ইসলামি দলের সূষেন জানা গেছে জামাতের পৃষ্ঠপোষকতায় এই সংগঠনের ব্যানারে অন্তত একশ জন সশস্ত্র ক্যাডার রয়েছে। এদের অনেকেই যুব কমাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এদের লক্ষ্য তথাকথিত মুরতাদদের চিহ্নিত করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া। দু বছর আগে যুব কমাণ্ড ভারতীয় দালাল হিসেবে প্রগতিশীল রাজনীতিবিদদের নাম ঘোষণা করে তাদের হত্যার হুমকি দিয়েছিল। এই ঘটনার পর পর খুলনায় রতন সেন নিহত হন। ঢাকায় রাশেদ খান মেনন গুলিবিদ্ধ হন। এখন ইসলামী জেহাদ ইসলাম রক্ষার নামে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দিয়ে পরিস্থিতিকে আরো খারাপের দিকে নিয়ে যাবার পাঁয়তারা করছে। সংগঠনের সূষেন জানা গেছে, ২৯ জুলাই লং মার্চের পরেই তারা স্কোয়াডের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবে। ইসলামী জেহাদের কর্মীরা মনে করে সরকারের মধ্যে অনেক মুরতাদ রয়েছে। যাদের কারণে তসলিমা নাসরিনকে গ্রেফতার করা সম্ভব হচ্ছে না। সংগঠনের এক প্রচারপষেন বলা হয়েছে একে একে তারা প্রত্যেক মুরতাদের বিরুদ্ধে গণআদালত গঠন করবে। যদিও সরকার বারবার বলেছে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ ধরনের সংগঠনের বিরুদ্ধে কোনও রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
এই খবরটি পড়ে আমি অনেকক্ষণ স্থবির বসে থাকি। সাদা কাগজের ওপর পেন্সিলে আঁকতে থাকি আমার ছবি, ছবিটির গলায় দড়ি, বুকে ছুরি, মাথায় গুলি। লিখতে থাকি মৃত্যু মৃত্যুমৃত্যু। মৃত্যু, মৃত্যু, মৃত্যু।ছোট মৃত্যু, বড় মৃত্যু। কেমন লাগে মরে গেলে! কিছু কি বোঝা যায় যে মরে যাচ্ছি আমি। বুকে কি খুব যন্ত্রণা হয়! এমন কাউকে পাইনি যে মরেছে, এবং বর্ণনা করেছে মৃত্যু হলে কেমন লাগে। যে যায়, সে যায়। কোনওদিন ফিরে এসে কাউকে বোঝাতে পারে না মৃত্যুর রংরূপগন্ধ। আমি মরে গেলে কেউ কি কাঁদবে এই জগতে! আমার মা কাঁদবেন, বাবা কাঁদবেন, ভাই বোনেরা কাঁদবে জানি। এদের বাইরে যারা আমাকে ভালবাসে, তারা দুঃখ করবে। কিন্তু কদিন আর! কটা দিন গেলে সবাই ভুলে যাবে। আগের মত যে যার জীবন যাপন করবে। সারাদিন আমি আর মৃত্যু বসে থাকি পাশাপাশি। সাদা কাগজটিতে মৃত্যুর ছবি আঁকতে আঁকতে লিখি।
মৃত্যুর সঙ্গে এখন আমার রোজ দুবেলা দেখা হয়, আমরা পরস্পরকে গাঢ় চুম্বন করি, পাশাপাশি বসি, ধুম আড্ডা দিই। মৃত্যুর শরীরে চমৎকার সুগন্ধ, হাঁটুতে থুতনি রেখে জীবনের গল্প যখন করি, থই থই নদী, নদীতে ডুবে ভেসে কৈশোর যাপন, ধুলো খেলা–যখন গল্প করি ফিতে বাঁধা বেণী উড়িয়ে গোল্লাছুট, গোলাপ পদ্ম, হাডুডু আর ভোকাট্টা ঘুড়ির পেছনে দৌড়ে দৌড়ে ভর সন্ধেয় মাঠ পেরিয়ে, খাল পেরিয়ে রাত্তিরে পুকুর পাড়ে বসে সারা গায়ে জ্যোৎস্না মাখানো.. জলের ওপর শুয়ে থাকা রুপোলি মাছ দেখে সেই মাছের দিকে হাত বাড়ালে হাতের মুঠোয় আসে