—হচ্ছে কি দেশে?
—বাম দলগুলো মাঠে নেমেছে। ঘাতক, রাজাকার উৎখাত আর ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে আন্দোলন জোরদার করার কথা বলছে।
—এতে কি কাজ হবে? সত্যিই কি কোনওদিন এদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ হবে?
—মনে হয় না।
—আমারও মনে হয় না কোনওদিন হবে। বরং মৌলবাদীরা দিন দিন শক্তিশালী হবে। বিএনপি আর আওয়ামী লীগ মৌলবাদীদের আশকারা দিয়ে কত যে ভুল করল, একদিন বুঝবে।
—মনে হয় না কোনওদিন বুঝবে। মৌলবাদীরা এ দেশের সর্বনাশ করলে কার কী! বিএনপি আর আওয়ামী লীগের নেতাদের উদ্দেশ্য হল কিছুদিন যে করেই হোক ক্ষমতা ভোগ করা। ভোগ হয়ে গেলে সাধ মিটে যাবে, এরপর দেশটাকে কুত্তায় খাক কী জামাতিতে খাক, তাদের কিছু যায় আসে না। সমাজ নষ্ট হয়ে যাক, দেশ পচে যাক, তাদের কী!
—ভরসা এখন ছাত্রদের ওপর। ছাত্ররা মাসব্যাপী আন্দোলনে যাচ্ছে। আগস্টের তিরিশ তারিখে প্রধানমন্ত্রীর আপিসে মিছিল নিয়ে যাবে। আগস্টের তিন তারিখে চট্ট গ্রামের ছাত্র হত্যাকাণ্ডে জড়িত খুনীদের গ্রেফতার আর বিচার দাবি আর ছাত্রদের যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তাদের মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ হবে, আগস্টের ছয় তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসন রাজাকারমুক্ত করার দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ আর আগস্টের দশ তারিখ থেকে সাতাশ তারিখ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে বড় বড় শহরগুলোয় ছাত্র জনসভা হবে।
—ছাত্রদের মধ্যে এখনও হয়ত সততা বলে ব্যাপারটি টিকে আছে। কিন্তু তারাও কি বেশিদিন এই সততা টিকিয়ে রাখতে পারে!
—এখন ধরেছে বায়তুল মোকাররমের খতিবকে। বলা হচ্ছে, রাজনৈতিক সভায় মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলেছে ওবায়দুল হক। তার অপসারণ দাবি করা হচ্ছে। বলছে, বায়তুল মোকাররম কোনও দলীয় প্রতিষ্ঠান নয়। এটি জাতীয় মসজিদ, এবাদতের জায়গা। জামাত শিবির দেশের মসজিদগুলোকে নিজেদের গোপন মিটিং আর রাজনৈতিক কাজকারবার চালানোর জন্য ব্যবহার করছে। সরকার গোলাম আযমকে মাঠে নামিয়ে দিয়েছে যেন সরকার বিরোধী আন্দোলন না হয়। মৌলবাদীরা জাতীয় সংসদ সম্পর্কে অবমাননাকর কথা বলেছে। এদের গ্রেফতার করে বিচার করার দাবি জানাচ্ছে ছাত্ররা।
—দাবি তো কতই জানানো হয়। কোন দাবি মানা হবে, কোন দাবি মানা হবে না, তা তো আমরা অনুমানই করতে পারি। এই প্রো-ফান্ডামেন্ডালিস্ট গভরমেন্ট ছাত্রদের মিছিল মিটিংগুলোয় পুলিশ ছেড়ে দিয়ে পণ্ড করে দেবে।
—তা হয়ত দেবে। কিন্তু প্রতিবাদ যে কিছু হচ্ছে এই তো বেশি।
—এই তো বেশি কেন! প্রতিবাদ তো আরও হওয়া উচিত।
