কর মা খ ঢোকেন আমাদের আলোচনায়। ক তাঁর মাকে আগেই জানিয়েছেন ঘটনা।
খ বললেন, এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে জামিনের জন্য চেষ্টা করা।
আমি বলি, কিন্তু জামিন নাকি হবে না!
খ বলেন, খুব বিদঘুটে ব্যাপার। কিন্তু অন্য কোনও উপায় তো নেই। তোমার উকিল এসব ব্যাপারে জানবেন ভাল। তাঁরা হয়ত কোনও ফাঁক ফোকর পেতে পারেন।
নাকি পুলিশের কাছে ধরা দেব? আমি জিজ্ঞেস করি।
ক বলেন, ধরা দেওয়া ঠিক হবে না। ধর্মীয় অনুভূতির ব্যাপার, পুলিশের মধ্যেই মৌলবাদী থাকতে পারে।
খ ও এই ব্যাপারে এক মত। তিনি বললেন, তোমাকে গ্রেফতার করার জন্য মৌলবাদীরা সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছে। তুমি গ্রেফতার হলে তাদের জয় হবে। সরকারকে চাপ দিয়ে তারা এই মামলা পর্যন্ত করিয়ে নিতে পেরেছে। চাপ দিয়ে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থাও করতে পারে।
ক গম্ভীর গলায় বললেন, সময়টা বড় খারাপ তসলিমা। খুব ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। হুট করে কিছু করা চলবে না। জামিন না হওয়া পর্যন্ত আপনি কোথাও লুকিয়ে থাকুন, কোনও নিরাপদ জায়গায়।
কিন্তু কোথায় লুকোবো?
এ বাড়িতে আপনি লুকিয়ে থাকতে পারতেন, কিন্তু..
খ বললেন, এ বাড়িতে সম্ভব নয়। ওর গাড়ি ওকে নামিয়ে দিয়ে গেছে এ বাড়িতে। ওর গাড়ি তো এমনিতেই পুলিশ ফলো করে। তাছাড়া অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট পেয়ে পুলিশ এখন ওর নিজের বাড়িতে ওকে না পেয়ে যে সব বাড়িতে ওর যাতায়াত ছিল সেসব বাড়িতে ওকে খুঁজতে যাবে, এবাড়িতেও আসতে পারে।
এত কথা আমার মাথায় আসেনি। ক এবং খ দুজনে নিজেদের মধ্যে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিলেন আমাকে এ বাড়ি থেকে যত শীঘ্র সম্ভব চলে যেতে হবে। কিন্তু কোন বাড়িতে আমি লুকোতে যাবো! কারও বাড়িতে গিয়ে লুকিয়ে থাকার ব্যাপারটি আমার কাছে বিচ্ছিজ্ঞর লাগছে। কিন্তু ক এবং খর কাছে লুকিয়ে থাকার বিষয়টি যেন বিষয়ই নয়। বাড়ি নিয়ে ভাবনার দায়িত্ব ক এবং খ নিলেন।
রাত নামার জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। রাত ঘন না হলে রাস্তায় বেরোনো যাবে না। ওদিকে পুলিশ আমাকে খুঁজছে নিশ্চয়ই। এদিকে পুলিশের চোখ ফাঁকি দেওয়ার জন্য রাতের আশ্রয় খোঁজা হচ্ছে। খ কারও সঙ্গে কথা বললেন ফোনে, বললেন যে তিনি যাচ্ছেন তাঁর বাড়িতে, একটি বিস্ময় অপেক্ষা করছে তাঁর জন্য। বিস্ময়টি কি ওপাশ থেকে জানতে চাওয়া হয়। খ কিছুই ভেঙে বলেননি। রাত ঘন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি তাঁর এক আত্মীয়কে ফোন করে ঠিক দশ মিনিটের মধ্যে তাঁর বাড়ির দরজার সামনে আসতে বললেন। খ নিজের গাড়িতে আমাকে নিয়ে কোথাও যাবেন না। কারণ পুলিশ যদি এর মধ্যে জেনে যায় যে আমি খর বাড়িতে এসেছি, তবে খ র গাড়ি কোথায় যাচ্ছে না যাচ্ছে তার খোঁজ নেবে। আত্মীয়ের গাড়িটি এসে থামার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে উঠিয়ে নেওয়া হয়। পেছনের আসনে আমাকে বসিয়ে দু পাশে ক এবং খ বসেন। আত্মীয় সামনে। ক আর খ দুজনই আমার মাথায় শাড়ির আঁচল টেনে দিতে বললেন। আঁচল টেনে অভ্যেস নেই আমার, পারি না টানতে। লজ্জায় হাত যায় না আঁচলে। খ নিজে আঁচল উঠিয়ে দেন। মুখ ঢেকে রাখতে হল আঁচলে যেন রাস্তার আলো আমার মুখে পড়লেও কেউ বাইরে থেকে চিনতে না পারে যে এ আমি, খুনের আসামীর চেয়েও বড় আসামী। ক, খ এবং খ এর আত্মীয় অনেকক্ষণ কেউ কারও সঙ্গে কথা