তসলিমা নাসরিনের ব্যাপারে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের উদ্বেগ
তসলিমা নাসরিনের নিরাপত্তা বিধান এবং তার ওপর হয়রানি বন্ধের জন্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আহবান জানিয়েছে। ঢাকাস্থ বিভিন্ন দূতাবাসের কুটনীতিকরা তসলিমার ব্যাপারে খোঁজ খবর নিচ্ছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চেয়েছেন তাঁর ব্যাপারে। মন্ত্রণালয় থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, তসলিমার বিরুদ্ধে যে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা বাংলাদেশের প্রচলিত আইনেই করা হয়েছে। কেউই আইনের উর্ধ্বে নয়। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। তসলিমার উচিত আইন অমান্য না করে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করা। (আজকের কাগজ)
তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রতিবাদ
উইমেন ডেভেলপমেন্ট ফোরামের উদ্যোগে মৌলবাদী প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর নারীর সমঅধিকার ও উন্নয়ন বিরোধী অপতৎপরতার প্রতিবাদে অনুষ্ঠিত সভায় তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ও গ্রেফতারি পরোয়ানার নিন্দা করা হয়। বলা হয়, তসলিমা পবিত্র কোরান সম্পর্কে কোনও কটূক্তি করেনি, সরকার এই মামলা করে মৌলবাদীদের উৎসাহিত করেছে। সভায় মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, মৌলবাদীরা ফতোয়া দিয়ে নারীপুরুষকে দোররা মারা, পুড়িয়ে মারা, বিষপানে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা, উন্নয়ন কার্যক্রমে নিয়োজিত বেসরকারি সংস্থার স্কুল অফিস পুড়িয়ে দেওয়া, জাতীয় পতাকার অবমাননা ইত্যাদি অপরাধ সংঘটিত হলেও এ নিয়ে সরকারসহ সংশ্লিষ্টমহল কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। অথচ হঠাৎ করেই সরকার তসলিমার বিরুদ্ধে মিথ্যে অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেছে। ২২ জন মহিলা সই করেন, রোকেয়া কবীর, সাহিদা বেগম, আফরোজা পারভিন, শিরিন বানু, সালেহা খাতুন..। নারীপক্ষ থেকেও বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। নারীপক্ষের আহবায়ক ফিরদৌস আজিম বলেছেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তার নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। সমনাগরিকত্বের সঙ্গে সঙ্গে বাক স্বাধীনতা, মুক্তচিন্তা, এবং এমন একটি পরিবেশ যেখানে বিভিন্ন ধরনের মতামত প্রকাশ করার সুযোগ প্রত্যেকটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে সুরক্ষিত — একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালু রাখার জন্য এগুলোই হচ্ছে ন্যূনতম শর্ত। বিবৃতিতে তিনি বলেন, সরকার এ পরোয়ানা জারি করে আমাদের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারকে আঘাত করেছেন। তিনি অবিলম্বে এ গ্রেফতারি পরোয়ানা প্রত্যাহার এবং তসলিমার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান। গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রণ্টের আফরোজা বেগম তসলিমার গ্রেফতারি পরোয়ানা প্রত্যাহারের দাবি করেন। নারী নির্যাতন গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারি ফেডারেশনের পক্ষ থেকেও করা হয়।
সুপ্রিম কোর্টের ৫২ জন আইনজীবী একই দাবি জানান।
