বাকি খবরগুলো আমার বিরুদ্ধে মিছিলের, বিবৃতির। ১২৯ জন আলেম বিবৃতি দিয়েছেন, (তখনও তাঁরা জানেন না যে আমার বিরুদ্ধে সরকার মামলা করেছে) ইহুদি নাসারাচক্র তসলিমা নাসরিনদের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে এই দেশ থেকে ইসলাম মুছে ফেলার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। সরকারের কাছে বারবার দাবি জানাবার পরও সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। পরন্তু পুলিশি পাহারা বসিয়ে তাদের নাস্তিকতা প্রচারে সহায়তা করছে। অবিলম্বে মুরতাদদের ফাঁসি না দিলে তৌহিদী জনতার হাতেই তাদের চূড়ান্ত ফয়সালা হবে। ইয়ং মুসলিম সোসাইটি বিশাল ব্যানার নিয়ে আমার ফাঁসি চেয়ে শহরে বিক্ষোভ মিছিল করে। মিছিল শেষে সভায় ডাঃ নুরুল ইসলাম বলেন, তসলিমা নাসরিনের মত নির্লজ্জ মহিলা আমার সত্তর বছর বয়সে একজনও দেখিনি। এই মহিলাকে শাস্তি না দিলে দেশবাসী বিএনপি সরকারকে ক্ষমা করবে না।
তসলিমার শাস্তির দাবিতে গোটা জাতি ফুঁসে উঠেছে, এই হল শিরোনাম। জামাতে ইসলামি, জাতীয় যুব কমাণ্ড, খেলাফত আন্দোলন, সচেতন যুব সমাজ, ওলামা কমিটির বিবৃতি, বিক্ষোভের খবর এর তলায়। এছাড়া আরও খুঁটিনাটি, কাল কটার সময় আমি বাড়ি থেকে বেরিয়েছি। কটা পর্যন্ত বাড়ি ফিরিনি। কি রঙের গাড়িতে করে বেরিয়েছি। গাড়ির নম্বর কি ছিল। উত্তরে গেছি নাকি দক্ষিণে। পুলিশ কবার গেছে আমার বাড়িতে, কটা থেকে কটা পর্যন্ত ছিল। কাকে কাকে জেরা করেছে। কাকে বেঁধেছে, কাকে ছেড়েছে।
গ আজ আমার কারণে আপিস কামাই দিয়েছেন। সকালে এক কাপ চা খাবার তৃষ্ণাটি তাঁকে জানালে তিনি নিজে চা বানিয়ে দেন। কোনও কাজের লোককে আমার আশেপাশে ভিড়তে দিচ্ছেন না। বড় ফটকে তালা লাগিয়ে দিয়েছেন। কাজের লোকদের কেউ যেন বাড়ির বাইরে যেতেও না পারে। সারা শহরে পুলিশ যাকে তন্ন তন্ন করে খুঁজছে, তিনি তাকে লুকিয়ে রেখেছেন তাঁর বাড়িতে। গ স্থির হয়ে কোথাও বসতে পারছেন না। আমার দিকে বিরক্ত-চোখে খানিক পর পর তাকাচ্ছেন। আমি যেন এ বাড়িতে এসে একটি মহা অপরাধ করে ফেলেছি। চা এ চিনি দেওয়া হয়নি, চিনি ছাড়াই চায়ে চুমুক দিই, গর কাছে চিনি চেয়ে তাঁকে আর বিরক্ত করতে ইচ্ছে করে না। ঘড়ির কাঁটার দিকে চোখ আমার, নটা বাজতেই উঠি অ্যাণ্ড্রুকে ফোন করতে। তাঁকে নতুন করে কিছু বলতে হয় না আজ, তিনি পত্রিকায় সব খবরই পড়েছেন।
আমাকে আশ্রয় দিন আপনাদের দূতাবাসে। এ শহর বা শহরের বাইরে আমার এমন কেউ নেই যে আমাকে নিরাপদ কোনও আশ্রয় দিতে পারে। দূতাবাস ছাড়া আর কোথাও নিরাপত্তা নেই। দ্রুত বলি, কণ্ঠ আমার কাঁপে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, আশংকা, নিরাপত্তাহীনতায়।
অ্যান্ড্রু বললেন, দূতাবাস হুলিয়া মাথায় নিয়ে ঘোরা কোনও আসামীকে আশ্রয় দিতে পারে না।
অ্যান্ড্রুর ওপর যে বড় ভরসাটি ছিল আমার, মুহূর্তে মুখ থুবড়ে পড়ে।
–আমি শুনেছি দূতাবাসে আশ্রয় চাওয়া যায়। এ সময় আশ্রয় আমাকে দিতেই হবে। আপনি কেন বুঝতে পারছেন না! আমাকে জেলে পোরা হবে, জেলে তো আমাকে মেরে ফেলবে। আপনারা আমার নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে চেষ্টা করলেন, পাসপোর্ট পাইয়ে দিলেন। এখন আমার জীবন বাঁচাবার জন্য কেন চেষ্টা করবেন না! পাসপোর্টের চেয়ে তো জীবনের মূল্য বেশি! নাকি না!
