আগেও যে কথা ভাবছিলাম যে আজকের কাগজসহ বিভিন্ন প্রগতিশীল পত্রিকা এখন মিশন হিসেবেই নিয়েছে মৌলবাদবিরোধী সব খবর প্রকাশ করার, কলাম ছাপার, সম্পাদকীয় লেখার। মৌলবাদীদের কোনও খবরই এসব পত্রিকায় ছাপা হয় না। ওদের বিশাল বিশাল মিছিলের ছবি ছাপা হয় না। একইরকম মৌলবাদীদের পত্রিকায় তাদের খবরগুলোকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। কেবল একদলের পত্রিকা পড়লে দেশের প্রকৃত অবস্থা বোঝার উপায় নেই, বুঝতে হলে দুদলের পত্রিকা পড়তে হয়।
ইনকিলাব পত্রিকায় লং মার্চের জন্য বিরাট বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে, সারাদেশ থেকে ঢাকা অভিমুখে লং মার্চ। লং মার্চের পর মহাসমাবেশ। বিজ্ঞাপনে তসলিমা নাসরিনের ফাঁসির দাবির কথা বলা হয়েছে, যেটি নাকি ৩০শে জুনের হরতালের গণরায়। এখন ঝর প্রশ্ন, ২৮ জুন তারিখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় থেকে বলা হল যে কোনও ব্যক্তির জীবন নাশের হুমকি প্রদান করা আইনের চোখে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এখন এই বিজ্ঞাপনকে কিভাবে নেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়? কী ব্যবস্থা নিচ্ছে প্রতিদিনের মিছিলগুলোয়, সভাগুলোয় ফাঁসির জন্য চিৎকার করা মোল্লাগুলোর বিরুদ্ধে? ঝর প্রশ্নের কোনও উত্তর আমার কাছে নেই। আমার একটি প্রশ্ন, এ সময় আওয়ামী লীগ কী করছে? ঝ বললেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টি আর জামাতের সঙ্গে আঁতাত করেছে, এখন আওয়ামী লীগের কাছে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইস্যু নিয়ে আন্দোলন করাই মূল বিষয়। জামাতের বিপক্ষে গেলে জামাত আওয়ামী লীগের দাবিকে সমর্থন জানাবে না, না জানালে আওয়ামী লীগের সম্ভব হবে না আন্দোলন জোরদার করার। সুতরাং আওয়ামী লীগ এখন মরে গেলেও জামাতের বিপক্ষে একটি শব্দও উচ্চারণ করবে না। যে দুচারজন বলছে জামাতের বিপক্ষে তারা নিজ দায়িত্বে বলছে, দল থেকে নয়। মূলত ছাত্ররাই যা করার করছে। তারা দলের সিদ্ধান্তের পরোয়া করছে না। বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট আজ সাম্প্রদায়িকতা, ফতোয়াবাজ ও মৌলবাদ বিরোধী জাতীয় কনভেনশন করবে বলে মতবিনিময় করেছে বিভিন্ন দল ও সংগঠনের সঙ্গে। দলগুলো গণফোরাম, গণতন্ত্রী পার্টি, গণআজাদী লীগ, জাতীয় সমন্বয় কমিটি, পাট সুতা বস্ত্র ও চিনিকল শ্রমিক ফেডারেশন, শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী ছাত্র সমাজ, আইনজীবী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, প্রজন্ম ৭১। কিন্তু আওয়ামী লীগ কোথায়! আওয়ামী লীগের বন্ধু এখন জামাতে ইসলামি। বাম ফ্রণ্টের নেতারা আওয়ামী লীগের এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে বেরিয়ে এসে মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেওয়ার কথা বলছেন, আশা করছেন আওয়ামী লীগ ফিরে আসবে।
কিন্তু আসবে কি?
ঝ বললেন, ওরা না এলেই ভাল। আওয়ামী লীগের চরিত্র বুঝুক সবাই। ভেবেছে ধর্মের কথা বললে ধর্মান্ধদের ভোট পাওয়া যাবে, তা তারা জীবনেও পাবে না। এখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের যে মানুষগুলো আওয়ামী লীগকে সমর্থন করত, তারা আর আওয়ামী লীগকে ভোটই দেবে না। দলটি তার বাঁধা ভোটগুলো নষ্ট করছে। এত আদর্শচ্যুতি কজন সহ্য করবে!
