মিছিলে আমার মূর্তি পোড়ানো হচ্ছে। ফেস্টুনগুলোয় আমার ছবি আঁকা, আমার ছবির গলায় ফাঁসির দড়ি। ঝকে জিজ্ঞেস করি—আচ্ছা বল তো, ওরা তো মূর্তি গড়া আর ছবি আঁকা মানে না, তবে যে ছবি আঁকল, মূর্তি বানালো?
—প্রয়োজনে ওরা মসজিদে গিয়ে পেচ্ছ!বও করতে পারে। ঝ হেসে বললেন।
আমি মাথা নেড়ে বলি—তা ঠিক, এত কোরান কোরান করে অথচ কাদিয়ানিদের মসজিদে গিয়ে হামলা করল, সব ভেঙে ফেলল, পুড়িয়ে দিল। কোরানও ছুঁড়ে ফেলেছে, পুড়িয়েছে।
ঝ আওয়ামী লীগের মতলব নিয়ে পড়েন। কি হয়েছে এই দলটির! ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি যখন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠল, সেই কমিটির নেতৃত্ব নিতে তো উঠে পড়ে লেগেছিল, গণআদালত গঠন কর, গোলাম আযমের ফাঁসি দাও, এসবে এমন মেতে উঠে এখন গোলাম যখন মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে, এখন মুখ বুজে বসে আছে। নব্বইএ গণআন্দোলন করে যে জাতীয় পার্টিকে ক্ষমতা থেকে নামালো, এখন সেই এরশাদের দলের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছে। ছিঃ!
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার লোভে এখন জামাতে ইসলামী কেন, কোনও মৌলবাদী দলের বিরুদ্ধেই কিছু বলছে না, একা একা চিৎকার করছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে। জামাত ইসলামীর বুদ্ধি আছে ঘটে, সংসদের বাইরে আওয়ামী লীগের সঙ্গেও আছে, সংসদের ভেতর বিএনপির সঙ্গে আছে, আর আছে দেশসুদ্ধ তুঙ্গে ওঠা মৌলবাদী আন্দোলনের সঙ্গে। জামাতে ইসলামীর জন্য এমন চমৎকার সময় আর কখনও আসনি আগে। বামফ্রণ্টের সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী জাতীয় কনভেনশনে শামসুর রাহমান খুব মূল্যবান কথা বলেছেন যে মৌলবাদ থাকলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার করে কোনও লাভ হবে না। এতেও কি বোধ হবে না শেখ হাসিনার? তিনি তো মনে করছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার এলেই দেশের সব সমস্যা ঘুচে যাবে।
–কচু ঘুচবে। ঝ বলেন।
অনেক রাতে ক আর ট এলেন। ক জিজ্ঞেস করলেন আমাকে কেমন আছি আমি। কেমন আছি প্রশ্নটি করলে আমি বেকায়দায় পড়ি। অনেক সময় মুখে চিরকেলে অভ্যেসের ভাল শব্দটি এসে যায়। ক আমার ভাবলেশহীন মুখে তাকিয়ে একটু হেসে বললেন — এখন তো আপনার মুশকিল আসান হয়েছে। জামিন পাওয়া যাবে এমন একটা কথা হচ্ছে। খুশি হননি?
হাসি ফোটে মুখে। খুশি হওয়ার মাথা নাড়ি।
ক পাশে বসে যা বললেন, তা হল, দেশের অবস্থা সাংঘাতিক খারাপ, এসময় তাড়াতাড়ি জামিন নিয়ে আমার দেশ থেকে চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।
—জামিন তো হচ্ছে আমার অনুপস্থিতিতে। আমার তো যেতে হবে না কোর্টে।
ক ভুরু কুঁচকে বললেন —কে বলল আপনাকে যেতে হবে না?
—ঙ বলেছেন।
—না, আপনার অনুপস্থিতিতে জামিন হবে না।
—কিন্তু ঙ যে বললেন!
—চেষ্টা হয়েছিল। কাজ হয়নি। আপনাকে যেতে হবে কোর্টে। আজ আপনার উকিলের সঙ্গে আমার ফোনে কথা হয়েছে।
ঝ বলে উঠলেন আবেগে উদ্বেগে —তবে কী উপায় হবে? যদি পথে বা কোর্ট এলাকায় কোনও অঘটন ঘটে!
