—মনে হয় না।
—তবে কি?
—এত আমাকে জিজ্ঞেস কোরো না। এত আমি জানি না। তবে জানি এটাই হল কনডিশান।
—কিসের কনডিশান?
—জামিনের।
—জামিন দেবে তারা এই শর্তে যে আমাকে চলে যেতে হবে দেশ ছেড়ে?
ঝ সন্তর্পনে কান পেতে মন পেতে শুনছিলেন ফিসফিসিয়ে বলা কথাগুলো, এখন সিগারেটে জোরে টান দিয়ে জোরে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন—তার মানে অ্যামবেসিগুলো সরকারকে রাজি করিয়েছে বেইল দিতে, সরকার রাজি হয়েছে একটি শর্তে যে ওকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে। এই তো!
ঙ মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললেন। অন্য কেউ নেই ঘরে, তারপরও এদিক ওদিক দেখে নিয়ে গলা চেপে বললেন—নরওয়ে তো বলেছে সাহায্য বন্ধ করে দেবে বাংলাদেশকে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অনেক দেশই সাহায্য বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে।
—আপনার সঙ্গে কি করে দেখা হল অ্যামবেসির লোকদের?
—আমি দেখা করেছি। তারপর ওঁরাই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন নিয়মিত। ঙ বললেন।
—কতদিন দেশের বাইরে থাকব?
—যতদিন না দেশের অবস্থা একটু ভাল হয়।
সুখের সঙ্গে একটি দুঃখ এসে মেশে। আমাকে করুণ সুরে বাজাতে থাকে।
ঙ চলে গেলে ঝকে জিজ্ঞেস করি, কবে দেশের অবস্থা ভাল হবে বল তো!
—তিন চার মাসেই মোল্লারা সোজা হয়ে যাবে।
—ঠিক বলছ?
—ঠিক বলছি। তুমি দেখে নিও।
ঝ আমাকে নতুন ক্যানভাস এনে দিয়ে বলেন— দেশের অবস্থা নিয়ে আপাতত চিন্তা বাদ দাও। ছবি আঁকো।
—ধুত তোমার এত ক্যানভাস, এত রং নষ্ট করার কোনও মানে হয় না। আমি তো ছবি আঁকতে জানি না।
—তুমি আঁকতে না জানলে তোমাকে কি আমি দিতাম এগুলো? আগেই তো তোমাকে বলেছি, তুমি আঁকা চালিয়ে গেলে শিল্পী হিসেবে বেশি নাম করবে। লেখক বা কবি হিসেবে যত নাম করেছো, তার চেয়ে অনেক বেশি।
—আর লজ্জা দিও না তো! এমনি শখের ছবি আঁকা। জীবনে তো শিখিনি কখনও।
—যার প্রতিভা থাকে তার শিখতে হয় না।
ঝর প্রেরণায় তুলি হাতে নিই। সাদা ক্যানভাসে থোক থোক রঙ বসিয়ে দিতে থাকি। একটি মেয়ে, নদীর পাড়ে মেয়েটি পড়ে আছে, গলা কাটা। শাড়ি আলুথালু, ব্লাউজ ছেঁড়া। সূর্য ডুবছে। আরেকটি ক্যানভাসে একটি মেয়ে ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছে। জিভ বেরিয়ে এসেছে। পায়ের তল থেকে চেয়ার সরে গেছে। রং করি আর পেছনে গিয়ে দেখি ছবি, সামনে এসে দেখি। ডানে মাথা ঘুরিয়ে দেখি, বামে ঘুরিয়ে দেখি। হঠাৎ লক্ষ্য করি, ঝ তাঁর ভিডিওতে তুলে রাখছেন ছবিতে মগ্ন হয়ে থাকা আমাকে।