বলছিলেন না। সকলের এক চোখ ভেতরে, আরেক চোখ বাইরে, ভিড়ের রাস্তায় গাড়ির গতি স্লথ হলে চঞ্চল হয়ে ওঠেন তিনজনই। না, এভাবে স্তব্ধ বসে থাকলে চলবে না। চলবে না বুঝেই সম্ভবত খ কথা বলতে শুরু করলেন। এমনি কথা, ঘর সংসারের কথা। বাইরে থেকে পুলিশের যদি চোখে পড়ে গাড়িটি, যেন না ভাবতে পারে যে এই গাড়ির ভেতরের মানুষগুলো ঠিক স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। গাড়ি থামালে সর্বনাশ। পাঁচটা টুপি পরা লোক হনহন করে এগিয়ে আসছে ফুটপাত ধরে, গাড়ি থেমে আছে রিক্সার ভিড়ে, ক আমার মুখটি তার মাথা দিয়ে ঢেকে রাখতে চাইছেন। এরপর খ আমার পিঠে ধাককা দিয়ে শরীর উপুড় করে দিলেন। রিক্সা কাটিয়ে গাড়ি কিছুদূর সামনে এগোনোর পর মাথা তুলি, ভয় কেবল আমার হৃদপিণ্ডে হাতুড়ি পেটাচ্ছে না, ক এবং খকেও নিস্তার দিচ্ছে না, বুঝি। মাথা তোলার পরই দেখি দু গজ দূরেই দাঁড়িয়ে আছে পুলিশের গাড়ি। খ গলা চেপে বললেন, শুয়ে পড়। ওটুকু জায়গা শুয়ে পড়ার জায়গা নয়। চোখ নামিয়ে রাখি, নাক মুখের ওপর আঁচল টেনে দিই, মাথা ঢাকা। ক খ সকলেই নিজ নিজ মাথায় আঁচল বা ওড়না তুলে দেন। খর আত্মীয়ও তাই করেন। গাড়ির চারজনের মধ্যে একজন পর্দানশীন হলে পুলিশের সন্দেহ হতে পারে। সকলে আমরা মুহূর্তের মধ্যে ভদ্র ঘরের পর্দানশীন মহিলা বনে যাই। মৌলানা বরকতউল্লাহর দুই বিবি আর দুই কন্যা কোনও আত্মীয়র বাড়ি যাচ্ছে, পুলিশকে এরকম একটি সাধারণ কিছু ভাবার সুযোগ দেওয়া হয়। পুলিশ পার হলে গাড়ির ভেতরের মানুষগুলোর মাথা থেকে আঁচল খসে না। বলা যায় না, আবার কোন মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে পুলিশের লোক। গাড়ি নিঃশব্দে পথ পেরিয়ে গুলশানের একটি বাড়ির দরজায় থামে। আমরা গাড়ি থেকে নেমে অন্ধকারে মিশে বাড়ির সামনের মাঠে এসে থামি। পর্দার তলায় একটি কালো মিশমিশে ভয় দাঁত মেলে আছে। গালে দুটো শক্ত চড় কষিয়েও এর দাঁত লুকোতে পারি না।
বাড়ি থেকে ঘেউ ঘেউ করে একটি কুকুর বেরিয়ে এল। কুকুরের ঘেউ ঘেউ থামাতে একজন ভদ্রলোক পেছন পেছন দৌড়ে এলেন। ভদ্রলোক কুকুর নিয়ে ভেতরে ঢুকে বারান্দার আলো নিবিয়ে দিলেন। অন্ধকারের পেছন পেছন আমরা। ভদ্রলোকের স্ত্রী, ধরা যাক তিনি গ, আমাদের ভেতর ঘরে নিয়ে ক এবং খ র মুখে ঘটনার অতি সামান্য শুনেই গ ঘরের আলো কমিয়ে দিলেন। দরজা জানালা সব বন্ধ করে আমাদের সামনে চিন্তিত মুখে আইনের একটি বই হাতে নিয়ে বসলেন। আইন নিয়ে ক এবং গর মধ্যে কথা হয়। খুব নিচু স্বরে কথা হয়। কারও মুখ তেমন স্পষ্ট করে আর দেখা যায় না। কথা যা হয়, বেশির ভাগ কথাই আমার পক্ষে বোঝা সম্ভব হয় না। গর সঙ্গে কথা শেষ করে ক আমাকে বললেন যে কাল তিনি আমার উকিলের সঙ্গে জামিনের ব্যাপার নিয়ে কথা বলবেন, জানতে চাইবেন কোনও রকম ফাঁক ফোকর আছে কি না জামিন নেওয়ার। আজ রাতটি গ রাজি হয়েছেন আমাকে তাঁর বাড়িতে রাখতে। এক রাতের বেশি তিনি রাজি নন, কারণ, তাঁর ভয় আশেপাশে দূতাবাস থাকার কারণে প্রচুর পুলিশ দাঁড়িয়ে থাকে রাস্তায়, যে কোনও সময় তারা জেনে যেতে পারে যে আমি এ বাড়িতে আছি। এ বাড়ির চাকর বাকর আমার বদনখানি দেখলেই চিনে ফেলবে আমি কে, বাইরে গিয়ে কারও কাছে যদি বলে দেয় অতিথির পরিচয়, তবেই জানাজানি হয়ে যাবে। ক আরও বললেন, জামিন পেতে যদি দেরি হয়, তবে কোথায় আমি লুকিয়ে থাকব, সে ব্যবস্থা যেন আমি করে নিই। তিনি মিলনকে খবর দেবেন, মিলন আমাকে এ বাড়ি থেকে নিয়ে যাবে কোনও গোপন জায়গায়। গোপন জায়গাটির কথা যেন আমি ভেবে রাখি।
