এর উত্তরে আমি কিছু বলি না, শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলি। আমি জানি ঘ এখন যা বলছেন, তা এদেশের অধিকাংশ লোক বলছেন। নাহ, প্রতিবাদ এখন আর আমি করছি না। আমার মানসিক শারীরিক সব শক্তি আমি হারিয়ে বসে আছি।
ঘ বিশ্রাম নিতে তাঁর নিজের ঘরে চলে যান। বাইরে থেকে আমার ঘরের দরজাটি বন্ধ। অন্ধকার জানালায় মুখ করে শুয়ে ছিলাম। যদিও রাজদরবারে গিয়ে মসনদে বসার কথা ছিল আমার, বসা হয়নি। মসনদের জন্য আমার কোনও আগ্রহ জন্মে না, এই ঘরে শুয়ে বসে অপেক্ষার এক একটি মুহূর্ত তো নয়, যুগ পার করছি জামিনের খবর শোনার জন্য। কেবল ক র আসার অপেক্ষা। ক আমার জন্য জামিন হওয়ার একটি সুসংবাদ নিয়ে দেবদূতের মত উদয় হবেন। তাঁর উদয়ের পথে আমি উদগ্রীব প্রাণ নিয়ে তাকিয়ে আছি। এসময় হঠাৎ ঘরে ঢোকেন ঘ। ক র কথা জিজ্ঞেস করেন। ক কোথায় আছে তা আমি জানি কি না জানতে এসেছেন।
না আমি জানি না।
ঘ বললেন ককে তাঁর খুব দরকার। ককে কেন দরকার তাঁর, তা আমি জিজ্ঞেস করি না। কিন্তু তিনি নিজেই বলেন, কর আজ আসা দরকার আমাকে নিয়ে যাবার জন্য।
কান তুমি বধির হও।
কান বধির হয় না।
–আপনি তো বলেছিলেন, আমি এখানে যতদিন দরকার হয়. ততদিন থাকতে পারব! নিজের স্বরে নিজেই চমকে উঠি, স্বরটি কান্নার মত শোনাচ্ছে।
–বলেছিলাম। তখন বুঝতে পারিনি এ যে কত বড় ঝুুঁকির ব্যাপার। ক কোথায় আছে এখন, তুমি জানো না?
মাথা নাড়ি। গলায় আর স্বর ফুটছে না।
আবারও অস্ফুট কণ্ঠ আমার, কাল আমার জামিন হয়ে যাবে হয়ত। আজকের রাতটা অন্তত থাকি..
ঘ বললেন, দেখ, একটা রাত কেন, অনেকগুলো রাতই তুমি থাকতে পারতে। কিন্তু আমার একটা সন্দেহ হচ্ছে। পাশের ফ্ল্যাটের মহিলা আমার বাসায় দুবার কড়া নেড়েছে। দুবারই আমি তাকে দেখেছি দরজায় বাইরে থেকে ভেতরে উঁকি দিচ্ছে। কখনও সে এমন করে না। নিশ্চয়ই সে সন্দেহ করছে..
–ক এখন আমাকে নিয়ে কোথায় যাবেন? ক র তো কোনও জায়গা নেই আমাকে রাখার!
–সে ক জানবে।
স্বরটি থেকে লু ছুটে আমার চোখ মুখ পুড়িয়ে দিতে চায়।
অবিরল অশ্রুধারা পোড়া থেকে বাঁচায় আমাকে।
ঘ অন্য ঘরে চলে যান। ঘ র কণ্ঠস্বর ভেসে আসে অন্য ঘর থেকে। জ্ঞআমার বাসায় তুমি একটা কলম রেখে গেছিলে, কলমটা নিয়ে যেও আজ। আজই কিন্তু নিতে হবে, কারণ আমি কাল সকালেই ঢাকার বাইরে চলে যাচ্ছি। তুমি না আসতে পারলে অন্য কাউকে পাঠিয়ে দিও নিয়ে যেতে। উহ, যে গরম পড়েছে এ সময় জার্নি করাও মুশকিল…’
মধ্যরাতে ক আর খ আসেন। দুজনের মুখেই দুশ্চিন্তার কালো দাগ। আমি যে কত বড় বোঝা এখন, আমি যে কত বড় ঝুঁকি এখন তাঁদের কাছে, দাগটি দেখেই বুঝি। হাড়ে মজ্জায় টের পাই। ক কে আকুল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করি, কিছু হল জামিনের? ক মাথা নাড়েন। না বোধক। ঘ একবার ক কে জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় এখন নিয়ে যাচ্ছ? ক উত্তর দেন নি। ঘ আমার মাথার ওপর তাঁর নিজের একটি চাদর ফেলে বললেন যেন এটি দিয়ে মুখ মাথা সব ঢেকে ফেলি। ঢেকে সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত নামতে হয়। যেন কেউ কোনও বাড়ির দরজা খুলে এ সময় বেরিয়ে আমাকে দেখে ফেলার সুযোগ না পায়। মুখ মাথা ঢেকে বসে থাকতে হয় পাথরের মূর্তির মত গাড়িতে। কেউ কোনও কথা বলছে না। গাড়ি