দুপুরবেলা। চনমনে ঘ হঠাৎ তিতিবিরক্ত। বললেন, মালেকা বেগম ফোন করেছিলেন। দেশের অবস্থার কথা উঠল। এখন তো দেশের অবস্থার কথা ওঠা মানে তোমার কথা ওঠা। তা উনি কি বললেন জানো?
–নাহ। তা তো জানি না কি বললেন!
–আচ্ছ!, তোমার সাথে কি মালেকা বেগমের কোনও গণ্ডগোল হয়েছে নাকি?
–না তো!
–আমি জিজ্ঞেস করলাম মহিলা পরিষদ থেকে কোনও প্রতিবাদ করা হচ্ছে কি না। বললেন, প্রশ্নই ওঠে না। এ কেমন নারীবাদী গো! ছি ছি ছি।
আমি চুপ হয়ে বসে থাকি। তিনিও কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, তোমার খুব নিন্দা করছিলেন মালেকা বেগম। আমার ভাল লাগেনি, যেভাবে তিনি কথা বলছিলেন।
–কিরকম নিন্দা? জিজ্ঞেস করি।
–বললেন, যা হয়েছে ভাল হয়েছে। শিক্ষা হয়েছে। বিজেপির টাকা নিয়ে লজ্জা লিখেছে বেশ হয়েছে। ধর্ম নিয়ে বাজে কথা বলেছে, শাস্তি হবে না কেন? ফ্রান্সে গিয়েছিল টাকা আনতে, ওর ফাঁসি হওয়াই উচিত।
–মালেকা বেগম এসব কথা বলেছেন? আমি অবিশ্বাস্য চোখে তাকাই ঘ র মুখে।
–হ্যাঁ, বলেছেন। কেন, তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না?
না বোধক মাথা নাড়তে গিয়ে নাড়ি না। কী জানি, হবে হয়ত। আজকাল কত কিছুই তো উদ্ভট ঘটছে। যাদের বন্ধু বলে ভাবি, দেখা যায় তারা আসলে সত্যিকার বন্ধু নয়। ঘ যদিও বলছেন, তিনি মালেকা বেগমের মন্তব্য পছন্দ করেননি। কিন্তু একটি জিনিস টের পাই, ওই মন্তব্য তাঁর সঙ্গে আঠার মত সেঁটে আছে।
এর পর মালেকা বেগম নয়, অন্য কিছু নিয়ে কথা হয়। বিকেলের চা নিয়ে, গরম পড়া নিয়ে, বিছানার চাদর-বালিশ নিয়ে।
একসময় ঘ বলেন, কপালে অনেকগুলো এলোমেলো ভাঁজ, আচ্ছ!, তুমি এত চমৎকার নির্বাচিত কলাম লিখলে! এত সুন্দর কবিতা লেখো তুমি। আমি তোমার সবগুলো কবিতার বই পড়েছি। কিছু কিছু কবিতা মুখস্তও হয়ে গেছে পড়তে পড়তে। মেয়েদের কথা তুমি যেভাবে লিখতে পারো, আর কেউ পারে না সেভাবে লিখতে! তুমি মেয়েদের মনের কথাগুলো প্রকাশ করছিলে, যে কথা মেয়েরা প্রকাশ করতে জানে না। তুমি তো কেবল মেয়েদের মনের কথাই কেবল বলোনি, তাদের তুমি অনেক প্রেরণা দিচ্ছ, সাহস দিচ্ছ। অনেক মেয়েই আমাকে বলেছে, তোমার লেখা পড়ে তাদের জীবন এখন পাল্টে গেছে, তারা এখন নতুন করে নিজেদের চিনতে পারছে, তারা এখন নিজেদের মূল্য দিতে শিখছে। তারা মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাইছে। এ কত বড় কাজ, তুমি বোঝো! যেভাবে লিখছিলে, সুন্দর লিখছিলে। সব কিছু তো ভালই ছিল। কিন্তু, তুমি হঠাৎ কেন লজ্জা লিখতে গেলে?
বড় একটি চমক আমার জন্য। ঘ এবং তাঁর স্বামী মৌলবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত আর এই ঘ কি না বলছেন আমি কেন লজ্জা লিখতে গেলাম!
