মহাসমাবেশে এই দাবিগুলো মেনে নেবার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানানো হয়। অন্যথায় উদ্ভূত যে কোনও পরিস্থিতির জন্য সরকারই দায়ি থাকবে বলে বলা হয়। কামার, কুমোর, জেলে, তাঁতি, কৃষক, শ্রমিক, মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্র, শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী, বুদ্ধিজীবী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, রাজনীতিক, আলেম ওলামা, পীর মাশায়েখ, ও মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টানসহ সকল স্তরের দেশপ্রেমিক ও ধর্মপ্রিয় জনগণকে সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদের পতাকাতলে শামিল হয়ে জাতীয় স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, ইনসাফ ও মানবতার মুক্তি সংগ্রামে শরিক হওয়ার আহবান জানানো হয়।
অনেক দাবিই টুপিদাড়িহীন রাজনৈতিক নেতাদের তৈরি করা, তা বোঝা যায়। কিছু দাবি আমার মন্দ লাগে না। সংখ্যালঘুদের অধিকারের দাবি, কৃষকদের সুদ মওকুফের দাবি, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের শর্তহীন ঋণ বা সাহায্যের দাবি। সম্পদের সুষম বণ্টনের দাবি। যে দাবিই হোক না কেন মানুষ এসেছে কোরান বাঁচাতে, তসলিমাকে ফাঁসি দিতে। লক্ষ লক্ষ মানুষের স্লোগান ছিল,
নারায়ে তকবির, আল্লাহ আকবার,
কুখ্যাত তসলিমার ফাঁসি চাই দিতে হবে,
ইসলামের শত্রুরা হুঁশিয়ার সাবধান,
নাস্তিকদের আস্তানা এই বাংলায় রাখবো না,
মুরতাদদে আস্তানা এই বাংলায় থাকবে না,
আমরা সবাই রসুল সেনা ভয় করি না বুলেট বোমা,
জিহাদ জিহাদ জিহাদ চাই জিহাদ করে বাঁচতে চাই।
ইনকিলাব বর্ণনা করেছে, এসব স্লোগান আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে। লাখো জনতার কণ্ঠে উচ্চারিত তাকবীর ধ্বনি যেন সপ্ত আসমান ভেদ করে আরশে আজীমে গিয়ে নাড়া দিচ্ছিল। অনুষ্ঠান শুরু হয় কোরান তেলওয়াত দিয়ে। এরপর ইসলামি সঙ্গীত, সঙ্গীতের কথাগুলো এরকম, আল্লাহর জমিনে এই বাংলার জমিনে মুরতাদ বেদ্বীনের স্থান নেই। এদেশ ইসলাম মুসলিম জনতার, এখানে ঠাঁই নেই মুরতাদ খোদাদ্রোহীতার.. . .
সমাবেশ ঘিরে চারদিকে বসেছিল ক্ষুদে হকাররা। বুট বাদাম কলা রুটি শশা এমনকি ভ্যানে করে ভ্রাম্যমান বিরানি ও তেহারির দোকানও বসেছিল। সমবেত জনতার জন্য মহাসমাবেশের উদ্যোক্তারা খাবার পানির ব্যবস্থা করেছিলেন। দুশতাধিক কাঁচা পায়খানার ব্যবস্থাও করেছিলেন। মহাসমাবেশটি এক কথায় সার্থক। তবে ৫টি বোমা ফাটার ঘটনা ঘটে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ১০ জন আহত হয়। যখন মহাসমাবেশ শেষে লোকেরা ট্রাক বাসে করে ঢাকার বাইরে যেতে থাকে, মৌলবাদ বিরোধী দল যেখানেই তাদের পেয়েছে, পেটাতে চেষ্টা করেছে, এই করে আহতের সংখ্যা সত্তর জন। একটি জিনিস একটু খটকা লাগে, জামাতে ইসলামী আলাদা ভাবে জনসমাবেশ করেছে গতকাল। জামাতে ইসলামীর নেতারা মানিক মিয়া এভিনিউএ ছিল না, গোলাম আযম চট্টগ্রাম তো চট্টগ্রাম, খোদ ঢাকা শহরের মাঝখানে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে জনসমাবেশে বক্তৃতা করেন। শেখ হাসিনা ওদিকে নোয়াখালির বেগমগঞ্জে গিয়ে বক্তৃতা করছেন মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে নয়, সরকারের বিরুদ্ধে। ধর্মের গুণগান গেয়েছেন, এক পর্যায়ে গর্ব করে বললেন, আমরা ধর্মহীনতায় বিশ্বাস করি না। কারণ বঙ্গবন্ধুই প্রথম মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও ইসলামিক ফাউণ্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। আমাদের একজন সংসদ সদস্য মদ জুয়া বন্ধের বিল উত্থাপন করলেও বিএনপি সরকার তা পাস করেনি।
