–কেউই আমার কথা উল্লেখ করেনি? কেউই না?
–না। কেউ না। তবে একজন উল্লেখ করেছেন। গোটা কলামটাই তিনি তোমাকে নিয়ে লিখেছেন। তিনি বদরউদ্দির উমর। লিখেছেন তোমার কোনও অধিকার নেই প্রগতিশীল হওয়ার, কারণ তুমি কোনও দিন মিছিলে যাওনি, কোনওদিন স্লোগান দাওনি।
–মিছিলে না গেলে, স্লোগান না দিলে কি প্রগতিশীল হওয়া যায় না?
–উমর তো বলছেন হওয়া যায় না।
–তবে আমি কী? প্রতিক্রিয়াশীল?
–তুমি তারও চেয়ে অধম। তুমি একটা বাজে লেখক। লিখতে জানো না। রাজনীতির কিμছু জানো না। ধর্ম সম্পর্কে তোমার যা মত, তা পেটের ভেতর রাখতে পারো না, বিপদ জেনেও ফটফট করে বলে দাও। ধর্মের বিরুদ্ধে লিখে প্রগতিশীল আন্দোলনের ক্ষতি করেছো। তোমার লেখালেখির কারণে মৌলবাদীরা একটা ইস্যু পেয়েছে।
–বদরুদ্দিন উমর কি জনকণ্ঠের সাংবাদিকদেরও দোষ দিয়েছেন? কারণ জনকণ্ঠকেও তো মৌলবাদীরা ইস্যু করেছে!
–না তা দেননি, তিনি বিবৃতি দিয়েছেন জনকণ্ঠের সাংবাদিকদের ওপর থেকে মামলা আর হুলিয়া তুলে নেওয়ার জন্য।
–আমার বিরুদ্ধে সরকারের মামলা আর হুলিয়া তুলে নিতে বলেননি?
–না। তুমি ধর্মের সমালোচনা করেছো, তোমার এসব শাস্তি প্রাপ্য ছিল, এমনই তাঁর মত। তিনি লিখেছেন তুমি অন্যের ক্রীড়নক হয়ে লিখছ।
–কার?
–অনুমান করে নাও। জানো তো কী দোষ তোমাকে দেওয়া হয়! বিজেপির, আনন্দবাজারের তুমি ক্রীড়নক!
–এগুলো তো মোল্লারা বলে। প্রগতিশীল বামপন্থীও বললেন? তিনি কি কোনও প্রমাণ দিতে পারবেন তাঁর এইসব মিথ্যের? পারবেন না। আমি কি বিজেপির একটি লোককে চিনি? চিনি না। আনন্দবাজারের কেউ কি আমাকে বলে দেয় আমি কী লিখব না লিখব? কখনই না। পশ্চিমবঙ্গে আমার লেখা পাঠক পড়তে চায় বলে আনন্দবাজার আমার লেখা ছাপে বা বই ছাপে।
–তুমি আনন্দ পুরস্কার পেয়েছো, এটাকে তোমার দোষ বলে ভাবা হচ্ছে।
–এ কী করে আমার দোষ হয়? আনিসুজ্জামান পেয়েছেন, শামসুর রাহমানও তো আনন্দ পুরস্কার পেয়েছেন, কই তাদের তো কেউ দোষ দিচ্ছে না?
–তাঁরা তো অনেক বড়। তাঁরা পেতেই পারেন আনন্দ পুরস্কার। তুমি এত ছোট হয়ে কেন পেলে, সেটাই তোমার দোষ। তুমি যদি কোনও পুরস্কার না পেতে, তুমি যদি পাঠক না পেতে, তাহলে আজ হয়ত তুমি করুণা পেতে কিছু!
–আচ্ছ!, আমি কি প্রগতিশীল আন্দোলনের ক্ষতি করেছি, নাকি মৌলবাদীরা করছে ক্ষতি? মৌলবাদীদের পক্ষ নিয়ে এই সরকার করছে ক্ষতি?
