দায় শোধার মধ্যেই ছিল মন। সন্ধেয় ঘরে ঢুকে ঝ আমাকে জানালেন, তিনজন ব্রিটিশ সংসদ সদস্য আমার মামলা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়েছেন। ব্রিটেনে ডিফেণ্ড তসলিমা নামে একটি দল গড়ে উঠেছে। সে না হয় ব্রিটেনে, কিন্তু দেশে কি ঘটছে! দূর দেশে বসে কেউ আমার পক্ষে কথা বলছে, আমাকে বাঁচাতে চাইছে, শুনে মন ভাল হয়ে যায়। কিন্তু দেশের দিকে তাকালে সেই ভাল মনটি আর ভাল থাকে না।
ঝ একটি শিউরে ওঠা খবর দিলেন আজ। গোলাম আযম চট্টগ্রামের লালদীঘির মাঠে জনসভা করেছেন। তাঁর এই সভার বিরুদ্ধে মিছিল হয়েছে গোলামবিরোধী লোকদের। সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য চেয়েছিল একই জায়গায় জনসভা করতে। কিন্তু পুলিশ দেয়নি। গোলাম আযম শেষ পর্যন্ত হেভি পুলিশ প্রটেকশানের মধ্যে জনসভা করেছে। গোলাম আযমের পক্ষের দলে আর বিপক্ষের দলে ভীষণ মারামারি হয়েছে। রীতিমত যুদ্ধক্ষেত্র। প্রচুর গোলাগুলি। বোমা ফেটেছে। অনেক আহত। অনেকে হাসপাতালে ভর্তি। সবচেয়ে দুঃখের কথা, ছ জন মানুষ মারা গেছে।
বল কি? কারা মারা গেছে? কোন দলের? চাপা আর্তনাদ আমার।
জামাত শিবিরের লোকেরা মেরেছে বিপক্ষ দলের লোকদের। বিমর্ষ বসে থাকি। গোলাম আযম সভা করতে গিয়েছিলেন আমার ফাঁসি এবং ব্লাসফেমি আইনের দাবি নিয়ে। চট্টগ্রামে তাঁর জনপ্রিয়তা বেশি বলেই চট্টগ্রাম যাওয়া। কে দায়ি ছটি মৃত্যুর জন্য? গোলাম আযম নাকি আমি ? নিজেকে আমার দোষী মনে হতে থাকে।
—সব আমার দোষ। তাই না? ঝকে জিজ্ঞেস করি।
—কেন, তোমার দোষ হবে কেন?
—ওই স্টেটসম্যানে যদি সাক্ষাৎকারটা না দিতাম, তবে তো এসব হত না দেশে।
—তা ঠিক, হয়ত হত না।
—কিন্তু আমি তো কোরান সংশোধনের কথা বলিনি।
—আসলে ওরা কিছু না কিছু নিয়ে এসব করতই।
ঝ আমাকে সান্ত্বনা দেন বটে, কিন্তু গ্লানিবোধ দূর হয় না আমার। এত তুচ্ছ একটি মানুষ আমি। ভাল কোনও ডাক্তার নই, ভাল কোনও লেখক নই, ভাল কোনও কবি নই।অথচ ধর্ম নিয়ে বড় বড় কথা বলতে গিয়েছি। কী দরকার ছিল! অন্য মানুষেরা, যারা ধর্মকে অসার বলে মনে করে, আফিম বলে ভাবে, তারা তো বলতে যায় না আমার মত। তারা সমাজের মানুষের জন্য সুশিক্ষার ব্যবস্থা করতে চায়, তারা আধুনিক আইনের প্রবর্তনের কথা বলে, তারা প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতাদের উদ্বুদ্ধ করে একটি সুস্থ রাজনৈতিক অবস্থা সৃষ্টি করার জন্য। এভাবেই তো হবে ধীরে ধীরে দেশের অবস্থার পরিবর্তন। এভাবেই তো হতে পারে দেশের মঙ্গল। আমিও মঙ্গল চাই, কিন্তু যে পথে আমি এগোচ্ছিল!ম সে পথটি নিশ্চিত ভুল পথ ছিল। এদেশের আশি ভাগ মানুষ মুসলমান, বেশির ভাগই অল্পশিক্ষিত অথবা অশিক্ষিত, তাদের কিনা হঠাৎ করে আমি ধর্ম না মানার কথা বলছি! আমার মাও তো ধর্ম মানেন। কিন্তু তিনি তো কোনও অসৎ মানুষ নন। তিনি তো অদরদী কেউ নন। মায়া মমতা ভালবাসায় টইটম্বুর তাঁর আদ্যোপান্ত। আমার যুক্তিবুদ্ধির বাবার চেয়ে অনেক বেশি হৃদয় ধারণ করেন তিনি। ধর্ম মেনেও তো মানুষ সৎ হতে পারে, নিষ্ঠ হতে পারে, সুস্থ একটি সমাজ গড়ার জন্য সংগ্রাম করতে পারে। তবে