—তার খুব রিস্ক আছে.. কিন্তু কি আর করা যাবে!
ঝ জিজ্ঞেস করলেন— কোর্টে কবে যেতে হবে?
—কাল তো হবে না, পরশু অথবা তার পরদিন, যে কোনও সময়।
ঝ ককে বললেন তাঁকে কোর্টে যাবার তারিখ এবং সময় জানাতে, কারণ তিনি যাবেন কোর্টে, তিনিই আমার নিরাপত্তা হবেন, তাঁর পকেটে পিস্তল থাকবে। ক বললেন, হয়ত পুলিশ নিরাপত্তা দেবে, এরকম একটি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঝ উড়িয়ে দেন পুলিশি নিরাপত্তার প্রসঙ্গ। বললেন, পুলিশের ওপর কোনও বিশ্বাস নেই। বললেন তিনি একা যাবেন না, তাঁর দলবলকে সঙ্গে নেবেন। ঝর এই প্রতিশ্রুতি আমার দুরু দুরু বক্ষকে কিছুটা শান্ত করে। কিন্তু ঝ একটু আড়াল হলেই ক বললেন যে তিনি মনে করছেন না পিস্তল টিস্তল নিয়ে ঝর কোর্টে যাওয়া উচিত হবে। আমাকে যদি যেতে হয় কোর্টে তবে নিশ্চয়ই পুলিশের ব্যবস্থা থাকবে আমার জন্য।
আমি চুপ হয়ে শুনি। এখন ক যা বলেন, তা ই তো মাথা পেতে বরণ করতে হবে। তাঁর কাছে জানতে চাই ব্লাসফেমির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের আইনটি কি শেষ পর্যন্ত এ দেশ মেনে নেবে কি না।
ক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন— আন্দোলন তো হচ্ছে। এখন কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।
—যদি বিল পাসই হয়ে যায়, তবে তো সর্বনাশ হবে।
ক বললেন—তা তো হবেই। আজই জনকণ্ঠ পত্রিকায় লিখেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের খবর। পাকিস্তানে ব্লাসফেমি আইনের ব্যাপক অপব্যবহার হচ্ছে, এরকম একটি খবর দিয়েছে অ্যামনেস্টি ।
—কি রকম অপব্যবহার হচ্ছে?
—ওখানে সংখ্যালঘু শিয়া, আহমেদিয়া গোষ্ঠী তো আছেই, খ্রিস্টান হিন্দুদের ওপরও বহু বছর ধরে ব্লাসফেমি আইনের নির্যাতন নিপীড়ন চলছে। গত তিন বছর ধরে খ্রিস্টানদের ওপর ব্লাসফেমি অভিযোগ বাড়ছে। তেরো বছর বয়সের এক খ্রিস্টান ছেলে নাকি মসজিদের দেয়ালে কি লিখেছিলো সেটি নাকি ব্লাসফেমি হয়েছে, এখন মসজিদের ইমাম ছেলেটির ফাঁসি দাবি করছে। ফারুক সাজ্জাদ নামের এক লোককে মেরে ফেলা হয়েছে। তাকে প্রথম পাথর ছোঁড়া হয়, গায়ে আগুন ধরানো হয়, তারপরও যখন মরেনি তখন মোটর সাইকেলের সঙ্গে তার শরীরটি বেঁধে নিয়ে সারা শহর ঘোরানো হয়।
—কী করেছিল ওই লোক?
—মসজিদের মাইক থেকে প্রচার করা হয়েছিল যে এক খ্রিস্টান নাকি একটি কোরান আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে। লোকের নাকি ধারণা হয়েছিল ওটি ওই লোক। পরে জানা গেছে ফারুক সাজ্জাদ লোকটি আদৌ খ্রিস্টান ছিল না। কোরানও সে পোড়ায়নি।
ট, শখের ক্যামেরাম্যান ফটাফট ছবি তুলছিলেন আমার। টকে সাবধান করে দিলেন ক, আমার কোনও ছবি যেন কোনও পত্রিকায় না যায়। ট কথা দিলেন সবই তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহ ছাড়া অন্য কিছুর জন্য নয়। নাহ, ছবিতে মন নেই আমার। ভাবনা অন্য কিছুতে। ভাবনা ব্লাসফেমিতে।
