আধাঁর আঁধার ঘরটিতে ক, খ, ঙ, চ এবং আমি। আমাদের মধ্যে খুব নিচু গলায় কথা হয়। ক বলেন যে তিনি আমার উকিলের কাছে গিয়েছিলেন, উকিল এখনও আদালতে যাননি আমার জামিনের জন্য। ডঃ কামাল হোসেন দেশে ছিলেন না, তিনি ফিরে এসে অবস্থাটা বুঝতে চেষ্টা করছেন। ক আরও বললেন যে যেহেতু এই মামলায় জামিন হয় না, সুতরাং জামিনের জন্য যদি উকিল লড়তে চান, তবে দেশের জনগণ যে আমার বিরুদ্ধে জারি হওয়া মামলা আর গ্রেফতারি পরোয়ানার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে, তা বলতে হবে, তার প্রমাণ দেখাতে হবে। তাই আমার পক্ষে এখন জনমত দরকার, পত্রিকায় আমার পক্ষে বিবৃতি দরকার। এটিই এখন সরচেয়ে জরুরি। ক নিজে বিবৃতি যোগাড় করার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন, কিন্তু কেউ, কোনও বুদ্ধিজীবী, লেখক, রাজনীতিক বিবৃতি দিতে চাইছেন না। কে দিতে চাইছেন না, তা আমার জিজ্ঞেস করার সাহস হয় না। আমি বলি, কিছু বিবৃতি তো গেছে। কর মুখে দুশ্চিন্তার দাগটি আরও ঘন কালো দেখায় যখন বলেন, ও কটা বিবৃতিতে কিμছু কাজ হবে না।
খ বললেন, তোমার জন্য এ দেশের লোকের সাপোর্ট আছে, তোমার পক্ষে দাঁড়াবার জন্য এটিই একমাত্র বেইস।
ঙ বললেন, বিদেশি কিছু ইম্পর্টেন্ট অরগানাইজেশন তো প্রতিবাদ করেছে।
ক বললেন, হ্যাঁ বিদেশি অরগানাইজেশনের সাপোর্ট আছে। কিন্তু দেশি সাপোর্ট লাগবে। দেশি সাপোর্টএর মূল্য এখন বেশি।
সারা হোসেনের সঙ্গে কথা হয়েছে আপনার? ক কে জিজ্ঞেস করি।
ক বললেন, আপনার ভাগ্য খুব ভাল যে আপনি ডক্টর কামাল হোসেনের মত উকিল পেয়েছেন। তাঁর মেয়ে সারা হোসেন আপনার জামিনের ব্যাপার নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। কোর্টে আপনার অনুপস্থিতিতে জামিন নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। কারণ কোর্টে যাওয়া তো আপনার জন্য রিস্কি। যতদূর মনে হচ্ছে জামিন পাওয়া মোটেও সহজ নয়। এ দেশে কজন উকিল এধরনের কেইস করার ঝুঁকি নিতে পারে? চারদিকে খবর হয়ে গেছে যে কামাল হোসেন আপনার উকিল। পাবলিক সেন্টিমেণ্টের ব্যাপার। কখন বোমা মেরে উড়িয়ে দেয় উকিলের অফিস কে জানে! কামাল হোসেন একটা পলিটিক্যাল পার্টির লিডার। আপনার পক্ষ নিলে তাঁরও ক্ষতি হবে।
দীর্ঘ একটি শ্বাস গোপন করি।
খ বললেন, ঙ যে কত উপকার করলেন আজ। ঙর সঙ্গে যদি আজ দেখা না হত তবে তোমাকে কোনও বাড়িতে আশ্রয় দেয়ার ক্ষমতা ছিল না। ঘ যখন জানিয়ে দিলেন যে তোমাকে তিনি আর রাখতে চাইছেন না, মোট সাতজনের সঙ্গে আমি গোপনে কথা বলেছি, কেউ তোমাকে রাখার ঝুঁকি নিতে চান না। একমাত্র ঙ রাজি হয়েছেন।
ক হঠাৎ অপ্রাসিঙ্গকভাবে লজ্জার কথা তুললেন। বললেন, আপনার উচিত ছিল লজ্জা বইটাতে একটা ব্যালেন্স রাখা। ভারতের মুসলমানের ওপর কি হয়েছে, সেটা আপনি পুরো এড়িয়ে গেছেন। সত্যি কথা বলতে কি, এ দেশের মানুষ আগে যেমন আপনাকে পছন্দ করত, এখন আর তেমন করে না।
দীর্ঘশ্বাস জানে কতটা দীর্ঘ তার পথ।
ক হঠাৎই উঠে পড়েন, উঠে বিরক্ত গলায় বলেন, আপনি এত দীর্ঘদিন থেকে নারীবাদী লেখা লিখছেন। আপনার কেন কোনও মহিলা সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না! কেন করেননি যোগাযোগ? দেশে এত সংগঠন, আপনি কোনও সংগঠনের সদস্য নন। আজ যদি আপনি কোনও একটা মহিলা সংগঠনের সদস্য হতেন, আপনার এই অসুবিধা হত না।