কেন আমি সেই মানুষগুলোর কথা ভাবিনি! আমার ওরকম না ভেবেচিন্তে বলা কথাগুলো আঁকড়ে ধরে দেশকে অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে মৌলবাদীরা — যারা ধর্ম বেচে খায়, ধর্ম যাদের মসনদে ওঠার সিঁড়ি, ধর্ম যাদের কাছে মানুষকে বোকা বানাবার, বধির বানাবার জিনিস! আমি তো ঘাতক গোলাম আযমের হাতে সত্যিই একটি অস্ত্র তুলে দিয়েছি। ধর্ম নিয়ে কিছু না বললে আজ এই দেশে ধর্মান্ধদের এই বিশাল বিপুল আন্দোলন হত না, দেশ জুড়ে এই ধর্মীয় জাগরণ না ঘটলে গোলাম আযমের সুযোগ হত না ঘর থেকে বাইরে বেরোবার, জনসভায় বক্তৃতা করবার। গোলাম আযম বক্তৃতা করতে না গেলে ছটি মানুষকে খুন হতে হত না। ছটি মানুষের নিশ্চয়ই কত স্বপ্ন ছিল জীবনে! ওদের জীবন তো আমার জীবনের মতই মূল্যবান। নিজের জীবনটিকে বাঁচাবার জন্য কি রকম আপ্রাণ চেষ্টা করছি আমি! কফিনে পড়ে থাকতেও আপত্তি নেই, নিঃশ্বাসের শব্দ যেন কেউ না শোনে, ! তাতেও আপত্তি নেই, তবু যেন বেঁচে থাকি। গোলাম আযমের জনসভার প্রতিবাদ করতে যে মানুষগুলো রাস্তায় নেমেছিল, তারা আমার চেয়েও অনেক সাহসী, সংগ্রামী। আমার চেয়েও বেশি দেশপ্রেম তাদের। আমি কেন মরে গিয়ে তবে ওদের বাঁচাচ্ছি না। কী এমন মূল্যবান জীবন আমার। কী এমন ভালটা জীবনে করে ফেলেছি যে আমাকে যে করেই হোক বাঁচতে হবে। আমি কুঁকড়ে থাকি। অপরাধবোধের তীক্ষ্ণ ধারালো ঈগলী ঠোঁট আমার ঠুকরে খেতে থাকে।
নানা খবর আজকের পত্রিকায়। তসলিমা নাসরিন সম্পর্কে আমেরিকার সংবাদপষেন প্রকাশিত খবর খণ্ডন। ২৯ জুলাইর লং মার্চ ও মহাসমাবেশ সফল করার জন্য দেশের বরেণ্য পীর মাশায়েখদের আহবান। তসলিমাকে আশ্রয়দাতা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে হবে। ১৫ আগস্ট অর্ধদিবস হরতাল। দৈনিক সংবাদ পত্রিকাটির খবরের দিকে চোখ আমার। এই পত্রিকাটিতেই মেলে নিরপেক্ষ খবর, সৎ সাংবাদিকতা, কোনও দলের মুখপত্র নয় এটি। আজ প্রতিটি পত্রিকার প্রথম পাতা জুড়ে ছবিসহ প্রধান খবর, চট্টগ্রামে ৫ জন নিহত।। লালদীঘি এলাকা রণক্ষেত্র।। সংঘর্ষ গুলি বোমাবাজি।। আহত তিন শতাধিক।। প্রতিবাদে কাল হরতাল। সর্বদলীয় ছাত্রঐক্যের আহবানে স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের চট্টগ্রাম আগমন প্রতিহত করার কর্মসূচী হিসেবে বিক্ষোভ-রত ছাত্রজনতার সাথে পুলিশ, বিডিআর ও জামাত শিবিরের আর্মড ক্যাডারের মিলিত বাহিনীর কয়েক দফা সংঘর্ষে ৫ জন নিহত ও তিন শতাধিক আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে চাকসুর জিএস আজিম উদ্দিন আহমেদ, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল নেতা পারভেজ নিটুল, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নেতা এনামুল হক চৌধুরীসহ ২০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। অন্যান্য আহতদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রেলওয়ে হাসপাতাল, জেল হাসপাতাল, বন্দর হাসপাতালসহ বিভিন্ন ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে তিনজন ছাত্রঐক্য কর্মী ও দুজন শিবিরকর্মী বলে জানা