–বাজে কথা বোলো না। মানসিকভাবে সঙ্গে থাকাই তো সবচেয়ে বড় থাকা। আমি জানি যে তিনি আমার পক্ষে আছেন। তিনি আমার জন্য উদ্বিগ্ন। তিনি আমাকে ভালবাসেন।
–মানসিকভাবে থাকলে তোমার কী লাভ এখন? এখন তোমার বিবৃতি দরকার, সমর্থন দরকার। তা না থাকলে তোমার উকিল তোমার জন্য কিছুই করতে পারবেন না। পত্রিকায় বিবৃতির মাধ্যমে, আন্দোলনের মাধ্যমে, একই ধারার মামলার আসামী জনকণ্ঠের সাংবাদিকদের সঙ্গে আছেন, আর তোমার সঙ্গে আছেন নিভৃতে, গোপনে, মানসিকভাবে। শামসুর রাহমান বলেছেন সই করার লোক পাওয়া যায়নি বলে তিনি তোমার পক্ষে বিবৃতি দিতে পারেননি। তিনি কি একাই বিবৃতি দেওয়ার জন্য যথেষ্ট বড় ব্যক্তিত্ব নন? তোমার মত হতভাগা কেউ নেই। তিনি একটি কবিতা লিখেছেন তোমাকে নিয়ে, তোমাকে সেই কবিতাটা দিয়েছিলেন শারদীয়া দেশ এর জন্য পাঠিয়ে দিতে? পাঠিয়েছিলে?
–পাঠাইনি। সময় পেলাম কোথায়? হুলিয়া জারি হয়েছে পরদিনই।
–মনে হয় তিনি আর চাইবেন না কবিতাটি কোথাও ছাপা হোক।
–কেন চাইবেন না? নিশ্চয়ই চাইবেন। নিজের কবিতা কেউ কি আড়াল করে?
–এখন অন্যরকম অবস্থা তসলিমা। তোমার পক্ষে কবিতা লিখতে, কলাম লিখতে এখন লেখক বুদ্ধিজীবীরা ভয় পান। যদি লোকে মন্দ বলে, তাই ভয়। যদি লোকে ছি ছি করে তাই ভয়। সংখ্যালঘুদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলে, সুরঞ্জনদের কষ্ট দেখে কেঁদেছো। কিন্তু তুমি কি জানো, তুমি সুরঞ্জনদের চেয়েও অসহায়! যে সুরঞ্জনরা আজ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে তাদের জীবন কি তোমার চেয়ে অনিশ্চিত, নিরাপত্তাহীন! যে কোনও সংখ্যালঘুর চেয়ে বড় সংখ্যালঘু তুমি। যারা বিপদে আছে তাদের চেয়ে তুমি সহস্রগুণ বিপদে আছো। তুমি আরও অবাক হবে যদি শোনো যে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান সমিতি আজ বিবৃতি দিয়েছে জনকণ্ঠের সাংবাদিকদের পক্ষে, তোমার কথা তারা উল্লেখ করেনি। কেউ তোমাকে মর্যাদা দেয়না তসলিমা। তুমি খামোকাই লিখেছো মানুষের জন্য। মানুষ তোমাকে ভালবাসে না। দেশ দেশ করে মরো, দেশ তোমাকে কী দিল? দেশ তোমাকে ঘৃণা দিল, অবজ্ঞা দিল, এবং খুব শীঘ্র তোমাকে ফাঁসি দেবে। যদি ফাঁসির হাত থেকে বেঁচে যেতে পারো, তুমি এ দেশে থেকো না তসলিমা।
–কোথায় যাবো?
–চলে যাও অন্য কোনও দেশে। এ দেশ তোমার যোগ্য নয় অথবা তুমি যোগ্য নও এদেশের। কোনও সভ্য দেশে চলে যাও।
–কেন যাবো? আমাকে কি এ দেশের কেউ একটুও ভালবাসে না?
