কূটনীতি ব্যাপারটি অদ্ভুত। এটি আমি বুঝি কম। কী কথা বলতে হবে, কী কথা বলতে হবে না তা আমার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। কূটনীতিকরা জানেন কতটুকু বলতে হয়, কোথায় থামতে হয়। কি কথার কি উত্তর দিতে হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং নরওয়ে বাংলাদেশকে সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছেন আমাকে দেশত্যাগের অনুমতি দিতে। সরকার এটিকে চাপ হিসেবে বা সুযোগ হিসেবে নিয়েছে কি না তা জানি না। কি ঘটছে সরকারে এবং বিদেশি দূতাবাসে, তা এ বাড়ি ও বাড়ির অন্ধকার কোণে লুকিয়ে থেকে আমার বোঝা সম্ভব নয়। তবে এটা ঠিক বিদেশি সরকারগুলোর কোনও দায় পড়েনি আমাকে বিপদমুক্ত করতে, বিদেশি লেখকগোষ্ঠী আর মানবাধিকার সংস্থাগুলোই কেবল মাথা ঘামাচ্ছে, তারা যে কোনও রাজনীতির ঊর্ধ্বে বলেই ঘামাচ্ছে, তারা ব্যক্তি স্বাধীনতা, লেখকের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকারে বিশ্বাস করে বলেই ঘামাচ্ছে। তারা মাথা না ঘামালে বিদেশি কোনও সরকার আজ আমাকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসতো না, কারণ আমি তাদের কোনও স্বার্থরক্ষার কাজে লাগব না।
ঠকে যখন মনের কথা জানালাম, তিনি বললেন —তোমার খবরটি হোল ওয়ার্ল্ডের মিডিয়াতে গেছে। এখন ইউরোপের দেশগুলো ক্রেডিট নিতে চাইবে তোমাকে বাঁচানোর। সুতরাং বিদেশি সরকারগুলো যে করেই হোক ঝাঁপিয়ে পড়বেই তোমার জন্য কিছু করতে। বলে তো বেড়ানো যাবে যে আমরা মানবাধিকারের পক্ষে এই কাজটি করেছি। এটিই তো বড় একটি স্বার্থ।
—এত কিছু যখন করতেই পারে তাঁরা, কই আমার অনুপস্থিতিতে জামিনের ব্যবস্থা করতে পারে না কেন? হাইকোর্টে গেলে কী নিশ্চয়তা আছে যে আমাকে খুন করা হবে না! কে নিশ্চয়তা দেবে যে ওখানে আততায়ী ওত পেতে থাকবে না! প্রতিদিন নাকি এখন হাইকোর্টে মোল্লারা ভিড় করছে আমি যেতে পারি এই ধারণা করে। ওদের মধ্যে গিয়ে পড়লে দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে।
—হ্যাঁ ঘটতে পারে।
—তখন কোথায় পাবো ইউরোপের নেতাদের?
—তোমাকে বাঁচাতে তো তারা এ দেশে পারবে না। এ দেশ থেকে তোমাকে উদ্ধার করেই তোমাকে বাঁচাতে পারে। সেটি ছাড়া তাদের আর করার তেমন কিছু নেই। এ বাড়িতে যদি এখন তোমাকে আক্রমণ করা হয়, রাস্তায় তোমাকে ধরে ফেলা হয় বা আদালতে কোনও দুর্ঘটনা ঘটে, ইউরোপের বাপের ক্ষমতা নেই তোমাকে কোনওরকম সাহায্য করার।’ এটুকু বলে আচমকা শান্ত হয়ে বসে থাকেন ঠ।
আমি অনেকক্ষণ পর একসময় নরম গলায় বলি, —‘মনে হয় পুলিশের ব্যবস্থা করা হবে।’
—পুলিশই কত আহত হচ্ছে কত জায়গায়, কত মরছে। সন্ত্রাসীরা আবার পুলিশ মানে নাকি!’
—পুলিশরাই বা কেন মনে করবে যে আমি তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিইনি! তাদের কেন রাগ থাকবে না আমার ওপর?’
