আজ সব পত্রিকায় বিবৃতি বেরিয়েছে। বিবৃতি দিয়েছেন দেশের সমস্ত বুদ্ধিজীবীগণ। দেশের যত রাজনৈতিক দল আছে ( বিএনপি এবং মৌলবাদী দল ছাড়া), দেশের যত প্রগতিশীল সংগঠন, সংস্থা, সমিতি, পরিষদ আছে, খুব বড়, বড়, মাঝারি, ছোট, সবার, দেশের যত নারী সংগঠন আছে, যত সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী আছে, লেখকদের, কবিদের, নাট্যকারদের, শিল্পীদের, সাংবাদিকদের যত রকম সংস্থা আছে সবার, আবৃত্তির দলের, গানের দলের, নাচের দলের, খেলার দলের, হ্যাঁ সবারই বিবৃতি আজকের পত্রিকায়, প্রতিবাদে মুখর আজ দেশ, প্রতিবাদ–জনকণ্ঠের সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলার প্রতিবাদ। দাবিতে মুখর আজ দেশ, জনকণ্ঠের সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের দাবি। বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সবার ওপরে আছেন শামসুর রাহমান। বিবৃতিটি কে লিখেছেন? নিশ্চয়ই শামসুর রাহমান। শওকত ওসমান, কে এম সোবহান, বেলাল চৌধুরী, বশীর আল হেলাল, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, মুস্তফা নুরউল ইসলাম. . .। বিবৃতির পর বিবৃতি। বাক স্বাধীনতার পক্ষে বিবৃতি, কিন্তু আমার বাক স্বাধীনতার পক্ষে নয়। সুফিয়া কামাল, মালেকা বেগম আছেন, ওদিকে হুমায়ূন আহমেদ, সৈয়দ শামসুল হক, ইমদাদুল হক মিলন, আসাদ চৌধুরী…. শত শত নাম। নামী দামী মানুষ। বিশেষজ্ঞ। পণ্ডিত। সমাজের মাথা। তাত্ত্বিক থেকে সাংবাদিক, শিক্ষক থেকে চিকিৎসক, বামপন্থী ডানপন্থী মধ্যপন্থী, পন্থীহীন, নাস্তিক আস্তিক, সকলেই বিবৃতি দিয়েছেন। দেশের প্রগতিশীল মুক্তবুদ্ধি যুক্তিবাদী একটি প্রাণীও নিশ্চুপ নন। তন্ন তন্ন করে একটি, অন্তত একটি বিবৃতির মধ্যে আমার নামটি খুঁজি, জনকণ্ঠের সাংবাদিকদের সঙ্গে এই সামান্য নামটি, মাত্র চার অক্ষরের নামটি খুঁজি, কোথাও কোনও শব্দের আড়ালে আছে কি না নামটি, যেহেতু একই ২৯৫ (ক) ধারায় মামলা জারি হয়েছে আমার বিরুদ্ধেও, যেহেতু অন্যায় ভাবে আমার বিরুদ্ধেও, যেহেতু ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার অভিযোগ আমার বিরুদ্ধেও, নামটি খুঁজি, ভুলেও যদি কেউ উল্লেখ করে থাকেন নামটি, খুঁজি। নেই। কোথাও নেই। কোনও বিবৃতিতে নেই। কোনও প্রতিবাদে নেই। তবে কি এই সত্য যে আমার বিরুদ্ধে মামলা করা সরকারের উচিত হয়েছে, এবং জনকণ্ঠের সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে করা উচিত হয়নি? বিবৃতির কোথাও আমি নেই, তবে আমার নামটি আছে, আছে পত্রিকার বাকি অংশ জুড়ে–মৌলবাদীদের সভায়, সম্মেলনে, মিছিলে, ব্যানারে, কেবল আমার নামটিই আছে, আর কারও নাম নেই।
জনকণ্ঠের সাংবাদিকদের মামলা প্রত্যাহার করার জন্য সরকারের কাছে দাবি করছে, তাদের গ্রেফতারি পরোয়ানার প্রত্যাহারের দাবি করছে, তাদের বিরুদ্ধে জারি করা মামলা প্রত্যাহার করার দাবি করছে তোমার সব প্রগতিশীল বন্ধুরা। তারা কেউ তোমার বিরুদ্ধে জারি করা মামলার কথা কিছু বলছে না। তোমার প্রগতিশীল বন্ধুরা কেউই তোমার গ্রেফতারি পরোয়ানার বিরুদ্ধে টুঁ শব্দ করছে না।
আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারি না। বারবার পড়ি। আমি কি ঠিক দেখছি, ঠিক পড়ছি? হ্যাঁ তুমি ঠিক দেখছ, ঠিক পড়ছ। এটা ঘটেছে। বিস্মিত হচ্ছে!? হ্যাঁ বিস্মিত হচ্ছি। বিস্ময় আমার হৃদয়ে, বিস্ময় আমার সর্বাঙ্গে। আমি বিস্ময়ের ঘোর থেকে একতিল নড়তে পাচ্ছি না। না ডানে, না বামে। বিস্ময় আমাকে একটি মূর্তির মত বসিয়ে রেখেছে সেই সকাল থেকে, সকাল পেরিয়ে গেছে, দুপুর গেছে, বিকেল গেছে। বিস্ময় কি কেটেছে তোমার? না কাটেনি।
আমার হৃদপিণ্ড কি চলছে? জানি না। আমার রক্ত চলাচল কি বন্ধ হয়ে গেছে, জানি না। বিস্ময় আমাকে মুক্তি দিচ্ছে না। মূর্তির চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে। জল গড়াক। মূর্তির হাত জল মুছে ফেলতে সেই জলের দিকে এগোচ্ছে না। গড়াক। জল গড়াতে গড়াতে মূর্তিটি স্নান করে ফেলুক। তার আজ পাঁচদিন স্নান হয়নি। স্নানের প্রয়োজন ছিল তার।
৩. অতলে অন্তরীণ – ০৭
দশ জুন, শুক্রবার
–তসলিমা, ঘুমিয়েছো রাতে?