তোমার মাথা টাথা কি খারাপ হয়েছিল?
এর উত্তর কি দেব আমি তা না বুঝতে পেরে অপরাধীর মত নখ খুঁটি। নখ থেকে চোখ তুললেই দেখি ঘ একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন আমার উত্তরের জন্য।
মৃদু কণ্ঠে বলি, এখানে হিন্দুদের ওপর অন্যায় অত্যাচার হয়েছে। এগুলোর প্রতিবাদ করেছি। করাটা কর্তব্য মনে হয়েছে।
–শোন, তুমি নারীবাদী লেখক, তুমি নারীবাদী লেখা লিখবে। হিন্দু মুসলমান সমস্যা নিয়ে লেখার জন্য তো অনেকেই আছেন। এসব পলিটিক্যাল লেখা। তুমি তো আর পলিটিক্স কর না। তোমার একটা ফিল্ড আছে, সেই ফিল্ডে তুমি নাম করেছিলে। তুমি নারীবাদ নিয়েই ফিক্সড থাকতে পারতে! খামোকা কেন তুমি ডিরেইল্ড হলে? তোমার লজ্জা লেখাটা উচিত হয়নি।
–লজ্জা লিখেছি বলে আমি যে মেয়েদের সম্পর্কে লেখা বন্ধ করে দিয়েছি, তা তো নয়। আমি তো লিখছিই।
–লিখছ কিন্তু লজ্জা লেখার জন্য অনেকে এখন তোমার নারীবাদী লেখাগুলোও আর ভাল ভাবে নিচ্ছে না। মালেকা বেগম বললেন তুমি বিজেপির কাছ থেকে টাকা নিয়ে লিখেছো লজ্জা, এ কথা তো শুধু তো মালেকা বেগমই বলেন না, এ কথা অনেকেই বলে। এই লজ্জা লিখে নিজের অনেক ক্ষতি করেছো তুমি তসলিমা।
এ সময় কানদুটো যদি বধির হয়ে যেতো! যদি সত্যিই বধির হত কান, আমার স্বস্তি হত।
–তুমি কি জানো না ভারতে মুসলমানদের কি করে মারছে? জ্বলন্ত উনুনে ওদের ফোটাচ্ছে, জানো না?
উনুনে ফোটানোর কথা বলতে গিয়ে ঘ র শরীর কাঁপুনি দিয়ে উঠল। জ্যান্ত মানুষগুলো যেন তাঁর চোখের সামনে উনুনে ফুটছে।
–এরকম শুনিনি তো! জ্বলন্ত উনুনে ..
ঘ উত্তেজিত।
–তাহলে তুমি জানো না! একটা বিষয় যদি না জানো, তবে বিষয়টি নিয়ে লিখতে যাও কেন! তোমার তো জানতে হবে ওখানে কী হচ্ছে।
আমি অসহায় বসে থাকি। মাথা নত।
ঘ র গলার স্বর উঁচু থেকে খাদে নেমে আসে। তিনি ধীরে, প্রায় গলা চেপে, প্রায় কানে কানে বলেন, এখানেও হিন্দুদের ওপর অত্যাচার হচ্ছে তা ঠিক। কিন্তু তা বলতে যাবে কেন? ওরা কি মুসলমানদের ওপর ওখানে যে অত্যাচার হচ্ছে সেগুলো বলে? এসব বলতে হয় না। তুমি খুব ভুল করেছো লজ্জা লিখে।
ইচ্ছে হয় প্রতিবাদ করি। বলি যে না, আমি ভুল করিনি। ওখানে কি হচ্ছে, তা আমি দেখিনি, তা আমি জানি না। এখানে যা হচ্ছে, এখানে যা আমি দেখেছি, তা লিখেছি। ঘ আমার নীরবতার কিছু একটা অনুবাদ করে নিয়ে বললেন, এটা একটা সেনসিটিভ ইস্যু। এটা দুদেশের পলিটিক্যাল ব্যাপার। এটা নিয়ে তুমি ডীল করতে পারো না। কারণ তোমার কাছে ইনফরমেশন নেই দুদিকের। তাছাড়া তুমি তো আর পলিটিক্স বুঝবে না। পলিটিক্স করলে পলিটিক্স বুঝতে।
