–কিছু বুঝতে পারছি না । সব কিছু কেমন যেন খুব অদ্ভুত মনে হচ্ছে।
–অদ্ভুতই ছিল। তুমি কেবল বুঝতে ভুল করেছিলে আগে। কাল জামাতের গণসভা হল। এখন তারা জনকণ্ঠের বিরুদ্ধে তেমন কিছু বলছে না। তারাও বুঝে গেছে যে জনকণ্ঠের বিরুদ্ধে চেঁচিয়ে লাভ হবে না। লাভ হবে তসলিমার ফাঁসি চেয়ে। এতে কাজ হয়। সকলের সমর্থন পাওয়া যায়। তোমার ফাঁসি চাইছে, প্রকাশ্যে ঘোষণা দিচ্ছে তারা তোমাকে মেরে ফেলবে, তারপরও সরকার চুপ, সবাই চুপ, এই সুযোগে জামাতিরা ব্লাসফেমি আইন করার দাবি জানাচ্ছে। নীরব-বাদীরা কি একবার ভেবেছে এই আইন এলে কি অবস্থা হবে দেশের? হয়ত ভেবেছে, তারা তো আর ধর্ম নিয়ে তসলিমার মত বাড়াবাড়ি লেখা লেখে না, তারা পার পাবে। সংসদে কে বিরোধিতা করবে এর? কেউ না। খুব সহজেই এই বিলটি সংসদে পাস হয়ে যাবে।
–এরকম ভয়ংকর আইনটি সহজে পাস হবে, কেন যেন আমার বিশ্বাস হয় না।
–ব্লাসফেমির শাস্তি তো মৃত্যুদণ্ড। যখন তখন যাকে তাকে বলা হবে সে ব্লাসফেমি করেছে। পাকিস্তানে হচ্ছে না? খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে এই আইন ব্যবহার হচ্ছে। এখানেও অমুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যবহার হবে। এখানেও ফতোয়ার বিরুদ্ধে যারাই বলবে, যারাই শরিয়া আইনের সমালোচনা করবে ব্লাসফেমি করেছে বলে বলা হবে। কে মুক্তি পাবে তখন মৌলবাদী ছাড়া!
–সংসদে বিরোধী দল নিশ্চয়ই এটিকে আইন করতে দেবে না।
–শোনো, শেখ হাসিনা আজ সরকারের এই মামলা, যে মামলায় জনকণ্ঠের দুজন সাংবাদিককে ধরা হয়েছে, তাদের মুক্তি দাবি করেছেন। তাদের ওপর থেকে হুলিয়া প্রত্যাহার করার দাবি করেছেন। তাদের ঝামেলা করাতে সরকারের নিন্দা করেছেন। শেখ হাসিনা চারজন সাংবাদিকের নাম উল্লেখ করে মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। নাম উল্লেখ করেছেন স্পষ্ট করে এই জন্য যে ভুলেও যেন আবার কেউ মনে না করে যে তিনি তোমার মামলারও প্রত্যাহার চান। এই যদি হয় বিরোধী দলের নেষনী, তবে কি তুমি আশা কর যে সংসদে যখন তোমাকে ফাঁসি দেওয়ার জন্য ব্লাসফেমি আইন আনা হবে, তখন তিনি প্রতিবাদ করবেন? না, তিনি প্রতিবাদ করবেন না, প্রতিবাদ তিনি করবেন না এই কারণে যে তিনি তবে ইসলাম বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যাবেন। আরও একটি কারণ হল, বিএনপি যেমন জামাতকে খুশি করতে চাইছে, আওয়ামী লীগও চাইছে। জামাতের এখন পোয়াবারো। জামাত এখন দুদলকেই নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছে। আসলে দুদলেরই জামাতকে দরকার। যে দলই জামাতকে সঙ্গী হিসেবে নেবে, সে দলই বিপক্ষ দলের চেয়ে শক্তিতে বড় হবে। দেখ, বুদ্ধিজীবিরা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলার প্রতিবাদ করলেন, তাঁরা কিন্তু ব্লাসফেমি আইন জারি করার জন্য এত যে চিৎকার করছে মৌলবাদীরা, এই ব্লাসফেমি আইনের বিরুদ্ধে কোনও প্রতিবাদ করেননি। কোনও বুদ্ধিজীবীর মধ্য থেকেও প্রতিবাদ আসবে না, কারণ তাঁরা নিশ্চিত যে তাঁরা কখনও ব্লাসফেমির মত অপরাধ করছেন না, তাঁরা পেটে রেখে দিচ্ছেন তাঁদের ব্লাসফেমি, তসলিমাই কেবল পেটে রাখতে পারে না, উগলে দেয়। তাই এই ব্লাসফেমির বিরুদ্ধে আইনটি কেবল তসলিমার জন্যই দরকার।
–কিন্তু আইন যদি বহাল হয়ে যায়, তবে আইন কি তাদের কি ছেড়ে দেবে?
