বাংলাদেশ লেখক শিবির ব্লাসফেমি এক্ট প্রবর্তনের চক্রান্তের বিরুদ্ধে আজ একটি সমাবেশের আয়োজন করেছে। দেশের বড় বড় সব শিল্পী, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, শিক্ষক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী সমাবেশে ছিলেন। সকলেই উদ্বিগ্ন, এই সরকার আবার না মৌলবাদীদের দাবি মেনে নেয়! ঘোষণা করা হয়, ধর্মীয় ফ্যাসিবাদকে বৈধ ও আইনী রূপ দেওয়ার জন্য পাকিস্তানি কায়দায় ব্লাসফেমি এক্ট এর দাবি উঠেছে। সভায় শামসুর রাহমান বলেছেন, মৌলবাদ হচ্ছে একটি ব্যাধি। .. স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি লেখক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের বাড়িতে বাড়িতে হানা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এতসব সত্ত্বেও সরকারের নীরবতায় প্রমাণ হয় যে বর্তমান সরকার মৌলবাদীদের সরকার।
সমাবেশে সাত দফা দাবি উত্থাপিত হয়। ৭১এর ঘাতক দালালদের বিচার, ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারকে শাস্তিযোগ্য করে আইন প্রণয়ন, সার্বজনীন পারিবারিক আইন চালু করা, লেখক শিল্পীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার ও হয়রানি বন্ধ করা। এরপর বুদ্ধিজীবীদের বিশাল র্যালি রাজপথ প্রদক্ষিণ করে।
সমাবেশে, র্যালিতে বিলি করা হয় প্রচার পত্র। একটি শামীম সিকদারের।
মধ্যযুগুগীয় বর্বর ব্লাসফেমি আইন প্র্রিতিরোধে ঐক্যবদ্ধ হোন
মীম সিকদারের আহবান
পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবন যখন ব্লাসফেমি আইনের কবলে পড়ে বিপণ্ন হতে চলছে, যখন একজন ইমামের পাশবিক নারী নির্যাতনের কারণে ৩০ বছর দণ্ড হয়েছে ঠিক তখন জামাত সহ বাংলাদেশের কাঠ মোল্লারা তথাকথিত ধর্মদ্রোহীদের শাস্তিদানের অজুহাতে ব্লাসফেমি আইন পাস করার জন্য সরকারকে চাপ দিচ্ছে। এই কাঠমোল্লারা বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে কাফের আখ্যায়িত করে ফতোয়া দিয়েছিল, এরাই নারী মুক্তি আন্দোলনের অগ্রদূত বেগম রোকেয়াকে জঘন্য ভাষায় আক্রমণ করেছিল। একই ধর্মান্ধ গোষ্ঠী সিলেটের কমলগঞ্জ থানার ছাতকছড়া গ্রামের নুরজাহানকে হত্যা করেছে, তসলিমা নাসরিনকে হত্যা করতে চাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে জানা অজানা অনেক নারীরাই আজ ধর্ম ব্যবসায়ী অপশক্তির আক্রমণের শিকার। ব্লাসফেমি আইন পাস না করেই এরা অঘোষিত ব্লাসফেমি আইন দিয়ে প্রগতিশীল শক্তিকে ধ্বংস করতে চাচ্ছে। ৭১ এর চিহ্নিত খুনী এই রাজাকার গোষ্ঠী আইন নিজের হাতে তুলে নেবার পরও সরকার রহস্যজনকভাবে নীরব। খ্রীস্টান মৌলবাদীরা আধুনিক বিজ্ঞানপ্রযুক্তিকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে যে ব্লাসফেমি আইন পাস করেছিল, সেটাই কথিত মুসলমান মৌলবাদীরা বাংলাদেশে চালু করতেচাচ্ছে। কথায় কথায় মুসলমানিত্বের বড় বড় বুলি আওড়িয়ে থাকলেও প্রগতিশীল আধুনিক ধ্যান ধারণা প্রতিহত করতে খ্রীস্টান মৌলবাদীদের চিন্তার সাথে হাত মিলিয়েছে বাংলাদেশের কাঠমোল্লারা।