অ্যাণ্ড্রু নিরুত্তাপ কণ্ঠে বললেন, আপনি আপনার উকিলের সঙ্গে কথা বলুন। আপনার উকিলকে বলুন জামিনের জন্য চেষ্টা করতে।
–জামিন যদি না হয়! এই মামলায় তো জামিন হয় না। আর জামিন যে কদিন না হবে, ততদিন কি হবে? কে আমাকে আশ্রয় দেবে।
—সে ব্যাপারে আমরা কিছু বলতে পারছি না।
—আপনারা তাহলে কোনও সাহায্যই করবেন না?
—শুনুন তসলিমা, আপনাকে পাসপোর্টের জন্য সাহায্য করেছিলাম। তা আপনি পত্রিকায় লিখে দিয়েছেন। ওটা তো জনগণকে জানানোর ব্যাপার ছিল না। একটা ডিপ্লোমেটিক ব্যাপার এরকম পাবলিক করে দিয়ে খুবই অনুচিত কাজ করেছেন আপনি।
অ্যান্ড্রু আমাকে অবাক করেন। তাঁকে বরং আমি প্রশংসা করছি পাসপোর্ট পাইয়ে দিয়েছেন বলে। প্রশংসা করলে কই খুশী হবে তা নয় ব্যাটা রাগ করছে।
—আমি খুবই দুঃখিত। আমি জানতাম না যে জানানো উচিত নয়। এখন আপনার শরনাপন্ন হলাম এই কারণে যে বিদেশি দূতাবাসের অন্য কাউকে আমি চিনিনা, এক আপনাকে ছাড়া। এখন আমি কি করব বলুন। আমি কি আশ্রয় চাইতে পারি না! শুনেছি রাজনৈতিক আশ্রয় নাকি চাওয়া যায় যখন দেশে বিপদ ঘটে!
–তা নিশ্চয়ই যায়। কিন্তু এভাবে কাজ হবে না। এ দেশের আইনের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা দেখাতে হবে তসলিমা। বিশেষ করে হুলিয়া যখন জারি হয়ে গেছে।
রাজনৈতিক আশ্রয় পেতে হলে আপনাকে এ দেশ থেকে বেরোতে হবে। আপনি ভারতে চলে যান। ভারতে গিয়ে আপনি আশ্রয় চান। এ দেশের আইনে আপনি এখন আসামী। কোনও দূতাবাসই এখন আপনার জন্য কোনও কিছুই করতে পারে না। আপনার বিরুদ্ধে হুলিয়া না থাকলে আমরা হয়ত আপনাকে সাহায্য করতে পারতাম।
–ভারতে যাবো? কি করে যাবো? আমার জন্য সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমার তো এ দেশ থেকে এখন বেরোবার উপায় নেই।
–আমি খুবই দুঃখিত তসলিমা। আপনাকে আমরা কোনও সাহায্য করতে পারছি না এখন। আমি আপনার উকিলের সঙ্গে কথা বলব মামলা নিয়ে। আপনার পরিবারের কাউকে, আপনার কোনও এক ভাইকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলবেন। আপনার খবরাখবর নেওয়া যাবে।