চট্টগ্রামের ফতেয়াবাদে তসলিমা পক্ষ, শিবচর থানার বরহামগঞ্জ তসলিমা পক্ষ তসলিমার বিরুদ্ধে জারিকৃত গ্রেফতারি পরোয়ানা প্রত্যাহারের দাবিতে সভার আয়োজন করে। (ইত্তেফাক)
জ্ঞানকে জ্ঞান দিয়ে মোকাবেলা করার মধ্যেই প্রক্রক্রক্রকৃত মনীষা নিহিত
মুক্তিযুদ্ধের বিশিষ্ট লেখক মুক্তিযোদ্ধা ও বঙ্গবন্ধু গবেষণা সংস্থার সেক্রেটারি জেনারেল আবীর আহাদ এক বিবৃতিতে তসলিমা নাসরিনকে সংগ্রামী এবং মানবতাবাদী লেখিকা হিসেবে আখ্যায়িত করে তথাকথিত ধর্মদ্রোহীতার অভিযোগ এনে তার বিরুদ্ধে সরকারের মামলা দায়েরকে দুর্ভাগ্য বলে অভিহিত করে বলেন, ধর্মের সমালোচনা করলে যদি ধর্মের ক্ষতি হয়, তাহলে বুঝতে হবে যে ধর্মটি অতি ঠুনকো। কোরানে যেখানে পরিষ্কার বলা হয়েছে, ইসলামকে আল্লাহ নিজেই রক্ষা করবেন, সেখানে ইসলামের বিরুদ্ধে কে কি বলল না বলল তাতে কার কি আসে যায়? ধর্মের সমালোচনাকে গোনাহ বলে কোরানে উল্লেখ রয়েছে এবং গোনাহর বিচার করবেন একমাত্র আল্লাহ। সে ক্ষেষেন ইসলামের সমালোচনাকারীদের বিচারের ভার আল্লাহ কোনও মানুষকে দেননি। অথচ ইসলামের নামাবলী জড়িয়ে একশ্রেণীর অশিক্ষিত ধুরন্ধর মোল্লারা আল্লাহর দায়িত্বটা নিজেদের হাতে তুলে নিয়ে প্রকারান্তরে তারাই আল্লাহ-দ্রোহিতার পরিচয় দিচ্ছে। অবিলম্বে তিনি এই দুর্বৃত্তদের চক্রকে শায়েস্তা করার জন্যে প্রশাসনের প্রতি আহবান জানান। (আজকের কাগজ)
আমি অবাক হচ্ছি, আমার বিরুদ্ধে সরকারের এই অন্যায় মামলার প্রতিবাদ করছেন না কোনও গণ্যমান্য লেখক, নামী দামী বুদ্ধিজীবী, বড় রাজনৈতিক দল, সাহিত্যিক সাংস্কৃতিক সংগঠন! তাঁরা তো সবসময়ই যে কোনও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন, বিবৃতি দেন। আমার বোঝার সাধ্য নেই কি কারণ সকলের এমন নীরবতার। আইনজীবীদের যে বিবৃতি বেরিয়েছে, আমার বিশ্বাস তা ক যোগাড় করেছেন। ৫২ জন আইনজীবী সই করে দিয়েছেন, ব্যাপারটি কেমন যেন বিশ্বাস হতে চায় না, সম্ভবত ক একটু বেশি করেই নামধাম লিখে দিয়েছেন। গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্টএর বিবৃতির পেছনে আমার বিশ্বাস সাজু আর জাহেদার হাত আছে। তারাই এই বিবৃতি দিয়েছে। উওম্যান ডেভেলপম্যান্ট ফোরামের যে বিবৃতি, হয়ত খ করেছেন যোগাড়। দিব্য-চোখে দেখি আমার জন্য হাতে গোণা কজন মানুষ লোকের দ্বারে দ্বারে গিয়ে বিবৃতি ভিক্ষে চাইছেন। আজ আমার এমনই পরিণতি। রাতে ঙ এসে বললেন যে তিনি বুদ্ধিজীবীদের একটি বিবৃতি যোগাড় করতে চাইছেন, কিন্তু সই করার লোক বেশি নেই বলে বিবৃতি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ঙর সঙ্গে ক ও এসেছেন। বলেছেন যে দেশের অবস্থা দিন দিন ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করছে। লুকিয়ে থাকলে বেঁচে যাবো–এর কোনও নিশ্চয়তা নেই, যে কোনও সময় বিপদ হতে পারে, বিশেষ করে মৌলবাদীদের কেউ যদি আমার খোঁজ পেয়ে যায়। জামিনের অনিশ্চয়তা দিন দিন বাড়ছে। আমাকে জামিন দেওয়া হবে না, আদালতের এই সিদ্ধান্তের কথা কোনও না কোনওভাবে আমার উকিলদের কানে গিয়েছে। জামিন না দেওয়ার সিদ্ধান্তই যদি হয়ে থাকে তবে আমাকে উন্মত্ত মানুষের ভিড়ের মধ্যে আদালতে উপস্থিত করার কোনও অর্থ হয় না। জামিন তো পাওয়াই হবে না, মাঝখান থেকে আমার জীবনটি যাবে। জামিনের এই অনিশ্চয়তা, সর্বোপরি জীবনের এই অনিশ্চয়তা নিয়ে আমি একটি কাজ করতে পারি, এ মুহূর্তে এর চেয়ে ভাল সমাধান অন্য কিছু আর নেই, সে হল পালিয়ে যাওয়া।
