— আমি মরে গেলে আমার খবর দিয়ে আর কি করবেন আপনারা?
আমি ফোন রেখে দিই। কণ্ঠের কাছে যে কষ্ট জমাট বেঁধে ছিল, সেটি বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসে। বাচ্চা মেয়ের মত কেঁদে উঠি। আমার জন্য আরেকটি বুক ভাঙা কান্না অপেক্ষা করছিল। আমি জানতাম না যে অপেক্ষা করছিল। না, তা আমার জানার কথা নয়। রাজনৈতিক আশ্রয়ের চেয়ে বড় একটি আশ্রয় আমার আছে, তিনি শামসুর রাহমান। সেই আশ্রয়কে, সেই নিরাপত্তাকে, সেই নির্ভয়কে, ঝড়ে ঝঞ্ঝায় আগুনে রোদ্দুরে যিনি ছাতার মত, তাঁকে আমি ফোন করি। তিনিই ফোন ধরেন।
আমি শুধু বলি, রাহমান ভাই, আমি। ওপাশে এক মুহূর্ত নীরবতা। পরের মুহূর্তেই তাঁর ব্যস্ত কণ্ঠস্বর, শোন, কোনও কথা বলা যাবে না। আমার টেলিফোন ট্যাপড হচ্ছে।
ওপাশে ফোন রেখে দেওয়ার খটাশ শব্দ।
শব্দটি বুকে এসে লাগে। বুকে যেন বজ্রপাত হল। যেন বুকের মাংস ছিদ্র হয়ে ঢুকে গেল তীরের মত কিছু। ফোন তো ট্যাপড হবে আমার, আমার মত অপরাধীর। সমাজের নামী দামী মানুষের ফোন কেন ট্যাপড হবে! এ কি একধরনের বাঁচা যে তুমি মরছ মরো, এখন ভাই তোমাকে জন্য আমাদের কিছু করা সম্ভব নয়। তোমার জন্য আমরা মরব কেন! অতএব আমার ফোন ট্যাপড হচ্ছে। তুমি আর যোগাযোগ করো না।
মনে মনে কি আমি ভাবিনি শামসুর রাহমান বলবেন, কোথায় আছ তুমি? খবরটি শোনার পর অস্থির হয়ে আছি। আমি অনেকের সঙ্গে তোমার বিষয়ে কথা বলেছি। আমরা তোমাকে নিরাপদে কোথাও রাখার জন্য চেষ্টা করছি। আমার বাড়িতে এক্ষুনি চলে এসো। অথবা তুমি কোথায় আছো বলো, আমরা তোমাকে গিয়ে নিয়ে আসবো। আমরা লড়ে যাবো এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে। কোনও রকম দুশ্চিন্তা কোরো না।
ভাববো না কেন! শামসুর রাহমান তো ছিলেনই আমার পাশে সবসময়। ব্যক্তিগত, আদর্শগত ঘনিষ্ঠতা আমার সবচেয়ে বেশি ছিল তাঁর সঙ্গেই। তাঁরও তো সেই একই। আমি কি তাঁর খুব কাছের মানুষ ছিলাম না! এই আচমকা বিপদ এলে আমি যদি তাঁর কাছে না যেতে পারি, কার কাছে যাবো!
ক আসেন সকালেই। ককে জানাই যে দূতাবাসে আমার আশ্রয় হবে না। কর মুখটি মুহূর্তে করুণ হয়ে ওঠে।
–তাহলে কি করবেন এখন? কোথায় যাবেন, ঠিক করেছেন কিছু?
