স্মাগলড আউট।
প্রথম ভেবেছিলাম বুঝি মজা করছেন ওঁরা। কিন্তু লক্ষ্য করি, মোটেও মজা করার জন্য নয়, ক এবং ঙ দুজনেই এ বিষয়ে রীতিমত গুরুগম্ভীর আলাপ করলেন, এবং একমত হলেন। দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া– হাজার রকম অসম্ভব জিনিস আমি কল্পনা করতে পারি, কিন্তু এটি পারি না। আমার দিকে চারটে চোখ যখন প্রশ্ন নিয়ে তাকালো, আমি বললাম, আমি অবৈধভাবে দেশ ছাড়ব না। আমি পালাবো না। দেশের পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হবে, তখন হয়ত পালানোর আর কোনও সুযোগও থাকবে না। এখনও হয়ত ঝুঁকি নিয়ে হলেও এ কাজটি করা যায়। কোনও একটা গাড়ির ব্যবস্থা হবে, গাড়িতে আমাকে তুলে নিয়ে কোথাও কোনও সীমান্তের দিকে অন্ধকারে ছেড়ে দেওয়া হবে। আমার চেহারা বেশভুষা সম্পূর্ণ অন্যরকম থাকবে, ওখানে ধরা পড়লেও যেন কেউ চিনতে না পারে। হেঁটে সীমান্ত পেরিয়ে যাবো। বাঁচার জন্য মানুষ তো অনেক কিছু করে। আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে খুব দ্রুত। কারণ দিন দিন দিন জটিল হচ্ছে। সরকার মৌলবাদীদের হাতের পুতুল হয়ে উঠছে। কথায় কথায় জনকণ্ঠের কথা ওঠে। জনকণ্ঠে গতমাসে ক্লান্ত পথিক ছদ্মনামে এটিএম শামসুদ্দিনের একটি কলাম ছাপা হয়েছিল, শামসুদ্দিন মূলত সেই মোল্লাদের সমালোচনা করেছিলেন, যারা গ্রামে গ্রামে এনজিওতে কাজ করা মেয়েদের ফতোয়া দিচ্ছে। উত্তরবঙ্গের গরিব মেয়েদের তুত গাছ লাগানোর কাজ দিয়েছিল ব্র্যাক। কিন্তু গ্রামের মোল্লারা মেয়েদের লাগানো তুত গাছ কেটে ফেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। মেয়েদের বলে দেয় তারা যদি এনজিওতে কাজ করা বন্ধ না করে তবে তাদের সমাজচ্যুত করা হবে, স্বামীদের বাধ্য করা হবে তাদের তালাক দিতে। কলাম লেখক কাঠমোল্লারা যে কোরানের ভুল ব্যাখ্যা করে ফতোয়া দিচ্ছে তাই বলতে গিয়ে তাঁর ছোটবেলার একটি শোনা ঘটনা বর্ণনা করেন, ঘটনাটি এরকম, আমিন নামের এক লোকের কাছে সুন্দরী বিধবা জৈয়তুনের একটি বলদ বর্গা ছিল। আমিন জৈয়তুনের কাছে প্রেম নিবেদন করে ব্যর্থ হলে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য সে গরুটি বিক্রি করে দেয়। তো জৈয়তুন টাকা চেয়ে পাঠায় বলদের। কিন্তু আমিন বলদটি তার নিজের ছিল বলে দাবি করে। গ্রামের মোল্লাদের কাছে জৈয়তুন বিচার চায়। বিচার বসে। এদিকে কিন্তু কাঠমোল্লাদের কিছু টাকা পয়সা দিয়ে আমিন ব্যবস্থা করে রেখেছে। সালিশ বসে গ্রামে, কাঠমোল্লারা সুরা ত্বিন থেকে পড়ে ওয়া হাজাল বালাদিন আমিন, এর অর্থ ওরা বলে, পবিত্র কোরানে বলা হয়েছে বলদটি আমিনের। নিরক্ষর জৈয়তুন কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে যায়। এই হল জনকণ্ঠের দোষ, মোল্লাদের নিয়ে