জায়গা তো কতই আছে। কিন্তু গোপন কোনও জায়গা তো আমার নেই। কার বাড়িতে আমি যাবো নিজেকে লুকিয়ে রাখতে, ভাবি। খ জিজ্ঞেস করলেন আমার কোনও আত্মীয় আছে কি না ঢাকায়। মামা আর খালা আছেন, বলি। বন্ধু আছে? কোনও বন্ধুর বাড়িতে যাওয়া যায় না? তা নিশ্চয়ই যায়। বন্ধুরা খবর শুনলে তো আমাকে সব রকম সাহায্য করবে। ক বললেন, পুলিশ ওসব জায়গায় আপনাকে খুঁজতে যেতে পারে। এমন কেউ আছে যাদের আপনি চেনেন কিন্তু তাদের বাড়িতে আগে যাননি?
অসহায় বালিকা মাথা নাড়ি। মনে হচ্ছে মাথা পাথর হয়ে আছে, মাথায় কিছু ঢুকছে না, মাথা থেকে কিছু বেরোচ্ছে না।
গ বললেন, এ সময় তো ওকে কোনও অ্যামবেসিতে পলিটিক্যাল অ্যাসাইলাম দিতে পারে। কারও বাড়িতে থাকার চেয়ে অ্যামবেসিতে থাকা নিরাপদ। কোনও অ্যামবেসিতে ঢুকে পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারে না।
আমি তৎক্ষণাৎ বলে উঠি মনে মনে তুড়ি বাজিয়ে, আমার সঙ্গে আমেরিকান অ্যামবেসির ফার্স্ট সেক্রেটারির পরিচয় আছে। তিনিই তো আমার পাসপোর্ট নিয়ে দিলেন।
বাহ! ক,খ, গ নিশ্চিন্তের শ্বাস ফেললেন।
গ বললেন, আপনি আজ রাতেই ফোন করুন অ্যামবেসির লোককে। এরকমও হতে পারে আজ রাতেই আপনাকে ওরা নিয়ে যাবে।
গ আমেরিকার দূতাবাসের ফোন নম্বর যোগাড় করে আমাকে দেন। দূতাবাসে ফোন করলে একজন রক্ষী ফোন ধরেন। অ্যাণ্ড্রুর খোঁজ করলে রক্ষী জানান, অ্যাণ্ড্রু এখন বাড়িতে। রক্ষীকে অনুরোধ করি যেন অ্যাণ্ড্রুর বাড়িতে ফোন করে জানান যে আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চাই, চাই আজ রাতেই। আধঘন্টা পর আবার ফোন করে রক্ষীর কাছ থেকে অ্যাণ্ড্রুর বাড়ির টেলিফোন নম্বর নিই। রাত তখন অনেক, অ্যান্ড্রু শুয়ে পড়েছিলেন। তাঁকে হুলিয়ার খবরটি দিয়ে কোনও রকম রাখ ঢাক না করে আমাকে যেন দূতাবাসে তিনি আশ্রয় দেন, সেই অনুরোধ করি। অ্যান্ড্রু বললেন এই রাতে এখন কিছুই করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়, আমি যেন কাল সকালে তাঁকে আপিসে ফোন করি।
ক, খ এবং আত্মীয় চলে গেলেন, আমাকে বলে গেলেন, আমি যেন ভুলেও ফোন না করি আমার বাড়িতে। কারণ বাড়িতে ফোন নিশ্চয়ই ট্যাপড হচ্ছে, পুলিশ জেনে যাবে আমি কোথায় আছি।
সারারাত একটি অন্ধকার ঘরে শুয়ে থাকি। এক ফোঁটা ঘুম আসে না।
৩. অতলে অন্তরীণ – ০২
পাঁচ জুন, রবিবার
সকালে গ অনেকগুলো পত্রিকা সামনে নিয়ে বসেছিলেন। প্রতিটি পত্রিকায় প্রথম পাতায় আমার ছবি সহ গ্রেফতারি পরোয়ানার খবর। আমি পত্রিকাগুলো দেখতে চাইলে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন যে সকালে তিনি কাজের লোককে দেখেছেন মন দিয়ে পত্রিকা পড়ছে। লোকটি লেখাপড়া জানে, সুতরাং কেবল ছবি দেখেই শেষ করেনি, খবরও পড়েছে। এ বাড়ির অতিথির দিকে কাল রাতে তার চোখ না পড়লেও আজ তো চোখ পড়বে। তাকে, কাজের লোককে হঠাৎ করে তিনি এখন ঘরবন্দি করতে পারেন না। বাইরে পাঠিয়ে দিতেও পারেন না। তাহলে সন্দেহ আরও ঘন হবে।
প্রতিটি পত্রিকায় গ্রেফতারি পরোয়ানার খবর।
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত আনার অভিযোগ এনে তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি
লেখিকা তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। ঢাকার মতিঝিল থানার ওসি মোঃ নুরুল আলমের দায়েরকৃত মামলার প্রেক্ষিতে গতকাল ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম শহীদউদ্দিন আহমেদ এই গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দিয়েছেন। বাদী তার আরজিতে উল্লেখ করেন, তসলিমা নাসরিন বাংলাদেশের নাগরিক হয়েও সাম্প্রতিককালে দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমের সাহায্যে ইসলাম ধর্ম ও ইসলাম বিদ্বেষী বহু কটূক্তিপূর্ণ মন্তব্য করছেন যা বহুলভাবে প্রচারিত হচ্ছে। বিবাদী সজ্ঞানে ইচ্ছাকৃতভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে এইরূপ দুরভিসন্ধিমূলক কাজে লিপ্ত আছেন। বাদী তার আরজিতে বলেন, গত ৯ মে তসলিমা নাসরিন তাঁর দেওয়া কলকাতার ইংরেজি দৈনিক দি স্টেটসম্যান পত্রিকায় সাক্ষাৎকারে বলেছেন, পবিত্র কোরান শরীফ মানব সৃষ্ট গ্রন্থ। তিনি কোরান শরীফের আমূল পরিবর্তন এবং পরিবর্ধন চান। ১১ মে উক্ত পত্রিকায় তাঁর লেখা একটি চিঠি বেরিয়েছে, চিঠিতে তসলিমা নাসরিন পবিত্র কোরান শরীফকে বর্তমান প্রেক্ষাপটে যুগোপযোগী নয় বলে মন্তব্য করেন এবং কোরান অনুযায়ী পরিচালিত না হবার জন্য মতামত প্রকাশ করেন। বাদী আরও উল্লেখ করেন, তসলিমা নাসরিন তাঁর ধর্ম বিরোধী য়েচ্ছ!চারমূলক ও বিকৃত মতামত, উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ ইত্যাদির মাধ্যমে বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে সকলের ধিককারের পাষনী হিসাবে পরিগণিত হয়েছেন ও বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ২৯৫ (ক) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। উল্লেখ্য, তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার জন্য বাদী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের স্মারক নং ৩৩৮/ বিবিধ ৪৮/৯৪ (আইন) তারিখ ৬.৪.৯৪ ইং মোতাবেক মঞ্জুরিপ্রাপ্ত হয়েই গতকাল আদালতে মামলাটি দায়ের করেন। আদালতে অভিযোগকারীর পক্ষে এপিপি বোরহানউদ্দিন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। মামলায় ১১ ব্যক্তিকে সাক্ষী করা হয়েছে, তাঁরা হলেন মেজর জেনারেল (অবঃ) আনিস ওয়াইজ, প্রিন্সিপাল বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ; মুফতি মাওলানা ফজলুল হক আমিনী, প্রিন্সিপাল লালবাগ আলিয়া মাদ্রাসা; এডভোকেট এবিএম নূরুল ইসলাম, ব্যারিস্টার কোরবান আলী, অধ্যাপক আবু আহমেদ চৌধুরী, প্রফেসর এজিএম চৌধুরী, আলহাজ্ব মেজবাউর রহমান চৌধুরী, মাওলানা জুমায়েত আল হাবীব, মাওলানা আবদুল জব্বার, মাওলানা মহীউদ্দিন খান, মাওলানা আবদুল লতিফ। মামলার পরবর্তী তারিখ আগামী ৪ঠা জুলাই। এদিকে তসলিমা নাসরিনকে গ্রেফতার করার জন্য মতিঝিল থানার ২টি স্কোয়াড ছাড়াও গোয়েন্দা পুলিশের একটি বিশেষ স্কোয়াড গতকাল থেকেই তাঁকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। তসলিমা নাসরিন যেন আকাশপথে বা সীমান্তপথে দেশের বাইরে যেতে না পারে সে ব্যাপারে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্যে পুলিশের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলে পুলিশ সূষেন জানা গেছে।