চট্টগ্রামে গোলাম আযম যাচ্ছেন বক্তৃতা করতে! লালদীঘির ময়দানে তিনি জনসভা করবেন, ভাবা যায়! জামাতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তিনি আর বসে থাকছেন না। কিন্তু ছাত্রঐক্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে জামাতের জনসভা পণ্ড করে ছাত্রঐক্য সমাবেশ করবে লালদীঘি ময়দানে। সিদ্ধান্তটি সাহসী বটে, কিন্তু সংঘর্ষ ঠেকাবে কে! একটি হিম হিম ভয় আমাকে তির তির করে কাঁপায়। এর মধ্যেই গোলাম আযমের উপস্থিতির প্রতিবাদে ছাত্রঐক্যের সঙ্গে জামাত শিবির ও পুলিশের সংঘর্ষে চট্টগ্রামে গতকাল পঞ্চাশজন আহত হয়েছে। ছাত্রঐক্য আর জামাত শিবিরের মধ্যে ২০/২৫ রাউণ্ড গুলি −ছাঁড়াছুঁড়ি হয়, শতাধিক বোমা, ককটেল বিস্ফোরিত হয়। ছাত্রঐক্য মিছিল করছে, গোলাম আযমের ফাঁসি আর জামাত শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি নিয়ে। কিন্তু জামাত শিবিরের লোকেরা দখল করে নিয়েছে লালদীঘির ময়দান। পুলিশ প্রশাসনও লালদীঘির ঘাট দখল করে রেখেছে গোলাম আযমের জনসভার ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য। সশস্ত্র শিবিরকর্মীদের পুলিশ গ্রেফতার করছে না, গ্রেফতার করছে ছাত্রঐক্যের ছেলেদের। জামাত শিবিরের সশস্ত্র ক্যাডাররা সর্বদলীয় ছাত্রঐক্যের মিছিলে হামলা করেছে, লালদীঘির ময়দানের নিয়ন্ত্রণ দখল করে নিয়েছে পুরোপুরি।
মৌলবাদী জোটের সমাবেশ বায়তুল মোকাররমের সামনের রাস্তায়। তসলিমার ফাঁসির জন্য জনগণের সমর্থনের নিদর্শন ৩০ জুনের হরতাল যদি বড় কিছু উদাহরণ না হয়ে থাকে তবে ২৯ জুলাইএর লং মার্চ আর মহাসমাবেশ বুঝিয়ে দেবে ফাঁসির দাবি কি জিনিস। সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদের নেতারা বললেন, ২৯ জুলাই বাধা দিলে সরকার পতনের আন্দোলন শুরু হবে। শুরু যে হবে এ বিষয়ে আমার সন্দেহ নেই। কারও আছে বলেও মনে হয় না। সরকার কি ফেঁসে গেল মোল্লাদের উত্তেজিত করে! বক্তারা জোর দিয়ে বলছেন রক্তের বিনিময়ে হলেও জীবনের বিনিময়ে হলেও মহাসমাবেশ সফল করতেই হবে। সরকারকে দোষ দেওয়া শুরু হয়ে গেছে, সরকার তসলিমার বিরুদ্ধে মামলা করেছে লোককে ধোকা দেবার জন্য, এখন পর্যন্ত তাকে গ্রেফতার করতে পারছে না, এটা কোনও কথা হল! সরকার তসলিমাকে খুঁজে পায় না, আর তসলিমা সাক্ষাৎকার দিয়ে চলছে, বাহ! বাহ বটে, কিন্তু মোল্লাদের ঘটে এইটুকু বুদ্ধি হয় না যে সাক্ষাৎকার আজ প্রচার হওয়া মানে এই নয় যে আমি আজ সাক্ষাৎকার দিয়েছি. টেলিভিশনগুলো পুরোনো সাক্ষাৎকার প্রচার করছে। বিবিসি অন্য দেশের টেলিভিশন থেকে কিনে সেই সাক্ষাৎকার প্রচার করছে।
