ব্লাসফেমি আইন ছাড়াই নারীদের পুড়িয়ে মারা হচ্ছে, তসলিমা নাসরিনের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হচ্ছে। ডঃ আহমেদ শরীফের ফাঁসি দাবি করা হচ্ছে – এগুলো সবই হচ্ছে ধর্মের নামে। এই যদি বর্তমান অবস্থা হয় তাহলে ব্লাসফেমি আইন পাস হলে পরিস্থিতি কতটুকু ভয়াবহ হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়।
ব্লাসফেমি আইন প্রধানমন্ত্রী খালেদা ও শেখ হাসিনা নারী হওয়ার কারণে ধর্মের দোহাই দিয়ে তাদেরকেও রাজনীতি করার অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে। বোখারি শরীফের উদ্ধৃতি দিয়ে কাঠমোল্লারা বলে থাকে, ঐ জাতির উন্নতি হবে না, যে জাতি তাহাদের শাসনকার্য পরিচালনার ভার কোনও নারীর ওপর ন্যস্ত করিয়াছে। ধর্মের এই বিধানের অজুহাত দেখিয়ে সহজেই ধর্ম ব্যবসায়ীরা নারীদের রাজনীতি করার অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে। আজ এই ব্লাসফেমি ্আইন কারা চাচ্ছে? এরা হচ্ছে ৭১ এর চিহ্নিত নারী নির্যাতনকারী ও গণহত্যার নায়ক রাজাকার, আল বদর, আলশামস ও কাঠমোল্লারা। ৭৪ এর সাত খুনের আসামী এক নেতাও ব্লাসফেমি আইন প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন করছে। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের ইমাম খতিব মওলানা ওবায়দুল হক সরকারি চাকুরি করেও ব্লাসফেমি আইন পাসের জন্য উঠে পড়ে লেগেছে।
কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে, সরকার ও প্রধান বিরোধীদল এই বিষাক্ত সাপদের নিয়ে খেলছে। নারী পুরুষ, শ্রমিক, কৃষক, ছাত্রজনতার একজোট হয়ে এই নরঘাতকদের প্রতিহত করার সময় এসেছে। আমাদের মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার অধিকার আজ হুমকির সম্মুখীন, মানবতা বিপন্ন।
তাই আসুন ভাই বোনেরা আমরা ঐক্যবদ্ধ ভাবে এই অশুভ শক্তিকে উচ্ছেদ করে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে রক্ষা করি। জনতার বিজয় অনিবার্য।
শামীম সিকদার
সহযোগী অধ্যাপক
চারুকলা ইনস্টিটিউট
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
কাল বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবে বাক স্বাধীনতা ও ধর্মীয় অনুভূতি বক্তব্য নিয়ে একটি আলোচনা অনুষ্ঠান হয়। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস। বুঝলাম না বাংলা নাম বাদ দিয়ে এ দেশি সংগঠন ইংরেজি নাম দিতে গেছে কি জন্য। মজার ব্যাপার হল, অনুষ্ঠানের বক্তারা সাবেক বিচারপতি, ব্যারিস্টার, প্রফেসর, সাংবাদিক এরকম লোক। প্রধান আলোচক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডীন ডঃ এরশাদুল হক। সাবেক বিচারপতি রুহুল ইসলাম যা বলেছেন, তার সংক্ষেপ হল, কোরান না পড়ে অনেকে বিরোধিতা করেন। কারণ তারা বুঝতে পারেন না কোরানে কি লেখা আছে। কোরান শাশ্বত, চির আধুনিক। হযরত আদম থেকে ইসলামের শুরু আর এর পূর্ণতা এসেছে হযরত মুহম্মদের মাধ্যমে। ধর্ম সম্পর্কে সীমাহীন বাক স্বাধীনতা থাকা উচিত নয়।
ডঃ এরশাদুল হক বলেন, আমাদের দেশে ধর্মদ্রোহিতার শাস্তি পর্যাপ্ত নয়। ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি ১৯৮৭ সালে সংশোধিত হয়, যাতে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার শাস্তি করা হয় মাত্র দু বছর আর সামান্য কিছু জরিমানা। এরশাদুল হক, এই শাস্তিতে মোটেও খুশি নন। তিনি ধর্ম সম্পর্কে দায়িত্বহীন উক্তি এবং ধর্মদ্রোহিতা কমানোর জন্য মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে পাঁচ বছর কারাদণ্ডের জন্য সুপারিশ করেন।
