–কিন্তু আমি তো পালাতে চাই না।
–পালাবার তোমার কোনও পথও নেই। তোমার নিরাপত্তা কোথাও নেই। জেলে নেই, আদালতে নেই। পালাবার পথেও নেই। জামিনের কথা কল্পনাও কোরো না। জামিন নিতে গেলে আদালতে যেতে হয়। আদালতে তোমার নিরাপত্তা কি? ওখানে তুমি কি ভেবেছো পুলিশ তোমাকে নিরাপত্তা দেবে? যাকে পুলিশ খুঁজছে গ্রেফতার করার জন্য, তাকে কেন নিরাপত্তা দেবে! তোমাকে বরং পুলিশই ছেড়ে দেবে লক্ষ্য থাবার মধ্যে। উন্মত্ত মোল্লা-কুকুরগুলো তোমাকে ছিঁড়ে খাবে, আর তোমার বন্ধুরা দূর থেকে মজা দেখবে, যেমন দেখেছিল গতবছর বইমেলায় তোমার ওপর হামলা হচ্ছিল যখন। বইমেলার সেই হামলার সঙ্গে তুলনাও করো না এই হামলার। এই হামলা সেই হামলার চেয়ে লক্ষগুণ ভয়ংকর হবে। আদালতে গোপনে হঠাৎ করে কাকপক্ষী না জানে এমন ভাবে জামিন চাইতে যাবে! তোমার উকিল বলেছেন, তোমার জন্য হাইকোর্টে জামিন চাইতে যাবেন। যাও আদালতে, মরো গিয়ে। তুমি ভাবছো, মোল্লারা খবর পাবে না তুমি যে যাচ্ছে!! বোকা, বুঝতে পাচ্ছে! না! খবর তো মোল্লাদের আদালত থেকেই দেওয়া হবে। কত বিচারক আছেন জামাতে ইসলামি দলের, জানো না? কত উকিল আছেন মোল্লা, জানো না? শায়খুল হাদিসের দলকে, আমিনীর দলকে, ইয়ং মুসলিম সোসাইটিকে খবর আদালতের লোকেরাই দেবে। জেলে যাবে, জেলেই বা তুমি বাঁচবে কি করে, ওখানেও তো কামড় বসাবে তোমার গায়ে, চোর ছ্যাঁচোড় সবারই ধর্মের প্রতি অনুরাগ ভীষণ। যদি জেলে তোমার মৃত্যু না হয়, যদি বেঁচে থাকো, জেল থেকে বাইরে বেরোলেও তো তোমার নিরাপত্তা নেই। তোমার কোথাও নিরাপত্তা নেই। তারপরও যদি বেঁচে যাওয়া অলৌকিক ভাবে সম্ভবই হয় তোমার, এ দেশে থেকো না। মানুষ তো মরবেই, তুমিও মরবে, আর যাই কর, মোল্লাদের হাতে নিজেকে মরতে দিও না। তুমি দেশে থাকলে ওরা তোমাকে একদিন না একদিন খুন করবেই।
–সত্যের জন্য যদি মরে যেতে হয়, মরব।
–খুব গ্যালিলিও গ্যালিলেই হয়ে গেছো! নিজেকে তোমার খুব জিয়োর্দানো ব্রুনো মনে হচ্ছে, তাই না! মনে রেখো, এই পৃথিবীতে অনেক লেখকের ওপর নির্যাতন হয়েছে, তারা নির্বাসনে জীবন কাটিয়েছেন। তুমি একা নও।
–না, আমি নির্বাসনে যাবো না। ডক্টর কামাল হোসেন আমার জন্য লড়বেন। তিনি খুব বড় ব্যারিস্টার।
–দেখ, তোমার উকিল হতাশ হতে হতে, লোকের ধিককার পেতে পেতে হুমকি পেতে পেতে তোমার মামলা থেকে সরে দাঁড়ান কি না। । এরকম কিছু হওয়া এখন অসম্ভব নয় তসলিমা।
–আমার যে কত পাঠক ছিল! আমার পাঠকেরা আমাকে তো ভালবাসত। কত মেয়েরা! তারা কি হঠাৎ করে আমার বিরোধী হয়ে উঠেছে? নিশ্চয়ই নয়।
–সাধারণ মানুষের কথা বলছ তো! তুমি টের পাওনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও তোমার সমর্থন হ্রাস পেয়েছে। বই হয়ত বিক্রি হয়েছে অনেক। তোমার বই তো মোল্লারাও কেনে। কি লিখেছো, কত বাজে কথা লিখেছো, তা জেনে তোমাকে আক্রমণ করার জন্য কেনে। তাছাড়া হঠাৎ করেই পাঠকের সমর্থন তোমার কমে গেছে।
–কেন ?