ঠ মাথা নাড়েন হ্যাঁ বোধক। আমি ভুল বলেছি বলে তিনি মনে করেন না। ঠ খুব তাড়াহুড়ো করে কথা সারেন আমার সঙ্গে, কারণ এ ঘরে আমার সঙ্গে বসে থাকলে তাঁর চলবে না। কারণ তাঁকে বাড়িখানা দেখতে হবে। বাড়ির মানুষগুলোকে সন্দেহমুক্ত রাখার সবরকম চেষ্টা তাঁকে চালিয়ে যেতে হবে। বাড়িটিতে কোনও অনাকাঙ্খিত অতিথির আগমন যেন না ঘটে, বাড়িটির দিকে বাইরের কোনও চোখ যেন না পড়ে। ঘোমটা মাথায় মুখে আঁচল টেনে বসে থাকা এক কূলবধূর মত আমি। আমাকে দেখলে আমারই ভয় হয়, ইচ্ছে হয় আমার কাছ থেকেই আমি দৌড়ে পালাই। মাঝে মাঝে আমার একটি সংশয় জাগে যে, আমি নিজে হলেও হয়ত তসলিমার এই দুঃসময়ে তাকে আশ্রয় দেবার দুঃসাহস করতাম না।
রাতে ঙ এলেন। জামিন পেতে হলে হাইকোর্টে আমাকে উপস্থিত হতেই হবে ব্যাপারটি ঙর মোটেও ভাল লাগেনি। এত বড় ঝুঁকি নিয়ে কোন মানুষটির আদালতে যাওয়া উচিত! যদি জীবনটিই শেষ পর্যন্ত না রক্ষা হয়, তবে জামিন পেয়ে কী লাভ! ঙ দুশ্চিন্তামুক্ত নন। বিরাট খোলা মাঠের ওপর হাইকোর্টটি। যে কোনও মানুষেরই প্রবেশাধিকার আছে ওখানে। হাইকোর্টের মাঠে, ভেতরে করিডোরে হাজার হাজার মানুষ যদি ভিড় করে, তবে উপায় কি হবে, কি করে ঢুকব আমি, কি করে বেঁচে বেরোবো, তা ভেবে ঙরও ঘুম হচ্ছে না। এ ছাড়া, হাইকোর্টে যাওয়া ছাড়া আর তো কোনও উপায়, ঠ বললেন, নেই। কেন পর পর দুদিন আমাকে আদালতে যেতে নিষেধ করলেন ঙ, তা জানতে চাইলে বললেন যে আমার উকিল তাঁকে জানিয়েছেন যে আদালতে ভাল বিচারক বসেননি। বিচারকদের মধ্যেও খারাপ ভাল আছে। কেউ কেউ সোজা বলে দেবেন, না জামিন হবে না। বলে দেবেন, কোনও নিরাপত্তা দেওয়া হবে না। সুতরাং আমার উকিলকে চোখ কান সব সজাগ রেখে বিচারক মৌলবাদী কি অমৌলবাদী তা পরখ করতে হবে। পরখে যদি অমৌলবাদী জোটে, তবেই জামিনের জন্য দাঁড়াতে হবে, নচেৎ নয়।
ঙ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, সুপ্রীম কোর্টেও যে এত বিচারক মৌলবাদের পক্ষে তা আমার আগে জানা ছিল না।
ঙর দীর্ঘশ্বাস বুকে হেঁটে এগোতে থাকে আমাদের দিকে। পা বেয়ে ওপরে ওঠে, উঠতে উঠতে বুকে এসে স্থির হয়। বুকে আমাদের সবারই এক একটি দীর্ঘশ্বাস। ঠ আর তাঁর স্বামী নিজ নিজ দীর্ঘশ্বাসগুলোকে বিদেয় করে দেন নিজ নিজ বুক থেকে। কেবল আমারটিই পড়ে থাকে বুকে। আমারটিই শত সন্তান গ−র্ভ নিয়ে ভারী শরীরে পড়ে থাকে, আমারটিই আমাকে একটু একটু করে দখল করে নেয়, মুঠোর ভেতরে নেয়। শত শত দীর্ঘ শ্বাস আমার শ্বাস রোধ করে রাখে।
ঙ চলে গেলে ঠ, ঠর স্বামী আর আমি তিনজন চুক চুক করে চা পান করতে করতে টুকটুক করে কথা বলতে থাকি। মাঝে মধ্যে দরজায় কারও শব্দ শুনলে বুক ধুকধুক করে।
