–আজে বাজে না। ঠিকই কইতাছি।
–পুলিশ আইব কেন? কি করছস তুই?
–জানি না কি করছি। সরকার নাকি মামলা করছে। মতিঝিলের কোন এক পুলিশ অফিসার নাকি কইছে যে আমি তার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিছি।
–তরে কত কইছি আল্লাহ রসুল নিয়া কিছু লেখিস না। আমার কথা ত শুনছ না।
মাও সম্ভবত বিশ্বাস করছেন না যে সত্যি সত্যিই পুলিশ আসছে আমাকে গ্রেফতার করতে। এর আগে বাঘ আসছে বাঘ আসছের মত পুলিশ আসছে তিনি শুনেছেন। শেষ পর্যন্ত দেখা গেছে পুলিশ আসেনি। কিন্তু সত্যি সত্যিই যখন পুলিশ আসছে, তখন বিশ্বাস করতে কেউ চায় না। অসহায় রাখালের মত নিজেকে লাগে। এবারের পুলিশ আসছে রবটি যে কোনও গুজব নয় তা কি করে কাকে বোঝাবো!
নানি এই প্রথম এসেছেন আমার বাড়িতে। বাড়ি কেনার পর মাকে বলেছিলাম যেন একবার নানিকে নিয়ে আসেন ঢাকায়। নানি তাঁর ময়মনসিংহের বাড়ি ছেড়ে কোথাও যেতে চান না। তাকেঁ এ পর্যন্ত নিয়ে আসা ঝুনুখালার দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ফল। নানির সঙ্গে বসে খাবো আমি, মা খাবার দিচ্ছেন টেবিলে। খেয়ে দেয়ে পানের বাটা খুলে নানির হাতের বানানো একটি পান খাবো, পাশাপাশি শুয়ে গল্প করব, কত দিন পর আমাদের দেখা! নানি বারবারই বলছেন, নাসরিন, আমার কাছে আইসা ব একটু, ক কেমন আছস। খবর টবর ক।
মাথায় আমার হুলিয়া, স্থির হয়ে কি করে বসব আমি!
মা ডাকছেন খেতে। ক্ষিধে উবে গেছে অনেকক্ষণ। অস্থিরতা আমাকে ফোনের কাছে টেনে নেয়। একটি ফোন করি চেনা একজন আইনজীবীকে, সেই একজনের নাম ধরা যাক ক। ককে জানালাম বৃত্তান্ত। ক সব শুনে আমাকে বললেন, এক্ষুনি বেরিয়ে যান বাড়ি থেকে।
–কোথায় যাবো আমি? কিছু তো বুঝে পাচ্ছি না..
–কোনও আত্মীয় বা বন্ধুর বাড়িতে চলে যান।
–কিন্তু..
–কিন্তু কি? –পালাবো কেন! বাড়িতে থাকাই তো ভাল।
–উফ আপনি বুঝতে পারছেন না। আপাতত আমার বাড়িতে চলে আসুন। এখানে বসে ঠিক করেন কোথায় যাবেন।
–এখনও তো পুলিশ পাহারা আছে। পুলিশ একদিকে আমাকে যদি নিরাপত্তা দেয়, তবে আবার গ্রেফতার করবে কেন?
–কি মুশকিল! পুলিশ যদি আমাকে গ্রেফতার করতে চায়, তবে তো কোনও বাড়িতে গিয়েও কোনও লাভ হবে না। খুঁজে তো আমাকে পাবেই।
–এসব ভেবে সময় নষ্ট করবেন না তো। বাড়ি থেকে বেরোন তাড়াতাড়ি।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার উপদেশটি আমার পছন্দ হয়নি। কিন্তু এ সময় নিজের বুদ্ধিতে কিছু করার চেয়ে আইন অভিজ্ঞ মানুষের উপদেশই পালন করা উচিত, পছন্দ না হলেও। মিলন গোসল সেরে বেরোতেই মিলনকে বাইরে যাওয়ার জন্য দ্রুত তৈরি হতে বললাম।
–কই যাইবেন?
