নাহ, সংবাদও অনেক খবর রাখেনি। অন্য পত্রিকায় ছাপা হয়েছে, নিহত ৬, আহত ৪ শতাধিক। নিহতদের মধ্যে মণি ছাড়াও আরও দুজন ছাত্র খায়ের(২০),আর শাহিন (১৭) আছে। আজকের কাগজের বর্ণনাটি এরপর এরকম, বিকেল ৫টা ১৫ মিনিটে ৭১ এর নরঘাতক, নারীধর্ষণ ও অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের নায়ক যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযম ৪টি সশস্ত্র গাড়ি ও অস্ত্রধারী শিবির ক্যাডার পরিবেষ্টিত হয়ে লালদীঘির মাঠে উপস্থিত হয়। আন্দর কিল্লাহ শাহী জামে মসজিদস্থ ইসলামি একাডেমি থেকে সে লালদীঘির ময়দানে আসে। এ সময় ওখান থেকে ৪টি অস্ত্র বোঝাই বস্তাসহ মাইক্রোবাস নিয়ে সমাবেশস্থলে এসে বিকেল ৫টা ৩৫ মিনিটে অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে বক্তব্য শেষ করে ঘাতক গোলাম আযম পৌনে ছটায় সমাবেশ স্থল ত্যাগ করে। সমাবেশে শুধু অস্ত্রধারী জামাত শিবির ক্যাডাররাই উপস্থিত ছিল। ঘাতক গোলাম মাত্র কয়েক মিনিট বক্তব্য রাখে।
এরপর আরও অনেক কিছু ঘটে। কোথাও কোনও ঘটনা থেমে থাকে না। আমি ছটি মৃত্যুর সঙ্গে মৃতের মত বসে থাকি।
ডঃ কামাল হোসেন চট্টগ্রাম থেকে জামাতের তাণ্ডবলীলা স্বচক্ষে দেখে এসে প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের যারা সহযোগিতা করবে তাদেরকে জাতি ক্ষমা করবে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও সংবিধান আজ জামাত শিবিরের হাতে বিপন্ন হচ্ছে। এই দেশ এবং রাষ্ট্রকে তারা আরও ধ্বংস করার চক্রান্ত করবে। কামাল হোসেন গোলাম আযমের উদ্দেশে বলেন, আপনি ৭১ এ ভুল করেছেন বলে স্বীকার করেছেন, আপনার ভুলের জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষ খেসারত দিয়েছে। আজ আবার যে সশস্ত্র তৎপরতা চালাচ্ছেন, এই ক্ষতি জাতি আর বহন করবে না। একজন নাগরিক হিসেবে এই সরকারকে আমি হুকুম দিচ্ছি অস্ত্রধারীদের হাত থেকে জাতিকে মুক্ত করার জন্য। সরকার যদি তা না করে আমাদের সকলের দায়িত্ব হচ্ছে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট টিএসসিতে একটি আলোচনা-অনুষ্ঠান করেছে। বিষয় হচ্ছে, প্রস্তাবিত ব্লাসফেমি আইন নির্যাতনের নয়া হাতিয়ার। ব্যারিস্টার সারা হোসেন মূল প্রবন্ধ পড়েছেন। সাবেক বিচারপতি কে এম সোবহান, ব্যারিস্টার ইশতিয়াক আহমেদ, কামাল লোহানী, আনিসুজ্জামান, আলী যাকের, আয়শা খানম বক্তৃতা করেছেন। সকলেই ব্লাসফেমি আইনের বিরুদ্ধে বলেছেন।
চট্টগ্রামে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ হচ্ছে চারদিকে। ছাত্রসমাজ তিরিশ তারিখে সারাদেশে হরতাল ডেকেছে।
শুয়ে ছিলাম। চোখদুটো সাদা দেয়ালের দিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে শুয়ে ছিল। শুয়ে ছিল একটি হাত বুকে। আরেকটি হাত মাথার পেছনে। শুয়ে ছিল পা দুটো মেঝেয়। স্তব্ধ শুয়ে ছিল। প্রাণহীন অঙ্গগুলো এভাবেই শুয়ে ছিল। মৃতের মত শুয়ে ছিল।
অনেক রাতে ঙ এলেন। কাগজ কলম নিতে বলেন। লিখতে বলেন, যা তিনি বলেন, তা। সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী কার্ল বিল্টকে লিখতে হবে চিঠি। কেন লিখতে হবে? ঙ বললেন, কার্ল বিল্ট একটি ফরমাল চিঠি চাইছেন। ফরমালিটি মাথামুণ্ডু কিছুই না জেনে, ঙ যা বলেন, লিখি। লেখা শেষ হলে চিঠিটি একটি খামে ভরে নিয়ে ঙ মিষ্টি হেসে বলেন— মনে হচ্ছে জামিন হবে তোমার!