মাছ নয়, টুকরো টুকরো চাঁদ। যখন গল্প করি ঘাসের বিছানা থেকে ফ্রক ভরে শিউলি তুলে পড়শির দেয়াল ডিঙিয়ে দে দৌড় দে দৌড় দিনের কথা, মৃত্যুর চোখেও তখন অল্প অল্প শিশির জমে, তারও কণ্ঠ বুজে আসে, বলে, যাই। মৃত্যুর সঙ্গে রোজ দুবেলা দেখা হয় আমার, দেখা হলে পরস্পরকে গাঢ় চুম্বন করি আর যখন গল্প করি কৈশোর পেরোতেই গহন অরণ্যে এক পাল বুনো মোষের মুখে আমাকে ছেড়ে দিল কারা যেন, কারা যেন একটি ডোবায় ঠেসে ধরল আমার মুখ, মাথা, কারা যেন আমার পায়ে হাতে শেকল পরালো, কারা যেন পাথর ছুঁড়তে ছুঁড়তে আমার কপাল, মাথার খুলি…. মৃত্যুর চোখেও তখন গভীর কুয়াশা নামে, বলে — যাই। মৃত্যুর সঙ্গে রোজ দুবেলা দেখা হয় আমার। আমার চুলে পিঠে হাত বুলিয়ে সে কথা দিয়েছে আবার আসবে সে, এবার আর ঘোর অন্ধকারে আমাকে একলা বসিয়ে কোথাও যাবে না, তার বাড়ি আছে একটি আলোয় ঝলমল, ওখানে নেবেই আমাকে।
ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ে কাগজটিতে। পড়ুক। পড়তে দিই। গোঙানোর শব্দ শুরু হলে বালিশে মুখ গুঁজে উপুড় হয়ে পড়ে থাকি। শব্দটিকে সজোরে চেপে রাখি যেন কোথাও না যায় ঘরটি থেকে। হাত পা গুলো গুটোতে গুটোতে সঙ্কুচিত হতে হতে আমি এই এতটুকু হয়ে যেতে থাকি, অস্তিত্ব যদি অস্বস্তি হয়ে দাঁড়ায়, এভাবেই বুঝি ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হতে হয়। এভাবেই পড়েছিলাম যখন ঝ এলেন। ভেতর থেকে বন্ধ ছিল না দরজা। ঝ ঢুকে পিঠে হাত রাখতেই চমকে পেছন ফিরি।
—হয়েছে কি?
—কিছু না।
—কিছু তো নিশ্চয়ই।
আমাকে টেনে তুলে বসিয়ে দেন তিনি। মুখ দেখেই বোঝেন আমি আবার ডুবেছি মৃত্যুচিন্তায়। সিগারেট বাড়িয়ে দেন। দুজন চুপচাপ বসে সিগারেট খেতে থাকি। ঝ একসময় বলেন —আজ তোমার ভাই আসবে।
—সত্যি? সত্যি আসবে? কখন আসবে?
—রাতে।
—কটায়?
—জানিনা কটায়।
—কি করে জানো যে আসবে?
—কথা হয়েছে।
একটি উত্তেজনা আমার দিকে চিতার মত দৌড়ে আসতে থাকে। এতদিন পর আমি আমার ঘনিষ্ঠ কাউকে দেখব। মনে হচ্ছে কয়েক লক্ষ বছর পর বুঝি দেখা হবে! ঝকে দেখলে বোঝা যায় না যে ভেতরে ভেতরে তিনি এত নরম। নিশ্চয়ই তিনি বুঝতে পারেন কী ভীষণ চাইছি আমি আত্মীয়দের কাউকে দেখতে। হয়ত কোনওদিনই আর আমাদের দেখা হবে না ভেবে ঝ এখন এই শেষ দেখার ব্যবস্থাটি করে দিলেন।
সারাদেশে আন্দোলন হচ্ছে। প্রতিটি নগরে, বন্দরে। প্রতিটি শহরে, উপশহরে, প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি গঞ্জে। আমাকে ফাঁসি দেওয়ার জন্য মানুষ উন্মাদ হয়ে উঠেছে। আমার বাবার গ্রামে, যে গ্রামে আমার বাবা জন্মেছেন, যে গ্রামের মানুষদের তিনি আজ তিরিশ বছর বিনে পয়সায় চিকিৎসা করছেন, সেই গ্রামের মানুষও আমাকে ফাঁসি দেবে। যে ইশকুলে বাবা লেখাপড়া করেছেন, সেই চণ্ডিপাশা ইশকুলের মাঠেও বিরাট জনসভা। চল্লিশ হাজার লিফলেট বিলি হয়েছে নান্দাইলে। জেহাদের ডাক পড়েছে।
