সকালেই ঙ আসেন। এসেই খাবার ঘরের জানালর কাছে দাঁড়িয়ে বাইরের চারদিক দেখে আবিষ্কার করেন যে পাশের তিনতলা বাড়িটির বারান্দা থেকে এ বাড়ির খাবার ঘরটি চাইলেই কেউ দেখতে পারে। একটি পর্দা টাঙিয়ে দেবেন কী না জানালায় তা নিয়ে ভাবেন। কিন্তু আবারও ভাবেন যে হঠাৎ করে পর্দা টাঙিয়ে দিলে কারও যদি আবার সন্দেহ হয়! বাড়িতে একটি ঘোমটা পরা মহিলাকে দেখা গেছে একদিন, তার পরই জানালায় পর্দা ঝুলছে! সন্দেহের কারণ বটে। ঙ সরে আসেন জানালা থেকে, গলা চেপে বলেন, ওদিকটায় যেও না। যাবো না। ঙ কি আজ জানালা দরজা পরীক্ষা করতে এসেছেন! কোথায় আমি যাবো, কোথায় আমি যাবো না তা দাগিয়ে দিতে এসেছেন! না, এসব কারণে আসেননি ঙ। ঙ এসেছেন খুব জরুরি একটি কাজে। আমাকে দিয়ে এক্ষুনি তিনি একটি চিঠি লিখিয়ে নিতে এসেছেন, চিঠিটি আমাকে লিখতে হবে জাতীয় সংসদের স্পীকারের কাছে। ঙর কপালে, গালে, গলায় বিন্দু বিন্দু ঘাম, ঘাম গরমের নাকি ভয়ের তা নিয়ে যখন ভাবছি, বললেন, দেশের অবস্থা খুব খারাপ তসলিমা। আমরা কেউ বুঝে পাচ্ছি না কি হতে যাচ্ছে .। সংসদ ভবনে বাংলাদেশের পতাকার বদলে চাঁদ তারার পতাকা উড়েছে সেদিন।
এসব বলছেন কি! এত বড় স্পর্ধা ওদের!
আতঙ্ক আমাকে আঁকড়ে ধরে।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঙ বলেন, দেশের মানুষকে কি জানাতে চাও, বল। তোমার কথা তাদের শোনা দরকার। কোরান সংশোধনের কথা যে বলনি তা লেখ।
বিরক্ত কণ্ঠে বলি, আমি তো বলেইছি যে আমি বলিনি। কতবার বলব!
আবার বল। আবার লেখ। এই চিঠি স্পীকারের কাছে যাবে, সব পত্রিকায় যাবে। আমি ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলেছি। তাঁরাও আমাকে বললেন যে স্পীকারের কাছে চিঠি লিখে দেখা যাক কি হয়।
–কী লিখব, আমি কোরান বিশ্বাস করি না সুতরাং কোরান সংশোধন করার কথা বলার আমার কোনও কারণ নেই!