ঝ তন্ময় হয়ে আমার আঁকা দেখেন। আমি ঘোরের মধ্যে আঁকতে থাকি। একটি ছবি শেষ করে আরেকটি শুরু করি। হাতে রঙ, কাপড় চোপড়ে রঙ, গালে গলায় রঙ। রাত দুটো কি আড়াইটার সময় বাড়ির সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়েছে, ঝর একটি শখ হয়, শখটি হল আমাকে তাঁর বাড়িটি দেখাবেন। প্রস্তাবটি আমার বেশ লাগে। ঝর পেছন পেছন আমি বেরোই। নিচতলা, দোতলা আর তিনতলার প্রতিটি ঘর বারান্দায় ঘুমন্ত মানুষগুলো যেন কোনও শব্দে জেগে না ওঠে, এমন করে বেড়ালের মত নিঃশব্দে হাঁটি আমরা। তিনতলায় একটি বড় স্টুডিও আছে ঝর। ঝর আঁকা সব ছবি, ভাস্কর্য স্তূপ করে রাখা। স্টুডিওটি খুব বড়, বাইরের আলো আসার জন্য দেয়ালে না হয়ে ছাদে বসানো হয়েছে কাচের জানালা। বাড়িটি সাধারণ কোনও সাদামাটা বাড়ির মত নয়, পুরো বাড়িটিই আধুনিক স্থাপত্যশিল্প। নিজেই ঝ এই বাড়ির স্থপতি। ঝ র বয়স খুব বেশি নয়, এই বয়সেই তিনি যশ খ্যাতি সব অর্জন করেছেন। তাঁর জন্য আমার গর্ব হয়। গর্ব হয় একটি মেয়ে হয়ে এই বাংলাদেশের মত দেশে নিজের চেষ্টায় এই অবদি পৌঁছতে পেরেছেন বলে। প্রচণ্ড পরিশ্রম করেছেন। তাঁর যা হয়েছে তাঁর নিজের কারণেই হয়েছে। কেউ তাঁকে দয়া করে তাঁর খ্যাতিটি তাঁর হাতে ধরিয়ে দেয়নি। কেউ তাঁকে এত উঁচুতে কোনও মই এনে তুলে দেয়নি। স্বাধীন এবং সচ্ছল একটি জীবন পেতে তিনি সংগ্রাম করেছেন। ঝর মত মান সম্মান যশ খ্যাতি কিছুই আমার নেই। তাঁর মত দৃঢ়চিত্ত-চরিত্র আমার নেই। ধন থাকলে বেশির ভাগ মানুষের মন থাকে না। কিন্তু ঝ সেই বেশির ভাগ ধনীর মত নন। ঝ অকাতরে বিলিয়ে দিয়ে পারেন। সৎ কিন্তু ক্ষ্যাপা, দরিদ্র কিন্তু আদর্শবাদী ছেলে মেয়ে নিয়ে একটি দল গড়ে তুলেছেন তিনি। দরিদ্রদের পক্ষে থাকলে নিজে দরিদ্রের জীবন যাপন করতে হবে তা তিনি মানেন না। তিনি মনে করেন, সবার জন্যই ধন প্রয়োজন, এবং সেই সংগ্রাম তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন। নিজের নিরাপত্তার জন্য তাঁর যা প্রয়োজন, সব তিনি নিশ্চিত করেছেন। আজ তিনি যদি এই অবস্থায় না থাকতেন, তবে তিনি কিছুই করতে পারতেন না যা করছেন। সমাজ বদলের চিন্তা ধারে কাছে ভিড়ত না যদি না সামান্য অন্ন যোগাতেই দিন পার হত।
বাকি রাতটুকু পাশাপাশি শুয়ে আমরা কথা বলি। বিদেশ যাবার এই প্রস্তাবটি ঠিক কিরকম আমি তখনও বুঝতে পারছি না। ঝ বললেন যে তাঁর মনে হয় এটিই একমাত্র আমার মুক্তির পথ এবং আমার খুশি হওয়া উচিত যে একটি সহজ মুক্তির পথ আমার জন্য ঘটেছে। আজ যদি এটি না ঘটত, তবে তো মৃত্যু ছিল অবধারিত। বাকি একটি পথ ছিল সেটি অবৈধভাবে পালিয়ে যাওয়া দেশ ছেড়ে। ওভাবে পালালে আমাকে আর কখনও দেশে ফিরতে দেওয়া হবে না, আমার সহায় সম্পত্তি যা আছে সব সরকার নিয়ে নেবে। এখন জামিন নিয়ে বৈধভাবে দেশ ছাড়া হবে, এটির চেয়ে ভাল আর কিছু হতে পারে না। জানি এর চেয়ে আমার জন্য আর কোনও ভাল সমাধান নেই। তারপরও মন যেন কেমন করে।
৩. অতলে অন্তরীণ – ৫৫
আঠাশ জুলাই, বৃহস্পতিবার