জাতীয় আইনজীবী সমিতির সভাপতি খন্দকার মাহবুবউদ্দিন বলেছেন, আইনের অপ্রতুলতার সুযোগে,মানবাধিকারের ছদ্মাবরণে এই দেশে ঘরের শত্রু বিভীষণদের দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মনে আঘাত দেওয়া হচ্ছে। দণ্ডবিধি অনুযায়ী ধর্মদ্রোহিতার শাস্তি পর্যাপ্ত নয়।
বাকি বক্তারা প্রাণ খুলে বাক স্বাধীনতার চৌদ্দ গুষ্ঠি উদ্ধার করেন। এই যদি হয় আমাদের শিক্ষিত প্রতিষ্ঠিত লোকদের মত, তবে আর মোল্লাদের দোষ দিই কেন! লং মার্চের সমর্থনে সভা মিছিল সারাদেশে হচ্ছে। প্রতিরোধ মোর্চা ভীষণ ব্যস্ত এ নিয়ে, পারলে চব্বিশ ঘণ্টায় চব্বিশটি সভা করে। মোর্চার লোকেরা বলে দিয়েছে, ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীরা বাংলার মাটিতে টিকতে পারবে না। সাফ কথা।
জ আসেন রাতে তাঁর সেই বন্ধুটিকে নিয়ে। জ, জর বন্ধু, ঝ আর আমি অনেক রাত পর্যন্ত ঘরের মেঝেয় আসন করে, পা ছড়িয়ে বসে ব্লাসফেমি আইন নিয়ে কথা বলি। প্রায় শব্দহীন স্বরে, কেউ যেন শুনতে না পায় বাইরে। আমাদের সবার মধ্যে একটি হতাশা, একটি আতঙ্ক। আমরা চেষ্টা করেও তা দূর করতে পারি না।
৩. অতলে অন্তরীণ – ৫৩
ছাব্বিশ জুলাই, মঙ্গলবার
কি ছিল তসলিমার লেখায়, আর কেনই বা ক্ষেপলো মৌলবাদীরা?
আজকের কাগজ এই শিরোনাম দিয়ে ভূমিকা লিখে আমার কলামগুলো ছাপার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেখে অবাক হই, যেখানে নাম উল্লেখটিই হত না, সেখানে নাম উল্লেখ তো বটেই, একেবারে কলাম ছাপার সিদ্ধান্ত। আসলে একটি কথা মনে হয়ে বুঝে গেছে যে তসলিমার নামটিই যেহেতু মৌলবাদীরা উচ্চারণ করছে, সুতরাং এই নামটি উল্লেখ না করে অন্য নাম উল্লেখ করে বেশিদিন কাজ চলে না। জনকণ্ঠের সাংবাদিকরা বহু আগেই ছাড়া পেয়ে গেছে, তাদের নাম উল্লেখ করার আর দরকার পড়ছে না। বুদ্ধিজীবীদের ফতোয়া দিচ্ছে এই অভিযোগ করে বুদ্ধিজীবীদের নামের তালিকাও দিতে পারছে না, অতএব, শেষ পর্যন্ত তসলিমা নামটি না চাইলেও উচ্চারণ করতেই হল। ভূমিকাটি এরকম, ‘নারীবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিন নারী স্বাধীনতা, ধর্মের কুসংস্কার, গোঁড়ামি, পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীদের দুর্ভোগ ইত্যাদি বিষয়ে বিভিন্ন সময় সাপ্তাহিক খবরের কাগজ, আজকের কাগজসহ প্রগতিশীল পত্রিকায় লেখালেখি করেছেন। তাঁর এই রচনাগুলো কুসংস্কারাচ্ছত মৌলবাদীদের ভাল লাগেনি। তারা প্রথম প্রথম এ ব্যাপারে হালকাভাবে তসলিমার লেখার প্রতিবাদ করেছিল। কয়েকটি মৌলবাদী পত্রিকার সহযোগিতায় তাদের সেই ক্ষোভ রোষ উস্কে ওঠে এবং এভাবেই বর্তমান অবস্থায় পৌঁছোয়। নারী শিক্ষা, নারী মুক্তি, নারী প্রগতি এবং মেয়েরা যখন সমাজের বন্দী অবস্থা ছিন্ন করে কর্মজীবনে প্রবেশ করছিল তখনই ধর্মান্ধ মোল্লারা শুরু করেছে নাসরিন বিরোধী প্রচারণা। আজ মৌলবাদীরা কেবল নাসরিনের বিরুদ্ধেই ফাঁসির দাবি জানাচ্ছে না, প্রকৃতপক্ষে নারীমুক্তির বিরুদ্ধেই তারা সোচ্চার হতে চাইছে। সরকারও যখন নারীদের শিক্ষা ও দারিদ্র মুক্তির কর্মসূচি হাতে নিচ্ছে তখনই মৌলবাদীরা মাঠে নেমেছে কোমর বেঁধে। আমরা আজকের কাগজের পাঠকদের জন্য সেই প্রগতিবাদী কলামগুলো থেকে উল্লেখযোগ্য অংশবিশেষ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করার উদ্যোগ নিয়েছি। আজ তার প্রথম অংশ প্রকাশ করা হল।’
