যদি ক কোথাও না পেয়ে থাকেন লুকিয়ে থাকার জায়গা! এক চিলতে, এক ফালি জায়গা।
তাহলে কর বাড়িতে থাকবেন বা কিছু।
কিন্তু..
শুনুন, গ বলেন, আপনি কিন্তু ভাববেন না আপনাকে আমি চলে যেতে বলছি আমার নিরাপত্তার জন্য। এটা আপনার নিরাপত্তার জন্য। এখানে থাকলে আপনাকে পুলিশে ধরার আশংকা খুব বেশি।
এক দমে গ কথাগুলো বলেন। মানবাধিকার বিষয়ের আইনজ্ঞ তিনি, তিনি ফালতু কথা বলেন না।
ক রাতে আসেন। মলিন মুখ। কর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। বারবারই তিনি হাতের পিঠে ঘাম মুছে নিচ্ছেন। ঘাম আবার জমছে। তাঁর ইশারায় আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসি। অন্ধকারে রাখা গাড়িটিতে উঠি। ক আমাকে শুয়ে পড়তে বললেন পেছনের আসনে। একটি চাদর বিছিয়ে দিলেন আমার ওপর। চাদরের ওপর কিছু কাপড় চোপড় ব্যাগ ইত্যাদি ডাঁই করে রাখলেন। বাইরে থেকে কারও যদি চোখ যায় ভেতরে, ভেবে নেবে গাট্টি বোঁচকা নিয়ে নিশ্চয়ই যাচ্ছে এরা ঢাকার বাইরে কোথাও। পথের বিপদ আপদ পেরোতে পেরোতে গাড়ি যাচ্ছে। আজ বিশাল মিছিল হয়েছে মৌলবাদীদের। আনন্দে তারা শহরময় নৃত্য করছে। খুব সাবধানে গাড়ি চলছে, সন্দেহের কিছু মাত্র যেন কারও মনে না জাগে। ভেতরে কতগুলো প্রাণ কি অবস্থায় আছে, তা ভেতরের মানুষগুলোই জানে।
গাড়ি থামলে আমাকে নিয়ে দ্রুত একটি অ্যাপার্টমেণ্টে ঢোকানো হল। এই অ্যাপার্টমেণ্টে আমি এসেছি আগে। ধরা যাক এটি যার বাড়ি, তার নাম ঘ। ঘ ঘরের আলো প্রায় নিবিয়ে অপেক্ষা করছিলেন আমাদের জন্য। ক অনেক চেষ্টা চরিত্র করে এ বাড়িটিই পেয়েছেন যে বাড়িতে আমাকে থাকতে দেওয়ায় কোনও আপত্তি নেই। ঘ আমার লেখালেখি পছন্দ করেন। শান্তিবাগের বাড়িতে তিনি দুবার গিয়েছেন আমার সঙ্গে দেখা করতে। দুবার আমাকে এ বাড়িতে নিমন্ত্রণ করেছিলেন। চমৎকার মহিলা এই ঘ। নিজেও লেখালেখি করেন। ঘ র স্বামীও বেশ নামী লোক। আমাকে ছোট একটি ঘর দেখিয়ে বললেন, ওটিই আমার ঘর। এ বাড়িতে একটিই অসুবিধে সে হল কাজের লোক। আমি যদি সারাদিন ঘরের বাইরে না বেরোই, তবে কাজের লোক আমার মুখ দেখবে না। ক জিজ্ঞেস করলেন, কয়েকদিনের মামলা কিন্তু। জামিন না হওয়া পর্যন্ত এখানেই থাকতে পারবে তো! ঘ বললেন, নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই। ওর এই বিপদের সময় আমাদের তো কিছুটা ঝুঁকি নিয়েই ওকে সাহায্য করতে হবে। ঘ বলে চললেন, এই এলাকাটা খুব নিরাপদ। এলাকায় আজে বাজে লোক নেই বললেই চলে। ছোট ঘরটি বাইরে থেকে বন্ধ থাকে। এটি বন্ধ থাকলে কেউ বুঝবেও না যে ঘরে কেউ আছে। আমার মেয়ে যখন বেড়াতে আসে, তখন এ ঘরটিতে থাকে। ওর ইদানীং এখানে আসার কোনও পরিকল্পনা নেই।
ঘ র স্বামী বললেন, কোনও ভয় নেই। ওর যতদিন ইচ্ছা, ততদিন ও এখানে থাকবে।
ক র মুখে হাসি ফোটে। আমার মুখেও। অপ্রত্যাশিত একটি প্রস্তাব। এর চেয়ে স্বস্তিকর আর কী আছে এ সময়!