গেছে। এ ঘটনার প্রতিবাদে ছাত্রঐক্য আগামী বৃহস্পতিবার অর্ধদিবস হরতাল ডেকেছে। গোলাম আযমের আগমনকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে ছাত্রঐক্যের ঘোষিত কর্মসূচীর মোকাবেলায় প্রশাসন ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। পুলিশ, বিডিআর, রিজার্ভ পুলিশ, আর্মড আনসারসহ প্রায় দশ হাজার সদস্যের মিলিত বাহিনীর পাশাপাশি প্রায় সমসংখ্যক জামাত শিবিরের আর্মড ক্যাডার গতরাতেই লালদীঘি মাঠ ও আশপাশের এলাকার দখল নিয়ে নেয়। জামাত শিবির কর্মীরা মাথায় হলুদ পট্টি বেঁধে গজারি কাঠ ও গর্জন কাঠের বড় বড় লাঠি ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে লালদীঘিমুখী সবকটি সড়কে অবস্থান নেয়। তারা পথচারীদের তল্লাশি আর জিজ্ঞাসাবাদ করে। আজ মঙ্গলবার ছাত্রঐক্য হরতাল ডেকেছিল। কিন্তু পুলিশ বিডিআর কোথাও কোনও পিকেটারকে মাঠে নামতে দেয়নি। সকাল থেকে ছাত্রঐক্য কর্মীরা কয়েক দফা মিছিল বের করার চেষ্টা করে। প্রতিবারই পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাস ছুঁড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। সকাল সাতটায় ও নটায় নিউমার্কেট চত্ত্বরে ছাত্রজনতার সাথে পুলিশ বিডিআরের দুদফা সংঘর্ষ হয়। সকাল থেকেই নগরীর বিভিন্ন স্থানে বোমা ককটেল বিস্ফোরিত হতে থাকে। বেলা দুটোর পর পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে থাকে। বেলা তিনটায় লালদীঘি ময়দানে হাজার হাজার পুলিশ বিডিআর ও শিবিরের আর্মড ক্যাডারের নিশ্ছিদ্র প্রহরায় জামাতের জনসভা শুরু হবার পর পর পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য কর্মীরা শহীদ মিনার চত্বরে সমাবেশ শেষে সিনেমা প্যালেসের সামনে দিয়ে লালদীঘির দিকে এগোতে চাইলে বিডিআর তাদের ওপর লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে। বাধা পেয়ে ছাত্র জনতা পেছনে সরে গিয়ে দোস্ত বিল্ডিং চত্বরে সমাবেশে মিলিত হয়। ছাত্র জনতা সেখানে মুষ্ঠিবদ্ধ হাত তুলে শপথবাক্য পাঠ করে। এরপর প্রায় হাজার পাঁচেক ছাত্র জনতার বিরাট মিছিল কোর্ট রোডের দিকে এগোতে থাকে। বিডিআর মিছিলে কয়েক দফা বাধা দেয়, লাঠিচার্জ করে ও টিয়ারগ্যাস ছোড়ে। জিপিওর সামনে ছাত্র জনতার সাথে বিডিআর ও শিবির কর্মীদের সংঘর্ষ বাধে। ছাত্র জনতা তা উপেক্ষা করে তিনটি ব্যারিকেড পর পর ভেঙে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন ভবনের সামনে এলে শিবির ক্যাডারদের জায়গা করে দিয়ে বিডিআর সদস্যরা পেছনে চলে আসে। এ সময় প্রচণ্ড শব্দে বোমা বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দে শহরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। জামাতের জনসভায় বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। লোকজন ছোটাছুটি করতে থাকে। বেলা ৪টা ৪৫ মিনিটের দিকে শিবির কর্মীদের ছোড়া গুলিবিদ্ধ হয়ে ছাত্রলীগ কর্মী ও সরকারি সিটি কলেজের ১ম বর্ষের ছাত্র এহসানুল হক মনি( ১৮) আহত হলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায়।