যাবার আগে ক চকে বললেন দরজা তো বটেই, জানালাগুলোও সব সময় বন্ধ রাখার জন্য, যেন বাইরে থেকে কেউ আমাকে দেখার সুযোগ না পায়। টেলিফোন তালাবন্ধ রাখার জন্য যেন কোনওভাবেই আমার হাতের নাগালে টেলিফোন না আসে কারণ ভুল করে আমি এমন কাউকে ফোন করে ফেলতে পারি যার বাড়ির ফোনে আড়ি পাতা হচ্ছে, পুলিশ তখন জেনে যাবে কোন বাড়িতে আমি আছি, তখন কেবল আমার সর্বনাশ হবে না, চ র ও হবে।
৩. অতলে অন্তরীণ – ০৫
আট জুন, বুধবার
যে ঘরটিতে আমাকে থাকতে দেওয়া হয়েছে, সে ঘরটিতে একটি জানালা আছে, জানালাটি বন্ধ। ঘরে কোনও পাখা নেই। জুন মাসের গা সেদ্ধ করা গরম। সারারাত গরমে ঘামি, ছটফট করি, উঠে বসি, আবার শুই। মশা ভনভন করছে, কামড়াচ্ছে। অন্ধকারে এপাশ ওপাশ করছি, জলতেষ্টায় কাতরাচ্ছি, কোথায় আলো পাবো, জল পাবো, একটি হাতপাখা পাবো, জানি না। এক রাতেই ঘামাচিতে ভরে গেছে পুরো মুখ। মশার কামড়ের লাল লাল দাগ হাতে পায়ে গালে গলায়। সকালে এককাপ চা খাবার তৃষ্ণায় অস্থির হই। কিন্তু কোথায় পাবো চা! এ বাড়িতে চায়ের চল নেই। চ সকালেই তাঁর চার বছর বয়সী কন্যাটিকে নিয়ে বেরিয়ে গেছেন, ওকে ইশকুলে ছেড়ে দিয়ে তিনি আপিসে যাবেন। বিকেলে বা সন্ধ্যায় ফিরবেন। চর স্বামী ঢাকার বাইরে থাকেন। এ বাড়িতে চ তাঁর কন্যা নিয়ে থাকেন, বাড়ির কাজ কর্ম করার জন্য দশ এগারো বছর বয়সী বল্টু নামের একটি ছেলে আছে। বল্টু রান্না বান্না করে খেয়ে দেয়ে খাবার ঘরে বসে থাকবে। আমি ঘরের দরজা বন্ধ করে পাখাহীন ঘরটিতে বসে থাকব। পেচ্ছ!ব পায়খানায় যেতে হলে আশপাশ দেখে নিয়ে মাথায় কাপড় চোপড় দিয়ে নিজেকে যতটা সম্ভব অচেনা করে ঢুকে যাবো। যদি ক্ষিধেয় মরে যেতে থাকি, কিছু খাবার পেটে না দিলেই নয়, তবে, টেবিলে, আশেপাশের বাড়ির বারান্দা বা জানালা থেকে কেউ কোনও রকম ছিদ্র দিয়েও যেন আমাকে দেখতে না পায় এমন ভাবে বসতে হবে, খেতে হবে। হাঁটাচলা করতে হবে নিঃশব্দে, যেন নিচের তলার লোকেরা টের না পায় যে এ বাড়িতে একটি মানুষ হাঁটছে। মাথার কাপড় যেন কখনও না খসে আমার, বল্টুর যেন কোনও সন্দেহ না হয় যে আমি চর কোনও দূর সম্পর্কের আত্মীয় নই, আমার স্বামী মারা যায়নি, আমি শহরের আত্মীয়দের কাছে অর্থ সাহায্যের জন্য আসিনি। বল্টুর সঙ্গে চোখাচোখি মুখোমুখি পারতপক্ষে না হলে ভাল। সদর দরজায় হঠাৎ বাইরে থেকে তালা পড়লে এখন সন্দেহ জাগবে। বল্টুর তো জাগবেই, প্রতিবেশিদেরও জাগবে। সুতরাং যা চ আগে করছিলেন, তাই করেছেন, শোবার ঘরে তালা দিয়ে গেছেন। খোলা শুধু রান্নাঘর আর গরম ঘরটি, আর এক চিলতে খাবার ঘর নামক জায়গাটি। সকাল পার হতে থাকে, চা পাওয়া হয় না, কিন্তু মাথায় লম্বা ঘোমটা টেনে, যেন গহীন গ্রামের লজ্জাশীলা ফুলবিবি, দুটি রুটি আধা চিবিয়ে আধা গিলে গরমে সেদ্ধ হতে চলে আসি জানালা বন্ধ ঘরটিতে। টেলিফোনের লেজটি বেরিয়ে এসেছে চর শোবার ঘরের দরজার তল দিয়ে। খাবার ঘর থেকে সরিয়ে ফোনটি শোবার ঘরে বন্দি করা হয়েছে। যেন আমি শিশু, আমার নাগাল থেকে কাচের বাসন কোসন সরিয়ে রাখা হচ্ছে। তা হোক, আমি তো অনেকটা শিশুই এখন, অন্যের ওপর নির্ভর করে আছি সব কিছুর জন্য। কোথায় সেই স্বাধীনচেতা মানুষটি! মানুষটির দিকে এখন তাকাতে পারি না। কী হচ্ছে দেশে, জামিন কবে পাবো, কবে মুক্তি পাবো এই লুকিয়ে থাকা থেকে! কিছুই জানি না। সম্ভবত কোনও জামিন আমার হবে না, সম্ভবত আমাকে ছুঁড়ে ফেলা হবে কারাগারে। এই কারাগারের মত বাড়িটিতে সম্ভবত আমার একরকম মহড়া চলছে সত্যিকার কারাগারে থাকার।