ঘ আমাকে একটি লম্বা জামা দিলেন শাড়ি পাল্টে ঘরে পরে থাকার জন্য। কিছু বইও দিয়ে গেলেন পড়তে। কৃতজ্ঞতায় আমার মন ভরে গেল। দশ ফুট বাই দশ ফুটের ঘরটিতে কেবল একটি চৌকি, চৌকিতে শক্ত তোশকের বিছানা। একটি জানালা আছে, সাঁটা। এমন একটি ঘরকেই আমার রাজপ্রাসাদের মত মনে হয়।
৩. অতলে অন্তরীণ – ০৩
ছয় জুন, সোমবার
সকালবেলা ঘ নিজে আমার জন্য ট্রেতে করে নাস্তা নিয়ে আসেন। হাতে বানানো পাতলা রুটি, ডিম, আলুপটলভাজা, চা। কাজের মহিলা দিনে দুবেলা আসে, সকালে নাস্তা আর দুপুরের রান্না করে চলে যায়, আবার সন্ধেয় এসে রাতের জন্য রান্না বান্না করে। মহিলা যখন রান্নাঘরে ব্যস্ত, ঘ এলেন এ ঘরে, চোখে তাঁর করুণা। যখন আমাকে এ বাড়িতে নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল আগে, তখন ওই চোখে দেখেছি আমাকে নিয়ে তাঁর গর্ব। অনেককে তিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন আমার সঙ্গে পরিচিত হতে। আমাকে নিয়ে সেই উচ্ছাস আর নেই, গর্বের জায়গায় দুফোঁটা করুণা চিকচিক করছে। কাজের মহিলার চোখ ফাঁকি দিয়ে বেড়ালের মত দৌড়ে গিয়ে আমাকে টুপ করে ঢুকতে হয়েছে পেচ্ছ!বখানায়। তিনি সতর্ক। কোনও জানালা দরজার ফাঁক দিয়ে কেউ যেন আবার দেখে না ফেলে আমাকে। নাস্তা খেয়ে বন্ধ ঘরটিতে বসে বসে আজকের পত্রিকাগুলো পড়ি। একটি পত্রিকাতেও কোনও বিবৃতি নেই। কেউ প্রতিবাদ করেনি আমার বিরুদ্ধে সরকারের এই মামলার, এই হুলিয়া জারির। আমি কী আশা করেছিলাম? আজকের পত্রিকা ছেয়ে যাবে প্রতিবাদে? বিবৃতিতে? হ্যাঁ আশা করেছিলাম। আমার ফাঁসি চেয়ে গত শুক্রবারে যে মিছিলটি বায়তুল মোকাররম থেকে বেরিয়েছিল, সে মিছিল থেকে কিছু লোক জনকণ্ঠ পত্রিকা আপিসে ঢিল ছুঁড়েছিল। জনকণ্ঠে ইসলামের ন্যায় নীতি আদর্শ মহিমা ইত্যাদি বর্ণনা করার জন্য একটি নিয়মিত বিভাগ থাকে, ইসলামের প্রশংসা করাই এর মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু সেদিন এই বিভাগটিতে কোন একটি সুরার ব্যাখ্যা মৌলবাদীদের পছন্দ হয়নি। পছন্দ হয়নি বলে ঢিল ছোঁড়া। সেদিনই ঢিল ছোঁড়ার প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠলেন বুদ্ধিজীবীরা। কিন্তু মিছিলগুলো যে আমার ফাঁসির জন্য ছিল এবং সেই কথার জন্য, যে কথা আমি বলিনি এবং তা পত্রিকায় প্রকাশিত, তারপরও কেউ সেই বিবৃতিতে বলেননি যে, যে কথা তসলিমা বলেনি সে কথার ভিত্তিতে তার ফাঁসি চাওয়া অন্যায়। আজকের পত্রিকাগুলোর খবর ঃ তসলিমা নাসরিনকে পুলিশ খুঁজছে। পুলিশ তাকে গ্রেফতারের জন্য হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে। গতকাল সারা রাত এবং গতকাল রোববার সারাদিন গোয়েন্দাশাখার কয়েকটি দল ঢাকা মহানগরী এবং পাশ্ববর্তী এলাকায় ব্যাপক তল্লাশি অভিযান চালায়। তার আত্মীয় স্বজনের বাসায় পুলিশ তার খোঁজ করেছে। আত্মীয় স্বজনকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। পুলিশের ধারণা তসলিমা গ্রেফতার এড়ানোর জন্য ঢাকা মহানগরী অথবা দেশের অন্য কোথাও নিরাপদ জায়গায় আত্মগোপন করে আছেন। দেশের বাইরে চলে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে বা সীমান্ত এলাকায় তাকে পেলে গ্রেফতারের আদেশ দেওয়া হয়েছে। তসলিমাকে গ্রেফতারের জন্য পুলিশের কয়েকটি বিশেষ দলকে ময়মনসিংহ সহ ঢাকার বাইরে পাঠানো হয়েছে। এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, আমরা নাজুক অবস্থার মধ্যে আছি। তসলিমা নাসরিনকে গ্রেফতারের দায়িত্বে নিয়োজিত অফিসার-কনস্টেবলদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। সব কটি দল তাকে গ্রেফতার অভিযানে ব্যস্ত রয়েছে।