এই আইন পাস হলে কি ধরণের ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে, এর একটি চিত্র তুলে ধরছি। ০ব্লাসফেমি আইনে প্রধানভাবে আক্রমণের শিকার হবে অবহেলিত নারী সমাজ, সাধারণ শ্রমিক, কৃষক, জনতা, ও প্রগতিশীল শক্তি। এই আইন নারী সমাজকে আবারো অবরুদ্ধ ভোগের পণ্যে পরিণত করবে। বর্তমানে নারীরা যখন উμচ শিক্ষা গ্রহণ করছে, আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানে শিক্ষিত হয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নারীরা যখন সমাজে বিভিন্ন অবদান রাখছে ঠিক তখনই নারী মুক্তিকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে এই আইন পাসের চক্রান্ত চলছে।
০ব্লাসফেমি আইন পাস হলে ধর্ম বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহশিক্ষা বন্ধ হয়ে যাবে। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, যেখানে নারী পুরুষ এক সাথে অধ্যয়ন করে জ্ঞান আহরণ করছে সেখানে অধ্যয়নের অধিকার থেকে নারীরা বঞ্চিত হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল, কৃষি, চারুকলা, সমাজবিজ্ঞান ও গবেষণা সহ জ্ঞান অর্জনের সমস্ত শাখা থেকে নারীদের বিতাড়িত করা হবে। একই সাথে কর্মক্ষেষেন যেখানে পুরুষদের সাথে নারীরা চাকুরি করছে, সেখানে তাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়ে যাবে।
০বাধ্যতামূলকভাবে নারীদের পরতে হবে বোরখা। নারী শ্রমিকদের বোরখার অবগুণ্ঠনে আটকিয়ে ফেলে বেকারত্বের অভিশাপের দিকে ঠেলে দেয়া হবে।
০বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে নিয়োজিত লক্ষ লক্ষ নারী শ্রমিক এই জঘন্য ব্লাসফেমি আইন চালু হলে কথিত ধর্মীয় বিধান অবমাননার অভিযোগে চাকুরীচ্যুত হবে। ফলে অর্থনীতিতে নেমে আসবে বিপর্যয়। বাংলাদেশ বঞ্চিত হবে কোটি কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা থেকে।
০পুরুষতন্ত্রের স্বার্থরক্ষক এই আইন কথায় কথায় নারীদের পাথর মেরে হত্যা করতে ও দুররা মারতে ধর্ম ব্যবসায়ীদের উৎসাহ যোগাবে। মধ্যযুগীয় বর্বর এই আইন নারীদের জীবনে ভয়াবহ দুর্ভোগ ডেকে আনবে। স্বামীর পদতলে নারীর বেহেসত এই ফতোয়া চালু করে নারীদের মূলত পুরুষদের কাছে জিম্মি করে ফেলা হবে।
০আধুনিক প্রগতিশীল শিল্প, সাহিত্য, চলμিচত্র, চারুকলা, ভাস্কর্য সবকিছুই ব্লাসফেমি আইনের কবলে পড়ে নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। কারণ এসব কিছুকেই কাঠমোল্লারা ধর্ম বিরোধী বলে দীর্ঘদিন যাবৎ চিহ্নিত করে আসছে। চারুকলা ও ভাস্কর্যকে মূর্তি পূজার সামিল হিসেবে চিহ্নিত করে এরা বার বার আক্রমণ করেছে।
০ব্লাসফেমি আইন খুব সহজে মুসলমান ছাড়া অন্য ধর্মাবলম্বীদের কোরআন বিরোধী হিসেবে আখ্যায়িত করে শাস্তি দিতে পারবে। বাংলাদেশে ইসলাম ছাড়াও বিভিন্ন ধর্ম ও বিশ্বাসের মানুষ যুগ যুগ ধরে সহাবস্থান করছে। কারণ ধর্ম বা যে কোনও বিশ্বাস হচ্ছে ব্যক্তিগত জীবনের ব্যাপার, এটা রাষ্ট্রীয় জীবনের সাথে যুক্ত নয়। কিন্তু ব্লাসফেমি আইন রাষ্ট্রের অংশে পরিণত হলে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে সংঘাত বাড়বে, সৃষ্টি হবে দাঙ্গা হানাহানি। নারী, পুরুষ, শিশুর রক্তে রঞ্জিত হবে বাংলাদেশ।