–আমার কোথাও যাবার নেই। আত্মসমর্পণ কঞ্চরা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।
ক আমার পাশে বসে মৃদুকণ্ঠে বললেন যে তিনি আমার উকিলের সঙ্গে কথা বলেছেন। উকিল আজই জামিন নেবার জন্য আদালতে যাচ্ছেন।
–তাহলে কি জামিন হবে? আমি উদগ্রীব।
–হলে তো আপনি জানতেই পারবেন। কিন্তু আজ রাতে তো কোথাও থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। এখানে তো গ রাজি হচ্ছেন না। গ কে বলেছিলাম যেন আজকের রাতটা এখানে থাকতে দেন।
ক কিছু খবর দ্রুত দিয়ে গেলেন। মিলন তাঁর কাছে সকালেই এসেছিল। কাল রাতে পুলিশ আমার বাড়িতে কয়েকবার গিয়েছে। বাড়ি তছনছ করেছে। রীতিমত সন্ত্রাস যাকে বলে। সবাইকে জেরা করেছে। জেরার নামে চিৎকার চেঁচামেচি অনেক করেছে। মিলনকে জিজ্ঞেস করেছে কোথায় গিয়েছিল সে আমাকে নিয়ে। হাজতে নিয়েও মিলনকে ঘণ্টাখানিক জেরা করেছে, তারা জানে যে সে আমার সঙ্গে বেরিয়েছিল, কোন বাড়িতে আমাকে সে পৌঁছে দিয়েছে সেটি জানার জন্য তাকে ঘামিয়ে কাঁপিয়ে কাঁদিয়ে ছেড়েছে। মিলন তবু বলেনি। সাহাবুদ্দিনকেও গুঁতিয়েছে, কোন বাড়িতে তিনি আমাকে নিয়ে বিকেলে বেরিয়েছিলেন তা জানতে। সাহাবুদ্দিনের পেট থেকে পুলিশ একটি শব্দও বের করতে পারেনি। ক মিলনকে পরামর্শ দিয়েছেন আপাতত বাড়িতে না গিয়ে কোথাও গা ঢাকা দিয়ে থাকতে।
ক চলে গেলেন আজ রাতের জন্য কোথাও কোনও বাড়ি পাওয়া যায় কি না দেখতে। ক র উদভ্রান্ত মুখ দেখে বড় মায়া হয়। ক আমার এমন কোনও ঘনিষ্ঠ বন্ধু নয় যে এত বড় দায়িত্ব তাঁকে আমি দিতে পারি। আমাকে তাঁর বাড়িতে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েই এখন দেখছেন তাঁর ঘাড়ের ওপর বসে আছি আমি। ক বলেছেন এ সময় কোনও বাড়িতে আশ্রয় পাওয়া আর আকাশের চাঁদ হাতের মুঠোয় পাওয়া এক কথা। কেউ আশ্রয় দিতে চাইবে না। ক ভুল বলেননি। পুরো দেশের সবচেয়ে বড় খবর এটিই এখন। মৌলবাদীরা উল্লাসে ফেটে পড়ছে। দেশ এখন আক্ষরিক অর্থেই তাদের দখলে। মৌলবাদীদের ভয়, পুলিশের ভয়। কার এত বড় বুকের পাটা যে বলে যে হ্যাঁ আশ্রয় দেব! ঝুঁকি নেব। যে আমাকে আশ্রয় দেবে সে-ই অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হবে আইনের চোখে। তার ওপর মৌলবাদীরা পেলে আমাকেই কেবল ছিঁড়ে খাবে না, আশ্রয়দাতা বা দাত্রীকেও কাঁচা খেয়ে ফেলবে।
সারাদিনই গ উৎকণ্ঠায় ছিলেন। ঘরের জানালাগুলো একটিও খোলা হয়নি। দরজাগুলো তালাবন্ধ। বারবারই তিনি ঝিম ধরে বসেছিলেন আর অপেক্ষা করছিলেন রাত হওয়ার। রাত হচ্ছে কিন্তু ক আসছেন না আমাকে নিতে। ক র বাড়িতে ফোন করে ককে আসতে বলবেন সেটিও করছেন না, কারণ কর বাড়ির ফোনে আড়ি পাতা হতে পারে। কঞ্চর বাড়িতে আমি গিয়েছিলাম এই খবরটি জেনে গেলে পুলিশ ককে সন্দেহতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করবে। ক নিজেও বলেছেন তাঁর বাড়িতে যেন ফোন না করা হয়। গ তাঁর স্বামীকে পাঠিয়ে দিলেন ক র বাড়িতে, যেন ক অথবা খ এসে আমাকে এ বাড়ি থেকে নিয়ে যান। আমার বিশ্বাস, ক কোনও বাড়ি খুঁজে পাচ্ছেন না আমাকে রাখার। কিন্তু বাড়ি খুঁজে পাওয়া যাক বা না যাক আমাকে এ বাড়ি থেকে আজ রাতে বিদায় নিতেই হবে। গ র স্বামী খবর দিয়ে চলে এসেছেন। কিন্তু তারপরও ক র দেখা নেই। গ একবার উঠে দরজার কাছে যান, একবার জানালার কাছে, একবার ফোনের কাছে। কোনওটিই তিনি স্পর্শ করছেন না, কিন্তু করতে চাইছেন স্পর্শ।