–তাড়াতাড়ি চল। কথা কওয়ার সময় নাই।
মিলন লুঙ্গি পাল্টে প্যান্ট পরে নিল। আমি যে কাপড়ে ছিলাম, সেটি পরেই।
মার মুখ মুহূর্তে পাল্টে গেল যখন দেখছেন আমি দরজার দিকে এগোচ্ছি।
কই যাইতাছস? কখন ফিরবি? মার কাঁপা কণ্ঠ।
জানি না। বলে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকি নিচে।
পেছনে দরজায় হতভম্ব দাঁড়িয়ে আছেন মা, নানি, ঝুনুখালা, ইয়াসমিন।
দৌড়ে গাড়িতে উঠি। মিলনও। সাহাবুদ্দিনকে দ্রুত পার হতে বলি ইস্টার্ন পয়েন্ট। যেন বাইরে থেকে গাড়ির ভেতরে বসা আমার চেহারাটি কারও দেখার সুযোগ না হয়, যেন আমাকে চিনে ওঠার আগেই আমার গাড়ি দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যায়। যেন কারও সময় এবং সুযোগ না হয় গাড়িটি থামানোর। গেটের কাছে পাহারার দুটো পুলিশ বসে আছে। সাহাবুদ্দিন কখনও গাড়ি দ্রুত চালান না। সাহাবুদ্দিন তো বটেই আমিও পছন্দ করি ধীর গতিতে গাড়ি চালানো। আজ আমার তাড়া দেখে তিনি ঝড়ের বেগে চালালেন। ক তাঁর বাড়িতে বসে ছিলেন আমার অপেক্ষায়। গাড়িটি যদি পুলিশের চোখে পড়ে তাহলে জেনে যাবে যে আমি এখানে। সুতরাং বাড়ির সামনে থেকে গাড়িকে বিদেয় করতে হবে। ব্যাপারটি আমার মাথায় আসেনি, এসেছে কর মাথায়। ক-ই মিলনকে বললেন চলে যেতে। পই পই করে বলে দিলেন,কাউকে যেন সে না জানায় আমি কোথায়, কার বাড়িতে ইত্যাদি কোনও কিছু। ক ইতিমধ্যে তাঁর কজন আইনজীবী বন্ধুকে ফোন করে জেনেছেন এ সম্পর্কে। দণ্ডবিধির ২৯৫ (ক) ধারাটি, দেড়শ বছর আগের পুরোনো আইন, ব্রিটিশের তৈরি, এই প্রথম কারো বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হল। কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে যদি কেউ আঘাত করে, তবে এর শাস্তি দু বছরের কারাদণ্ড আর জরিমানা। কিন্তু সবচেয়ে বাজে ব্যাপারটি হল, এই মামলায় জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়।
তার মানে কি? জামিন হবে না?
ক মাথা নাড়েন। হবে না।
এ কোনও কথা হল? সবারই তো শুনি জামিন হয়।
হ্যাঁ হয়। খুনীর বিরুদ্ধে মামলা হলেও তো জামিন হয়।
খুনীদের হয়! তবে আমার জামিন হবে না কেন?
ক হেসে মাথা নাড়তে নাড়তে বলেন, আপনাকে হয়ত খুনী বদমাশের চেয়েও ভয়ংকর কিছু ভাবছে সরকার।
পুলিশ অফিসার মামলা করেছে, এই মামলা ব্যক্তির না হয়ে সরকারের হবে কেন? কর কাছে জানতে চাই।
ক বলেন, পুলিশ অফিসার যখন মামলা করেন, তবে তা সরকারি মামলাই।
আরেকটি অদ্ভুত নিয়ম, সরকারি অনুমোদন ছাড়া এ মামলা কেউ করতে পারে না। তার মানে আমি যদি এই আইনে শায়খুল হাদীসকে ফাঁসাতে চাই, বলি যে শায়খুল হাদীস আমার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে, হবে না। সরকারের অনুমোদন লাগবে। প্রধানমন্ত্রী অথবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সই চাই। সরকারের অনুমোদন ছাড়া কোনও আদালতই এই মামলা নেবে না।