ঠাট্টা করে লেখা একটি কলাম ছেপেছে জনকণ্ঠ। ক্লান্ত পথিক তো তবু মোল্লাদের সম্মান করেছেন। কেবল কাঠমোল্লাদের গাল দিয়েছেন, কাঠমোল্লাদের তো মোল্লারাই গাল দেয়। মূর্খ লোকেরা যারা নিজেদের মোল্লা বলে দাবি করে লোক ঠকানোর ব্যবসা করে, তাদের বলা হয় কাঠমোল্লা। কোরানে ভাল কথা লেখা আছে, কিন্তু কোরান হাদিস সম্পর্কে কোনও জ্ঞান নেই বলে কাঠমোল্লারা কোনও আয়াতের বা কোনও সুরার সঠিক ব্যাখ্যা না করে অপব্যাখ্যা করে নিজেদের স্বার্থে, এ কথাই ক্লান্ত পথিক বলেছেন। লেখাটিতে কাঠমোল্লাদের দোষ দেওয়া হয়েছিল, কোরানের সুরাকে দোষ দেওয়া হয়নি। কিন্তু মৌলবাদীদের কিছু একটা ধরতে হয়, ধরতে হয় বলেই জনকণ্ঠকে ধরা। আমাকে যখন ধরে, তখন কিন্তু ঠিক ঠিকই ধরে। আমি তো কোরানের সুরা আয়াতকেই নিন্দা করেছি। আমার ফাঁসির দাবিতে যখন মৌলবাদীদের আন্দোলন সারাদেশে বিশাল আকার ধারণ করল, তখন তারা সুযোগ পেয়ে গেল একটি একটি করে মৌলবাদবিরোধী শক্তিকে ঘায়েল করার। সরকার মৌলবাদীদের প্রতিটি দাবি মেনে নিচ্ছে। আজ জনকণ্ঠের চারজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ২৯৫ (ক) ধারায় সরকার মামলা করে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে, দুজন সাংবাদিককে ধরেছে পুলিশ, দুজন পলাতক। মৌলবাদীদের দাবি মেটানো ছাড়া সরকারের এখন আর বড় কোনও কাজ নেই। আমার পরিস্থিতির সঙ্গে জনকণ্ঠের সাংবাদিকদের পরিস্থিতির তুলনা করা যায় না। কারণ জনকণ্ঠের কোনও সাংবাদিকের ফাঁসির দাবি মৌলবাদীরা করেনি, দাবি করেছে জনকণ্ঠ পত্রিকা নিষিদ্ধ করার। জনকণ্ঠের সাংবাদিকদের নামও মৌলবাদীরা জানে না, চেহারাও চেনে না। সুতরাং সরকার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে একই মামলা করলেও আমি হচ্ছি মৌলবাদীদের মূল টার্গেট।
ক এবং ঙ আমার পালাবার ব্যবস্থা কিভাবে করা যায় তার একটি ছক আঁকলেন। ঘরে অতি সামান্য আলো। কথাবার্তা নিচু স্বরে। কেমন ভূতুড়ে লাগছে সবকিছু। কানে একসময় কারও কোনও কথা পৌঁছয় না। কাঠ কাঠ লাগে শরীরটি। নিজের স্বরে নিজেই আমি চমকে উঠি, যখন শুনি যে বলছি, আমি পালাবো না। তার চেয়ে ভাল আত্মসমর্পণ করব।
এ সময় আত্মসমর্পণ করা আর মৃত্যুদণ্ড গ্রহণ করা যে সমান কথা, এ বিষয়ে ক এবং ঙ অনেকটা একমত। এই সরকারের ওপর কারও আস্থা নেই। মৌলবাদীদের দাবি মেনে আমার ফাঁসির ব্যবস্থা যে এই সরকার করবে না তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।
আত্মসমর্পণ!
হ্যাঁ, আত্মসমর্পণ। আমার বিচার করতে চায় বিচার করুক। যত হোক দেশের আইন। আইন সবাই মানছে, আমি মানবো না কেন!
ভেবে বলছ কথাটা? ঙ জিজ্ঞেস করেন।
এই আইনে দুবছরের জেল হয়। দুবছর জেল খাটব। কত মানুষই তো জেল খাটে। বলে একটি দীর্ঘশ্বাস সামলে নিই।