–অপপ্রচার, তসলিমা, অপপ্রচার। গসিপ ম্যাগাজিনগুলোয়, মৌলবাদী আর সরকারি প্রচার মাধ্যমগুলোয় প্রতিদিন তোমাকে নিয়ে নানারকম গল্প বানিয়েছে, দেখনি? যা তুমি লেখোনি, তাই তোমার উদ্ধৃতি দিয়ে চালিয়েছে। তুমি বিজেপির কাছ থেকে ৪৫ লক্ষ, কেউ কেউ বলেছে ৪৮ বলছে, টাকা নিয়ে নাকি লজ্জা লিখেছো, আনন্দবাজার তোমাকে ইসলামবিরোধী লেখায় প্রেরণা দিয়ে ৩০ লক্ষ টাকা দিয়ে সল্টলেকে নাকি একটি বাড়ি তৈরি করে দিচ্ছে। তুমি দেশদ্রোহী, তুমি রএর এজেন্ট, ভারত থেকে টাকা পেয়ে তুমি দেশে বাড়ি গাড়ি কিনেছো, তুমি মেয়েদের সংসার ভেঙে দিতে চাও, মেয়েদের নষ্ট করছ, তুমি ফ্রি সেক্স বিশ্বাসী, তুমি পুরুষদের ধর্ষণ করতে চাও, একশ একটা পুরুষের সঙ্গে তোমার অবৈধ সম্পর্ক, তুমি জরায়ুর স্বাধীনতা চাও। সরকারি দৈনিকগুলোয় এসব খবর প্রথম পাতায় গুরুত্ব দিয়ে ছেপেছে। এসব অপপ্রচার তোমার পাঠক নষ্ট করেছে।
–কিন্তু যারা এসব শুনেও আমার লেখা পছন্দ করেছে, তারা আজ কোথায়?
–তারা আছে। চুপচাপ ঘরে বসে আছে। তারা সংগঠিত নয়। বিবৃতি দেবার মত ব্যক্তিত্ব তারা নয়। প্রতিবাদ করার মত সাংগঠনিক জোর তাদের নেই। তার ওপর একটা ব্যাপার তো আছেই, ভয়। এগিয়ে আসতে ভয় পায় অনেকে। এবং এদের সংখ্যাই বেশি। মুখ খুলতে ভয় পায়। তোমার লেখা পছন্দ করলেও মুখ ফুটে বলবে না কিছু, তোমার ওপর অন্যায় হচ্ছে জেনেও বলবে না কাউকে যে অন্যায় হচ্ছে। যাদের এগিয়ে আসতে কোনও ভয় নেই, যাদের খুঁটির জোর ভাল, তারাই যখন চুপ হয়ে আছে, তখন অন্যদের আর দোষ দিয়ে লাভ কি! হতভাগা তসলিমা, চার সাংবাদিকের জন্য আজ ভালবাসায় মমতায় কাঁদছে সবাই, কেবল তোমার জন্য কেউ নেই দু কথা উচ্চারণ করার। তুমি লেখালেখি ছেড়ে দাও তসলিমা, আর লিখো না।
–অসম্ভব, আমি ছাড়ব না লেখা।
–তুমি কেন লিখবে? কার জন্য লিখবে? যারা তোমাকে জেলে পাঠাচ্ছে, ফাঁসিতে ঝোলাচ্ছে, তাদের জন্য? এত উদার হবে কেন তুমি? ঘাতকদের পায়ে ফুল নিবেদন করবে কেন, বল! যদি বেঁচে থাকো, লেখালেখি সম্পূর্ণ বাদ দিও। তবে এদেশে নয়, অন্য কোনও দেশে।
–না, এ আমি ভাবতেই পারি না।
–তোমাকে ভাবতে হবে তসলিমা। এই দেশে তোমার দাঁড়াবার কোনও জায়গা নেই আর। তোমাকে হতেই হবে দেশান্তরী। আর যদি গোঁয়াড়ের মত মরতে চাও, তবে থাকো এ দেশে। মরো। সপরিবার মরো। তবে আমার উপদেশ, বেঁচে থাকলে অলেখক, অবিপ্লবী হয়ে বেঁচে থেকো। কোনও ঝুট ঝামেলা নেই, হুমকি হুংকার নেই, জেল ফাঁসি নেই, পত্রিকা নেই, সাক্ষাৎকার নেই, এরকম একটি শান্ত স্নিগ্ধ নিশ্চিত শান্তির জীবন বেছে নিও।