—নাহ! কেউ কি আর মাঠে নামতে চাইছে। তসলিমার কারণে এসব হচ্ছে,সুতরাং আমাদের আর দায় কি! এসব তসলিমাই সামলাক। এরকমই তো মনোভাব ছিল সবার। এখন তো সকলে একটা জিনিসই জপছে, মৌলবাদীদের শক্তিটা বেড়েছে তসলিমার কারণে।
—মৌলবাদীরা যে তলে তলে কতটা শক্তিমান হয়েছে, তসলিমার কারণে তা বরং দেখার সুযোগ হল। তা না হলে তো চোখের আড়ালেই থাকত সব। দেশটা মৌলবাদীদের মুঠোর মধ্যে একেবারে চলে গেলেই টনক নড়ত। আগে ভাগেই টনক নড়া তো ভাল, যখন প্রতিরোধের সামান্যও সময় আছে বা সুযোগ আছে।
দেশ নিয়ে বড় দুশ্চিন্তা হয়। কী হবে দেশের। কী রকম যেন সব পাল্টে গেল। আমরা তিন জনই জানি এবং মানি যে হঠাৎ সবকিছু বড় পাল্টে গেছে। আমরা তিনজনই, মুখে যত আশার কথাই বলি না কেন, মনে মনে ঠিকই জানি যে দীর্ঘশ্বাসের মত দুরাশাও বুকে হেঁটে সরীসৃপের মত আসছে আমাদের দিকে।
অনেকক্ষণ আমরা গভীর রাতের স্তব্ধতাকে সঙ্গী করে স্তব্ধ বসে থাকি। আমাদের মুখের কথা ফুরিয়ে যায় তবু বসে থাকি। আমাদের মনে অনেক কথা থাকে বলেই বসে থাকি।
ঠ আর ঠর স্বামী ঘুমোতে চলে যাবার পরও দেশ নিয়ে আমার দুশ্চিন্তাটি যায় না। দুশ্চিন্তাটি আমাকে কুটকুট করে কামড়াতে থাকে। সারারাত আমাকে দুশ্চিন্তাটি কামড়ায়। সারারাত আমি এক ফোঁটা ঘুমোতে পারি না। না ঘুমোতে ঘুমোতে অনেক আগেই অভ্যেস হয়ে গেছে না ঘুমোনোর।
৩. অতলে অন্তরীণ – ৫৯
এক আগস্ট, সোমবার
আজও তৈরি হয়ে থাকি। ঙ জানান যে আমার অনুপস্থিতে আদালত বসে যাবে এবং এটি হঠাৎ করেই বসবে, কাকপক্ষী যেন জানতে না পারে। আমার উকিল আমার পক্ষে যা বলার সব বলতে থাকবেন, কাগজ পত্র যা দেখাবার, দেখাতে থাকবেন, এর মধ্যে সময় সুযোগ পেলে বিচারককে তিনি বলবেন যে আমার নিরাপত্তার অভাব আছে বলে আমি আদালত পর্যন্ত যেতে পারছি না, তখন যদি বিচারক গোঁ ধরেন যে আমাকে যে করেই হোক উপস্থিত হতেই হবে, না হলে জামিন হবে না তো হবেই না, তখন আমার উকিল তাঁর কোনও সহকারীকে ইঙ্গিত করবেন আদালতে আমাকে উপস্থিত করার জন্য, সেই সহকারী তখন আরেকজনকে ইঙ্গিত করবেন, সেই আরেকজন উঠে গিয়ে ফোন করে দেবেন ঙকে, ঙ জানিয়ে দেবেন ককে, ক জানাবেন ছোটদাকে, তাঁর কাছে দিয়ে দেওয়া হবে কোত্থেকে আমাকে তুলে কোথায় নিতে হবের বৃত্তান্ত, ছোটদা সঙ্গে সঙ্গে গাড়িতে স্টার্ট দেবেন। এটি অথবা যদি আমার উকিল জানেনই যে বিচারক আমার উপস্থিতি চাইবেনই, তবে যখন তিনি আদালত কক্ষে আমার জামিনের আবেদন নিয়ে দাঁড়াবেন,ঠিক সেই মুহূর্তটি থেকে হিসেব করে ঠিক পনেরো মিনিট পর আমাকে আচমকা উপস্থিত হতে হবে, পলকের মধ্যে আমার চেহারাটি বিচারককে দেখিয়ে যেন দ্রুত বেরিয়ে যেতে পারি। নিমেষে যেন হাওয়া হয়ে যেতে পারি। এসব ছক তৈরি করার কারণ, খুব কম সময়ের জন্য আমাকে যেন আদালতে কাটাতে হয়। খুব জটিল লাগে ব্যাপারটি। আমার আশংকা হয় কোথাও না আবার ভুল হয়ে যায়।