কোথায় কোনদিকে যাচ্ছে, কিছুই আমার বোধে আসে না। গাড়ি হঠাৎ একসময় থেমে যায়, হঠাৎই অন্ধকার থেকে লাফিয়ে কেউ একজন গাড়িতে ওঠেন। গাড়িতে যিনি ওঠেন, তাঁর নাম ধরছি ঙ। ক, খ এবং ঙর মধ্যে কোনও কথা হচ্ছে না। ঙ কেবল গাড়ির চালককে বামে, ডানে, সামনে শব্দগুলো বলছেন। গাড়ি যখন এক গলিতে ঢুকলো, গলির ভেতরে একটি ট্রাক আমাদের উল্টো দিক থেকে এসে পথরোধ করে দাঁড়ালো, কারও পাশ কেটে যাওয়ার কোনও অবস্থা নেই। ট্রাকের পেছনে দুটো গাড়ি এসে থামল, আমাদের গাড়ির পেছনে একটি গাড়ি, পাশে চারটে রিক্সাও থামল। ট্রাক চালক নেমে এল যানভিড় হালকা করার জন্য। আমাদের গাড়ির চালককে পেছনে যাবার নির্দেশ দিচ্ছে। গাড়িগুলো ভেঁপু বাজাচ্ছে, কিছু পথচারী থেমে আছে জটলার মধ্যে। গাড়ির আলো এসে পড়ছে মুখে। উপুড় হয়ে বস্তার মত পড়ে থাকব ভেতরে, সেটিও সম্ভব হচ্ছে না। পথচারির চোখে পড়তে পারে বস্তা হওয়ার দৃশ্য। মুখ বেশি ঢাকা যাচ্ছে না, বেশি করে মুখ ঢাকলে সন্দেহ হবে, এমনিতে গরমকালে শীতের চাদরে মাথা ঢাকাটাই উদ্ভট। আমি শাড়ির আঁচল দিয়ে নাক ঢেকে রাখি, যেন নাক ঢাকছি ধুলো বালি এড়াতে। নাক ঢাকতে গিয়ে চিবুক ঢাকা হয়ে যাচ্ছে, ঠোঁট ঢাকা হচ্ছে, গাল হচ্ছে। চাদর মাথার ওপরে বেশি টেনে দেওয়ার ফলে কপালের খানিকটা ঢাকা হয়েছে। বাকি আছে চোখদুটো। চোখদুটোতে আশংকা, এ্ই আশংকাই কারও নজরে পড়লে সংশয় জাগাবে। কিন্তু আশংকাকে কোথায় লুকোই আমি! আশংকা নিয়ে চোখদুটো নত হয়ে থাকে। কিন্তু রাস্তায় যান বাহন জট পাকাচ্ছে, আমি তো আর আপাদমস্তক বোরখায় ঢাকা নই, আমি কেন চোখ তুলে দেখছি না কি হচ্ছে না হচ্ছে! গাড়ির ভেতর এক চালক ছাড়া আমরা সব শ্বাস বন্ধ করে রাখছি। আমার মাথাটি আলতো করে ধরে খ তাঁর নিজের কাঁধে রাখেন। এবার আমি মনে মনে বুঝি, আমাকে কি করতে হবে, আমাকে চোখ বুজে থাকতে হবে, আমি যে অসুস্থ এক মহিলা, গাড়ি করে কোনও হাসপাতালের দিকে যাচ্ছি, অথবা হাসপাতাল থেকে এসেছি, তা যেন অনুমান করে নেয় যে কেউ, যারই চোখ আমার মুখে পড়ে। গাড়ির জট খুলে রাস্তা পরিষ্কার হতে বারো মিনিট সময় নেয়, এই বারো মিনিট আমার কাছে বারো বছরের মত দীর্ঘ। যেন বারো বছর ধরে আমার সশস্ত্র আততায়ীটির চোখের সামনে নিরস্ত্র বসে আছি। গাড়ি থামলে আমাকে আর সবার সঙ্গে নেমে পড়তে হয়। মুখ মাথা ঢাকা আমি, কেবল চোখদুটো খোলা। দোতলা একটি বাড়ির দোতলায় উঠি মুখ মাথা খোলাদের সঙ্গে সঙ্গে হেঁটে। ঘর অন্ধকার করে ভেতরে যে মেয়েটি বসেছিলেন, তার নাম চ। ঘরের আধো আধো আলোয় আমি ঙ কে চিনতে পারি, ঙ দেশের একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি। বড় মাপের একজন বুদ্ধিজীবী। ঙ র বাড়িতে আমি আগে দুবার গিয়েছি, একবার কজন সাহিত্যিককে ডেকেছিলেন একটি ঘরোয়া আলোচনায়, আর একবার ঙ এবং ঙর স্ত্রী আমাকে এবং আরও কজনকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন, সে নিমন্ত্রণে গিয়েছিলাম। ঙর মত এত বড় একজন মানুষ আমাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছেন, এটি আমাকে নিরাশার গাঢ় অন্ধকার থেকে টেনে আলোতে ওঠায়। কি করে ক র সঙ্গে ঙ র যোগাযোগ হল, কিছু আমি জানি না। যে বাড়িতে ঙ আমাদের নিয়ে এলেন, এটি তাঁর কন্যার বাড়ি। চ নামের মেয়েটি তাঁর কন্যা।