—জামিন হবে? সত্যিই হবে? অনেকটা আনন্দ আর খানিকটা সংশয় নিয়ে তাকাই।
—তোমার উকিল একটু আশ্বাস দিয়েছেন।
—কি করে হল সব?
—তুমি জানো না প্রতিদিন মিটিং হচ্ছে ইউরোপিয়ান ডিপ্লোমেটদের সঙ্গে সরকারের। সম্ভবত তাদের চাপেই সরকার বাধ্য হয়েছে বেইলের ব্যাপারে গ্রিন সিগন্যাল দিতে।
—হাইকোর্ট কি সরকারের কথা শুনবে? হাইকোর্ট তো ইনডিপেনডেন্ট।
—তা ঠিক। দুএকজন ভাল জাজ আছেন। ওদের সঙ্গেও বোধহয় মিটিং টিটিং হয়েছে।
আনন্দ লাফিয়ে লাফিয়ে নাচে আমার বুকের ভেতর। এতদিনে তবে আমার এই কফিন- জীবনের অবসান হবে! ঝ আমার পিঠে চাপড় দিয়ে বলেন — কী , বিশ্বাস হচ্ছে এখন!
স্তব্ধতা থেকে নিজেকে তুলে নিয়ে বলি— সত্যি বলি তোমাকে, মনে হয় স্বপ্ন দেখছি।
ঙ আমার হাসি-মুখে তাকিয়ে বললেন যে কেবল ইউরোপের সরকারই নয়, আমেরিকার সরকারও চাপ দিচ্ছে খুব। পনেরো জন মার্কিন কংগ্রেস সদস্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি লিখেছেন। ডেমোক্র্যাটিক আর রিপাবলিকান দুদলের লোকেই এই চিঠিতে সই করেছেন। বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে, বলছেন তাঁরা। তোমার নিরাপত্তার জন্যই মূলত চিঠিটি। ঝ প্রশ্ন করেন, ওকে কি যেতে হবে কোর্টে?
ঙ বলেন, মনে হয় না। মনে হয় ওর অনুপস্থিতিতেই ওর জামিন হবে।
এবার আমি উত্তেজনায় সত্যি সত্যি দাঁড়িয়ে যাই। বড় করে শ্বাস নিই।
আমাকে হাত ধরে বসিয়ে দিয়ে ঙ বলেন —তোমার তো নরওয়েতে একটা আমন্ত্রণ আছে। কবে সেটা?
—বোধহয় সেপ্টেম্বরে।
—সুইডেনেও কি আমন্ত্রণ আছে?
—আছে। কবে অনুষ্ঠান সুইডেনে তা মনে নেই।
—জামিন হয়ে গেলে সম্ভবত তোমাকে চলে যেতে হবে দেশ ছেড়ে।
চমকে উঠি।
—চলে যেতে হবে! কোথায়?
—যে কোনও একটি দেশে।
—কেন?
—যেতে হবে।
—কারণটা কী?
—তোমার নিরাপত্তার জন্য। বাঁচতে তো চাও, নাকি চাও না?
—কতদিনের জন্য?
—অনুষ্ঠানের জন্য যতদিনই লাগে।
—বিদেশে আমার সাতদিনের বেশি ভালো লাগে না। প্যারিসের মত জায়গাতেও অস্থির হয়ে উঠছিলাম দেশে ফেরার জন্য।
—এবার অস্থির হলে চলবে না।
—কেন চলবে না? অনুষ্ঠান শেষে তো চলে আসব!