–দেবে না। কিন্তু তারা হয়ত ভাবছেন, দেবে। দেবে, কারণ তারা তো তসলিমার মত বোকা নন। তারা বুঝে সুঝে কথা বলেন। তুমি একা তসলিমা। তোমার পাশে কেউ নেই। তুমি ভেবেছিলে তুমি ধর্মীয় গোঁড়ামি, অন্ধত্ব, অশিক্ষা, মৌলবাদ–সব তারা যেমন সরাতে চায়, তুমিও তেমন চাও। ভেবেছিলে তুমি যা বলনি তার ভিত্তিতে সরকার তোমার বিরুদ্ধে মামলা করেছে, হুলিয়া জারি করেছে, তোমার বিরুদ্ধে সরকারের এই অন্যায়ের প্রতিবাদ সবাই করবে, ভেবেছিলে মৌলবাদীরা তোমার ফাঁসির দাবিতে দেশজুড়ে তাণ্ডব করছে, এই দুঃসময়ে প্রগতিশীল শক্তিটি তোমাকে সমর্থন করবে, মত-পার্থক্য থাকলেও ভেবেছিলে তাঁরা অন্তত বাকস্বাধীনতার জন্য হলেও তোমাকে সমর্থন করবে। কিন্তু তুমি ভুল ভেবেছিলে। কেউ তোমার পাশে নেই। তুমি একা। তুমি একা বিশাল এক মৌলবাদী শক্তির সঙ্গে লড়ছিলে। তুমি একা তসলিমা, কেউ নেই তোমার। এখন তোমাকে যদি ফাঁসি দেয়, যাদের তুমি বন্ধু ভাবতে, ভাবতে একই আন্দোলনে জড়িত তোমরা, তারা দূরে দাঁড়িয়ে দেখবে তোমার ফাঁসি। তুমি কি মনে করছ তোমাকে হত্যা করছে মৌলবাদীরা? না। ছুরি তোমার পিঠে কোনও মৌলবাদী বসাচ্ছে না। মৌলবাদীরা রাস্তায় নামছে, নেপথ্যে দাঁড়িয়ে আছে প্রগতিশীল বলে দাবি করে, সেই ভণ্ডগুলো। তুমি যাদের আপন ভাবতে তারা। কত বড় ভণ্ড হলে আজ প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ, লেখক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী কেউই তোমার ওপর সরকারি আর মৌলবাদী জঘন্য ভয়াবহ হামলার প্রতিবাদ না করে জনকণ্ঠের সাংবাদিকদের ওপর হামলার ওপর প্রতিবাদ করে! কারা ওই সাংবাদিক? কি করেছে ওরা এ পর্যন্ত? কজন মানুষ পড়েছে ওদের লেখা? মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে ওরা কি কোনও চ্যালেঞ্জ ছিল, সমাজ কতটুকু বদলাতে চেয়েছে ওরা? অন্ধত্ব কতটুকু ঘোচাতে চেয়েছে ওরা? তোমার প্রগতিশীল প্রতিবাদী বন্ধুদের সঙ্গে ওদের কতটা ঘনিষ্ঠতা ছিল? ওরা কি কোনও নাম মৌলবাদবিরোধী বা সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আন্দোলনে? যারা আজ তোমাকে বাদ দিয়ে ওদের জন্য কাঁদছে, তারা কি ওদের লেখা পড়েছে? চেনে ওদের? তারপরও এটা ঠিক, যে, সরকার ওদের বিরুদ্ধে মামলা করে অন্যায় করেছে। প্রতিবাদ অবশ্যই করতে হবে সরকারের আচরণের বিরুদ্ধে, কিন্তু গতকাল বা আজ যে বিবৃতিগুলো দেওয়া হল, কেন তোমাদের পাঁচজনের কথা উল্লেখ করা হল না একসঙ্গে, কেন ওদেরকে আলাদা করে কেবল ওদেরই মুক্তি চাওয়া হল! কেবল ওদের বাক স্বাধীনতার কথা বলা হল! তোমার বুঝি বাক স্বাধীনতা থাকতে নেই! যেদিন মামলা হল ওদের বিরুদ্ধে, তার পরদিনই এত শত শত বিবৃতির সই যোগাড় হয়ে যায় কেন? তোমার বেলায় হয় না কেন? কেউ তোমার পক্ষে দাঁড়াতে চায় না। তোমার পক্ষে না দাঁড়াক, তোমার ওপর অন্যায়ের বিপক্ষেও দাঁড়াতে চায় না। কেন চায় না জানো? চায় না কারণ তুমি একা। আবারও বলছি, বারবার বলছি, বলছি যে তুমি একা। এত বার তোমাকে এ কথা শোনাচ্ছি কারণ তুমি বিশ্বাস করতে চাও না যে তুমি একা। জনকণ্ঠ পত্রিকা একা নয়, জনপক্ষ পত্রিকা একটি বড় শক্তি। সবলের পক্ষ নিলে কোনও ঝুঁকি নেই। দুর্বলের পক্ষে ঝুঁকি আছে। তোমার সঙ্গে আজ অনেকে মানসিক ভাবে আছেন, গোপনে গোপনে আছেন, কিন্তু বিবৃতিতে নেই, প্রতিবাদে নেই, প্রকাশ্যে নেই। তুমি সুন্দরী যুবতী, তোমার সঙ্গে মানসিক ভাবেই থাকা নিরাপদ কি না।