–ভালবাসে। তারা ভালবাসে যাদের দিকে তুমি কখনও ফিরে তাকাওনি। যাদের ভালবাসার সময় তোমার একটুও হয়নি। তুমি ব্যস্ত থেকেছো তোমার প্রগতিশীল কবি সাহিত্যিক বন্ধুদের নিয়ে, তোমার লেখালেখি নিয়ে, অন্যের ভালর জন্যই ভেবেছো কেবল। তোমাকে ভালবাসে তোমার বাবা, মা, ভাই, বোন। কোনওদিন কি সময় হয়েছে তোমার, তোমাকে যারা নিঃস্বার্থভাবে ভালবাসে, তাদের কথা একটু ভাবার? তোমার বাবার চেম্বারে তোমার বিরুদ্ধে পোস্টার পড়েছে, তাঁর সামনে দিয়ে প্রতিদিন মিছিল যাচ্ছে। যে কোনও সময় তোমার বাবার ওপর হামলা হবে, যেহেতু তিনি তোমার বাবা। চেনা পরিচিত অনেক বন্ধুই এখন তোমার বাবার কাছে আর আসেন না। রোগীরাও তাঁর কাছ থেকে আর চিকিৎসা নিতে আসে না। তোমার বাবা বলে তিনি মানুষের ঘৃণা পাচ্ছেন। তারপরও তিনি তোমাকে সমর্থন করছেন। তোমার ভাইরাও বন্ধু হারাচ্ছে। তোমার ভাইয়ের ছেলেরা ইশকুলে গেলে তাদের ছি ছি করছে ইশকুলের ছাত্ররা, বলছে তোর ফুপুকে তো জেলে নেবে, তোর ফুপুর তো ফাঁসি হবে। কেউ লজ্জায় ভয়ে ঘর থেকে বেরোতে পারছে না। তোমার বোনের চাকরিটি যাবে, কারণ সে তোমার বোন। সবাই তোমার জন্য ভুগছে, কিন্তু তোমাকে অসম্ভব রকম ভালবাসছে। তোমার বাবার কথাই ভাবো, তিনি মধ্যরাতে যখন রোগী দেখে চেম্বার থেকে বাড়ি ফেরেন, তিনি তো একা ফেরেন, তখন কেউ যদি পেছন থেকে তাঁর পিঠে ছুরি বসায়! যে কোনও দিন, তোমার ওপর আক্রোশে ধর্মান্ধ লোকেরা তো এই কাণ্ডটি করে ফেলবে। একই রকম তোমার দাদাকেও করবে। তোমার দাদাও তো সেই কত রাতে ওষুধের দোকান বন্ধ করে হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফেরেন। ময়মনসিংহে ধর্মান্ধদের সভা হচ্ছে, মিছিল হচ্ছে, ওরা তো তোমার বাবাকে ভাইকে চেনে। তোমার ভাইয়ের ছেলে শুভকে একদিন ইশকুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে তুলে নেবে কেউ, নিয়ে কোনও ডোবায় পুঁতে রাখবে। আর ঢাকায়, তোমার শান্তিনগরের বাড়িতে! বোন তোমার রাস্তায় বেরোলে মেরে ফেলবে। অথবা বাড়িতে ঢুকেই ওরা ছুরি বসাবে বুকে। ছুরি বসানো তো ওদের কাছে ডালভাত। পড় না খবর কত জনকে ওরা যে এভাবে মারছে! যাকেই পছন্দ হচ্ছে না, যার ওপরই রাগ, তাকেই জবাই করে ফেলে রাখছে। শিবিরের সন্ত্রাসে আজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কাঁপছে পর্যন্ত। এগুলো গলা কাটা রগ কাটা ছুরি বসানো খুন করা ওদের কাছে ডাল ভাত। একদিন তুমি পত্রিকার পাতায় পড়বে, গত রাতে তসলিমার বাড়িতে ঢুকে একদল সশস্ত্র যুবক তার মা, ভাই, বোন, বোন বোনের মেয়েকে জবাই করেছে। তোমার আশংকা হয় না! চলে যাও এ দেশ ছেড়ে..
–আমার এই প্রিয় দেশ ছেড়ে, আমার ভালোবাসার মানুষদের ছেড়ে, প্রিয় নদী মাঠ বৃক্ষতল.ছেড়ে ..
–কত মানুষ দেশ ছেড়ে চলে যায়..। তাতে কি? যে দেশের মানুষ তোমাকে ভালবাসে না, সে দেশে থাকতে তোমার ইচ্ছে করে কেন বুঝি না।