–না।
–ঘুম আসছে না?
–নাহ!
–তুমি জানো আজ তোমার বিরুদ্ধে বায়তুল মোকাররমে গণবিক্ষোভ মিছিল হচ্ছে!
–জানি।
–জানো আজ মিছিল তোমার বাড়ির দিকে যাবে! তোমার বাড়ি ঘেরাওএর কর্মসূচি আছে, জানো?
–জানি।
–তুমি জানো যে ৩০ তারিখ তোমার ফাঁসির দাবিতে সারাদেশে হরতাল ডাকা হয়েছে?
–জানি।
–তুমি জানো যে তোমার ঠিকানায় বিদেশ থেকে আসা চিঠিপত্র পত্রপত্রিকার পার্সেল কাস্টমসএ আটক করা হয়েছে?
–না।
–আজ পত্রিকা পড়েছো?
–না।
–কেন পড়নি? ভয় হয় বুঝি! আবার যদি দেখ তোমার পক্ষে কোনও বিবৃতি কেউ দেয়নি! তোমার বাক স্বাধীনতার পক্ষে কেউ কথা বলেনি! ভয় কেন! মানুষের সত্যিকার চেহারাটা এবার একটু চিনে নাও। ওঠো। দেখ। পড়। বোঝো।
–কেউ কি লিখেছে কিছু আজ?
–তোমার মত বোকা আমি দ্বিতীয়টি দেখিনি। আজও সব পত্রিকায় বিবৃতি গেছে, গতকাল কুলিয়ে উঠতে পারেনি ছেপে। আজও বিবৃতিতে ভরে আছে পত্রিকা! কেউ বলেনি তোমার কথা। তোমার কথা বলবে কেন? তুমি কে? তুমি কিμছু না। তুমি একটা ঘোড়ার ডিম। তুমি বোকার মত একা বসে বসে কেবল লিখেছো, সমাজের সমস্ত অন্ধকার দূর করার জন্য লিখেছো। কি লাভ হয়েছে লিখে? আজ সবাই জনকণ্ঠের সাংবাদিকদের মুক্তি চেয়েছে, তাদের মামলা হুলিয়া তুলে নেওয়ার দাবি করেছে। একটা কথা কি জানো? ধর্মের সমালোচনা তো অনেকেই করে, কিন্তু মৌলবাদীরা তোমাকে টার্গেট করেছে কারণ তারা জানে যে তুমি একা, তুমি অসহায়, এ দেশে তোমার পক্ষে দাঁড়াবার মত কোনও ব্যক্তি নেই, সংগঠন নেই, কোনও রাজনৈতিক দল নেই। মৌলবাদীদের এই উত্থানে মদত দিচ্ছে কারা, তা জানো? দিচ্ছে তাবৎ রাজনৈতিক দল, প্রগতিশীল ব্যক্তি, সংগঠন, আর বুদ্ধিজীবী – বিবৃতিঅলাদের নীরবতা। তোমাকে ফাঁসি দিচ্ছে আসলে মৌলবাদীরা নয়, ফাঁসি দিচ্ছে প্রগতিশীলরা। আজও মৌলবাদীদের পত্রিকা ছাড়া আর সব পত্রিকায়, বাংলা বল ইংরেজি বল সব পত্রিকায় জনকণ্ঠের সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সরকারের মামলা দায়েরের নিন্দা করে সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে, উপসম্পাদকীয় লেখা হয়েছে। কলাম ছাপা হয়েছে। কোথাও কেউ ভুলেও যোগ করছে না তোমার নাম। কেউ ভুলেও প্রতিবাদ করছে না তোমার মামলার।
