু ছিল একজন, নিশ্চয়ই ছিল, দীর্ঘক্ষণ যার সঙ্গে কথা হয়েছে আমার, সে ছিল। মানুষটি তো ওখানেই বসেছিল, ওই চেয়ারে, তারপর বিছানায় এসে বসল। আমাকে স্পর্শ করেছিল, কপালে একটি শীতল হাত এসে একবার থেমেছিল। আমাকে কাঁদতে বলল। আশা করেছিলাম একবার অন্তত বলবে, অনেক কেঁদেছো, আর কেঁদো না। আমাকে একটিবার বুকে টেনে নিয়ে চোখের জল মুছিয়ে দেবে। আশা করেছিলাম, কাঁধে একটি হাত রাখবে সে।
দরজাটি ভেতর থেকে সিটকিনি আঁটা ছিল, এখন খোলা। আশ্চর্য, দরজা খুলে আমাকে না বলে নিঃশব্দে চলে গেছে সে! একবার বলে যাবে না!
৩. অতলে অন্তরীণ – ০৮
এগারো জুন, শনিবার
সেই চার তারিখে বাড়ি ছেড়েছি যে কাপড়ে, সে কাপড়েই এখনও আছি। ঘামের দুর্গন্ধ সারা শরীরে। গা আঠা আঠা হয়ে আছে ধুলোয়, ঘামে, চোখের জলে। অসহ্য গরম। এক পশলা হাওয়া ঢোকার কোনও সুযোগ নেই ঘরে। যেন জ্বলন্ত চুলোর ওপর বসে আছি। দুর্গন্ধ বা আঠা দূর করতে নয়, গোসলখানায় যাই গা থেকে আগুন দূর করতে। গোসলখানায় কোনও সাবান নেই, কোনও তোয়ালে নেই। কোনও বালতি নেই, কোনও লোটা বা মগ নেই। কলটি মেঝে থেকে দু ফুট উঁচুতে। কলের তলে বসে গায়ের ওপর জল ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনও কায়দা নেই গা ভেজানোর। এই কলের তলে বল্টু গোসল করে উঠতে পারে, আমি পারি না। আমার পিঠ যায় তো মাথা যায় না। অগত্যা আলাদা আলাদা করে পা হাত মাথা ইত্যাদি কলের তলে নিয়ে ভেজাই, দুহাতে জল নিয়ে বুক পিঠ। জল তো জল নয়, যেন ফুটোনো জল, এমন গরম। এক চিলতে সাবান লেগে ছিল গোসলখানার মেঝেয়, সম্ভবত বল্টুর কাপড় ধোয়ার সাবান। সেটিকেই চিমটি দিয়ে তুলে তুলে গায়ে মাখি। মাখা ফুরোনোর আগেই সাবানের অস্তিত্ব ফুরিয়ে যায়। এর পর কি? গা মুছব কি করে! পরনের শাড়িটি দিয়ে গা মুছে ঘ র দেওয়া লম্বা জামাটি পরি। ঘ র জামাটি ও বাড়ি ছাড়ার সময় আমি খুলে রেখেছিলাম, ঘ আমার হাতে দিয়ে জামাটি, বলেছিলেন নিয়ে যেতে। গোসল হল কিন্তু এর নাম গোসল নয়। এর নাম যে ঠিক কী, জানি না। গোসলখানার গরম জল থেকে ফিরে আসি জ্বলন্ত উনুনের ওপর আবার। সারা শরীরে কুটকুট করে কামড়াতে থাকা ঘামাচি নিয়ে বসে থাকি, বসে থাকি আর দীর্ঘশ্বাস ফেলি। এ ছাড়া করার কিছু নেই আমার। বসে থাকি আর অপেক্ষা করি কারওর। অপেক্ষা আমাকে একটি ঘরের মধ্যে স্থির বসে থেকে করতে হয়। কারওর অপেক্ষা করলে যে দরজা খুলে দাঁড়াবো, জানালা খুলে তাকাবো, যে অভ্যেসটা ছিল এতকাল, অভ্যেসটা শক্ত করে খামচে ধরে তোশকের তলায় রেখে দিই। বরং কান পেতে রাখি। কান পেতে রাখি পায়ের শব্দ পাওয়ার। কান দুটো বেড়ালের পায়ের শব্দও শোনে।