–বদরউদ্দিন উমর কোনও মৌলবাদীকে বা বিএনপি সরকারকে দোষ দিচ্ছেন না। দোষ দিচ্ছেন কেবল তোমাকে। বলছেন তুমি করেছো ক্ষতি। কেবল তিনিই নন তসলিমা, প্রগতিশীল আন্দোলনের প্রায় সব নেতাই এটা বলছেন। তুমি যাদেরকে বন্ধু মনে করতে, তাঁরাই বলছেন।
–এ কি করে হয়? আমি তো দেশটির মঙ্গলের জন্য লিখছিলাম, আমি তো বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন দেখছিলাম, আমি তো একটি সেক্যুলার রাষ্ট্রের জন্য আন্দোলন করছিলাম।
–কাজী শাহেদ আহমেদ আজকের কাগজে তোমার লেখা চাইতেন। তোমার লেখা থাকলে পত্রিকার কাটতি বাড়ে, তাই বলতেন তিনি। তুমি তো নিয়মিত লিখেছো ওই পত্রিকায়। তাঁর খবরের কাগজ, সাপ্তাহিক পত্রিকাটিতেও নিয়মিত লিখতে। তোমাকে তিনি নিমন্ত্রণ করতেন, এবং তাঁর অনেক বন্ধু যাঁরা তোমার লেখার অনুরাগী, তিনি নিজে খুব গর্ব করে পরিচয় করিয়ে দিতেন তাঁদের সঙ্গে তাঁর লেখকের। কি করেছেন সেই কাজী শাহেদ আহমেদ তুমি জানো? তিনি কাল একটি সভা ডেকেছেন, ডেকে তোমার মামলার কথা সম্পূর্ণ এড়িয়ে জনকণ্ঠের সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে জারি করা মামলার প্রতিবাদ করলেন। তা বিস্তারিত আজ ছাপাও হয়েছে আজকের কাগজ পত্রিকায়। তুমি তো যায় যায় দিন পত্রিকাতেও লিখতে। ওই পত্রিকায় সবচেয়ে জনপ্রিয় কলামটি ছিল তোমার। যায় যায় দিন পত্রিকার শফিক রেহমান একই কাজ করেছেন। সভা ডেকেছেন। সভায় জনকণ্ঠের সাংবাদিকদের ওপর থেকে মামলা তুলে নেওয়ার দাবি করলেন, তোমার ওপর থেকে মামলা তুলে নেওয়ার কথা কিন্তু বলেননি। যে সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলো প্রতি সপ্তাহে তোমার ছবি আর খবর ছেপে ব্যবসা করেছে এতকাল, সেসব পত্রিকার সম্পাদকও সাংবাদিকদের মুক্তি চাইল, ওদের মামলা প্রত্যাহার করতে বলল। তোমাকে নিয়ে ব্যবসা করল, পয়সা করল, আর প্রতিবাদের বেলায় দায়িত্ব অনুভব করল অন্যের জন্য। তোমাকে বাদ দিয়ে। আসলে জনকণ্ঠের সাংবাদিকদের পক্ষে ওরা ব্যক্তিগত পরিচয়ের কারণে প্রতিবাদ করছে না, করছে একটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার দায়িত্ব থেকে। এ যাবৎ লিখে, মৌলবাদীদের অত্যাচার নিরন্তর সয়ে তুমি কিছুই অর্জন করতে পারোনি তসলিমা, সব শূন্য। জীবন বিয়োগ দিয়ে যোগের ঘরে শূন্য জমেছে তোমার।
–তবে কি আমার বিরুদ্ধে মামলা কোনও অন্যায় মামলা নয়?
–তারা তা মনে করছে না। জনকণ্ঠ একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান আর তুমি হচ্ছ একা। তোমার মাথার ওপর মৌলবাদী শক্তি আর সরকার, উভয়ে খড়গহস্তে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু জনকণ্ঠের সঙ্গে মৌলবাদী আর সরকারের খুব বেশি বিরোধ কখনও হবে না। রাজনৈতিক কারণেই হবে না। তারা কোনও না কোনও ভাবে একে অপরের পরিপূরক। তাছাড়া জনকণ্ঠের পেছনে বড় একটি শক্তি আছে, আওয়ামী লীগ। বিবৃতিকারীরা তাই কোনও একটি শক্তির পক্ষে গেল, স্রোতের পক্ষে গেল। যে একা, যার পক্ষ নিলে বিপদ, মৌলবাদীরা সত্যিকার অর্থে যার বিপক্ষে, সরকার যার অনিষ্ট করতে চায়, তার পক্ষে কথা বলা যাবে না। তা না হলে কোরান অবমাননার অভিযোগের এই ইস্যুর মধ্যে প্রগতিশীলরা কেন একটি পক্ষ নিচ্ছেন! যদি তাঁরা বলেন যে তোমার লেখালেখি পছন্দ হয় না, তাতে কি? মতবাদ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু যে কারণে তোমার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে, সেটি তো নিঃসন্দেহে অন্যায় একটি মামলা, তা কি তাঁরা জানেন না? ঠিকই জানেন। তোমার লেখালেখি পছন্দ হবে না বলে বিবেকবান মানুষ, নীতিবান মানুষ তোমার বিরুদ্ধে মামলাটি সমর্থন করবেন কেন!