ইত্তেফাকের খবরটি লিখেছে এভাবে, মানিক মিয়া এভিনিউর মহাসমাবেশের আহবান, জীবনের সকল ক্ষেষেন ইসলামী অনুশাসন প্রতিষ্ঠা করুন। বঙ্গবন্ধু এভিনিউএ নগর আওয়ামী লীগের সমাবেশে কাল ১২ টি বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। আহত হয়েছে ওখানেও বেশ কজন। জনকণ্ঠের খবর, জিপিও এলাকা রণক্ষেষেন পরিণত, পুলিশের লাঠিচার্জে ৪০ জন ছাত্র আহত, ককটেলের আঘাতে পুলিশ জখম, অবস্থা গুরুতর। সংবাদের খবর, সংঘর্ষ ও বোমায় ছাত্র পুলিশ অধ্যাপকসহ অর্ধ শতাধিক আহত। এদিকে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী ছাত্র সমাজ আজ সারা দেশে পূর্ণ দিবস হরতালের ডাক দিয়েছে। আওয়ামী লীগ ডাক দিয়েছে অর্ধ দিবসের হরতাল। চট্টগ্রামে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে এই হরতাল।
ঠ দুপুরে ভাত নিয়ে এসেছেন ঘরে, রাতেও খাবার নিয়ে এসেছেন। আমার শুধু শুয়ে বসে থাকা ছাড়া বই পড়া, পত্রিকা পড়া, আর ঠ এলে কথা বলা ছাড়া আর কোনও কিছু করার নেই। কথা যা হয়, মূলত রাজনীতি নিয়েই হয়। অনেক রাতে ঠর স্বামী এলেন কথা বলতে। পুরো বাড়ির মধ্যে কেবল ঠ আর ঠর স্বামীই জানেন যে আমি এই ছোট ঘরটিতে থাকছি। ঠর স্বামীটি একসময় বামপন্থী শ্রমিক নেতা ছিলেন, বললেন তাঁকেও এরকম দীর্ঘদিন গা ঢাকা দিতে হয়েছিল। তিনি জানেন এরকম বেঁচে থাকা ঠিক কি রকম বেঁচে থাকা। তিনি জানেন কী ভয়াবহ তখনকার প্রতিটি মুহূর্ত, যখন রাতের অন্ধকারে প্রাণ বাঁচানোর জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়।
ঠ এবং ঠর স্বামী দুজনই দেশের বর্তমান রাজনীতি নিয়ে তিতিবিরক্ত। কিন্তু তারপরও দুজনের একজনও মনে করেন না যে দেশে মৌলবাদী আন্দোলন খুব বেশিদূর এগোবে। আগামী নির্বাচনে এই সরকার ভোটে জিতবে বলেও তাঁরা মনে করেন না।
৩. অতলে অন্তরীণ – ৫৮
একত্রিশ জুলাই, রবিবার
আজও সকালে তৈরি হয়ে থাকি। দুপুরের পর ঙ জানিয়ে দেন যে আজ হচ্ছে না। গতকালের পত্রিকায় একটি খবরের শিরোনাম ছিল তসলিমা নাসরিন প্রসঙ্গে নরওয়ে, জার্মানি এবং ইউরোপীয় কমিশনের বক্তব্য। খবরটি এরকম, জার্মান দূতাবাসের কাউন্সিলার বলেছেন, ১৬ জাতির ইউরোপীয় কমিশনের পক্ষ থেকে তসলিমা নাসরিনকে দেশত্যাগের অনুমতি প্রদানের জন্য সরকারের কাছে ফরমাল অনুরোধ জানানো হয়েছে কিন্তু এখনও কোনও জবাব তাঁরা পান নি। এদিকে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, এরকম খবর তাঁরা পত্রিকায় পড়েছেন, কিন্তু সরকারিভাবে কিছু জানেন না। ইউরোপীয় কমিশনের চেয়ারম্যান একজন জার্মান। জার্মান দূতাবাসে জানতে চাওয়া হয়, তসলিমাকে দেশত্যাগের অনুমতিদানের জন্য চাপ সৃষ্টি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হন্তক্ষেপের সামিল বলে তিনি মনে করেন কি না। দূতাবাস থেকে বলা হয়, চাপ সৃষ্টির কোনও প্রশ্নই আসে না। ইউরোপীয় কমিশনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা কেবল নিজেদের মতামত ব্যক্ত করেছেন এবং তা বাংলাদেশ সরকারকে জানানো হয়েছে, তা সরকারের ওপর কোনও চাপ সৃষ্টি নয় এবং তা গ্রহণ করা বা না করা সম্পূর্ণ সরকারের একান্ত নিজস্ব ব্যাপার। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এমন অনুরোধ করে বাংলাদেশের আইনকে নিষিক্রয় করতে সহায়তা করছে কি না এবং তা সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলছে কি না জানতে চাওয়া হলে দূতাবাসের মুখপাত্র বলেন, ইউরোপীয় কমিশনের মতামত বা অনুরোধ সরকারকে জানানো ছাড়া বিষয়টির ওপর কোনও মতামত দেওয়া তাঁর দায়িত্ব নয়। ইউরোপীয় কমিশন কেন একজন মহিলার পক্ষে এমন অবস্থান নিচ্ছে যে মহিলা দেশের আপামর জনসাধারণের ধর্ম বিশ্বাসকে আঘাত করেছে এই প্রশ্নের জবাবে বলা হয়, সমগ্র বিষয়টি ব্যাখ্যার দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করছে এবং ইস্যুটিকে কেন্দ্র করে কি ঘটছে তার ওপর নজর রেখেই দেখতে হবে। ইউরোপীয় কমিশন মানুষের বাক স্বাধীনতাকে মূল্য দেয় এবং এই বিষয়টিকে এই দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখতে হবে। ঢাকার নরওয়ের মিশন প্রধানকে বিষয়টির ওপর মন্তব্য করতে বলা হলে তিনি বলেন, বাক স্বাধীনতার নিশ্চয়তা বিধানের লক্ষ্য থেকেই নরওয়ে সরকার বিষয়টি দেখছেন। মিশন প্রধান সরেজমিনে সব দেখছেন এবং নরওয়ে সরকারের কাছে নিয়মিত প্রতিবেদন পাঠাচ্ছেন। নরওয়ের পত্রিকায় বাংলাদেশের নারীদের ওপর নির্যাতন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ওপর প্রতিদিন খবর ছাপা হচ্ছে, জনগণের বিশাল একটি অংশ তসলিমা নাসরিনের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য নরওয়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। নরওয়ের সরকারকে নরওয়েবাসীদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়েই কাজ করতে হয়। বাক স্বাধীনতার নামে উগ্র মতামত বলা ও ছাপানো একটি সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ধর্মবিশ্বাস ও অনুভূতিকে পদদলিত করা কতটুকু সমর্থনযোগ্য, এই প্রশ্নের জবাব তিনি এড়িয়ে যান। বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তাই বলে বাংলাদেশের মানুষকে কেন মৌলবাদী বলা হচ্ছে, জিজ্ঞেস করা হলে মিশন প্রধান বলেন যে কিছুসংখ্যক উগ্রপন্থী ছাড়া বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ শান্তিপ্রিয় ও সহনশীল। এরপর বেশ কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্নের জবাব নরওয়ের মিশন প্রধান দেননি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মিশন প্রধান বলেছেন, তসলিমা নাসরিনকে নরওয়ের একটি সেমিনারে যোগ দেয়ার নিমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছে, তবে তিনি যেতে পারবেন কি না তা একমাত্র বাংলাদেশ সরকারই বলতে পারবে। বাংলাদেশে মৌলবাদের উত্থান হচ্ছে কি না জানতে চাওয়া হলে মিশন প্রধান বলেন, তিনি কেবল পত্র পত্রিকায় যা প্রকাশ হচ্ছে সে সম্পর্কেই জানেন, বেশি জানেন না। ব্লাসফেমি আইন সম্পর্কে বলেন, বর্তমান বিশ্বে এটি অচল এবং এটি মানবাধিকারের পরিপন্থী।