–কোরান বিশ্বাস কর না, এ কথা বলার তোমার দরকার নেই এখন। এসব কথা আগে অনেক বলেছো। খুব বিনীত হয়ে এই চিঠিটি লেখ।
ঙ আমার দিকে কাগজ কলম এগিয়ে দেন। আমি দ্রুত লিখতে থাকি,
মাননীয় স্পীকার,
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ।
সম্প্রতি সরকার আমার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছেন। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আমি নাকি কোরান শরিফ সংশোধনের কথা দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার এক সাক্ষাৎকারে বলেছি। অথচ কোরান শরিফ সংশোধনের কথা আমি কখনও কোথাও কোনওদিনই উচ্চারণ করিনি। আমার বিশ্বাস এবং মতবাদ নিয়ে আমার রচিত ২১টি বইয়ের কোনও বাক্যেও কোরান সংশোধনের প্রসঙ্গ নেই।
কলকাতার দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার জন্যে যে অমুসলমান মেয়েটি আমার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিল, সে কোরান ও শরিয়া আইনের মধ্যে কী পার্থক্য তা স্পষ্ট জানে না। তাই শরিয়া বিষয়ে আমার উত্তরকে কোরানের সঙ্গে যুক্ত করে ফেলে। তার প্রশ্ন ছিল, তিরিশের দশকে আল্লামা ইকবাল শরিয়া আইনের পরিবর্তনের কথা বলেছিলেন, এ সম্পর্কে আপনার মত কি? আমি তখন উত্তরে বলি, শরিয়া আইনের অল্প পরিবর্তন আমি চাই না, ১৯৬১ সনে আমাদের দেশে শরিয়া আইনের কিছু পরিবর্তন ঘটেছে, কিন্তু আমি চাই সংশোধিত শরিয়া আইন অর্থাৎ মুসলিম পারিবারিক আইনের পরিবর্তে একটি আধুনিক আইন (য়শভপষক্ষল দভৎভর দষধন)যাতে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত হয়। এই দাবি আমার একার নয়, দেশের প্রতিটি নারী আন্দোলন সংস্থা এই দাবি দীর্ঘদিন থেকে করে আসছে। স্টেটসম্যানের অনভিজ্ঞ সাংবাদিকটি আমার এই বক্তব্যকে সংক্ষেপ করে শরিয়ার স্থলে কোরান বসিয়ে দিয়েছে। কোরান যে সংশোধন করা যায় না তা আমি এর আগের একটি প্রশ্নের উত্তরে স্পষ্ট করে বলেছি কোরানের একটি শব্দও কেউ কখনও পরিবর্তন করতে পারবে না। এই বক্তব্য দ্য স্টেটসম্যানের সাক্ষাৎকারে ছাপাও হয়েছে। ৯ই মে তারিখে বড় বড় ভুলসহ আমার সাক্ষাৎকারটি স্টেটসম্যানে ছাপা হবার পরদিনই আমি প্রতিবাদ করি, যা ওই পত্রিকার ১১মে তারিখে ছাপা হয়েছে। প্রতিবাদের মূল কথা ছিল, আমি কখনও কোথাও কোরান সংশোধনের কথা বলিনি। যারা এখন উদ্দেশ্যমূলক ভাবে যে কথা আমি বলিনি সে কথা প্রচার করে আমার ফাঁসি চাইছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ না নিয়ে, কোনও তথ্য যাচাই না করে আমাকেই আসামী করে সরকার মামলা রুজু করেছেন। এটি যে কোনও মানুষেরই মৌলিক ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি হতাশাজনক দৃষ্টান্ত। আমি এই অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করছি।
এটুকু লেখার পর ঙ বললেন, কোরানের আগে পবিত্র শব্দটি বসিয়ে দাও।
না, এটা লিখব না। আমি বলি।
পবিত্র শব্দটি জুড়ে দিলে কী ক্ষতি?
কোনও ক্ষতি নেই। কিন্তু কোরানকে আমি পবিত্র বলে মনে করি না। আমার বইগুলোতে কোরান সম্পর্কে বিস্তর সমালোচনা আছে। তাছাড়া বেদ বাইবেল ও কোরানের নারী নামের লেখাটি ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়েছে পত্রিকায়। সবাই জানে যে আমি কোরানকে মোটেও পবিত্র ভাবিনা। তাছাড়া পবিত্র লিখলেই কি না লিখলেই কি, কোরান তো কোরানই। যারা এটিকে পবিত্র মনে করে তারা করবেই।
ঙ ঠোঁট সজোরে যুক্ত করে ভেবে বলেন, নিরাপত্তার কথা লেখ। তোমার, তোমার ফ্যামিলির। ফ্যামিলির কাকে কাকে নাকি পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। তোমার বাবার ওপর হামলা হচ্ছে। মৌলবাদীরা ফাঁক খুঁজে বেড়াচ্ছে আক্রমণ করার জন্য।
