ফরিদা রহমান, সাংসদ, বিএনপি
ঐসব আজেবাজে লেখা ছেড়ে দিয়ে তসলিমার মাফ চাওয়া উচিত। তারপর সাধারণ জীবনযাপন করা উচিত। উনি যা করেছেন তাতে জনগণের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে। ধর্মের প্রতি আমাদের অগাধ বিশ্বাস। তাই তাকে ক্ষমা চাইতে হবে। জনগণ যদি ক্ষমা করে তারপর আমরা সাধারণ মহিলারা যেভাবে জীবনযাপন করি সেভাবে তার জীবনযাপন করতে হবে।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, সাংসদ, গণতন্ত্রী পার্টি
হোল ড্রামা ইজ ক্রিয়েটেড বাই দ্য গভরমেন্ট।
ফরিদা রহমান আর সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর সঙ্গে আমার আলাপ নেই। ফরিদা রহমান বিএনপি দলের সবচেয়ে প্রগতিশীল মানুষ বলে সকলেই জানেন। যখন বিএনপির বড় বড় নেতা নেত্রীরা চুপ হয়ে আছেন মৌলবাদীদের উত্থানের পরও, ফরিদা রহমান ক্ষুব্ধ হয়ে দাবি জানিয়েছেন যে একাত্তরের ঘাতকদের বিশেষ ট্রাইবুনালে বিচার করতে হবে। তিনি মুসলিম পারিবারিক আইন সংশোধন দাবি করছেন। আমার বিশ্বাস যাঁরা আমার প্রসঙ্গে কোনও মন্তব্য করতে চাননি, তাঁরাও আমাকে হুমায়ুন আজাদের মত তুচ্ছ মনে করেন বলে চাননি মন্তব্য করতে। তাঁদের অনেককে আমি হয়ত এতকাল ভেবে বসেছিলাম যে আমাকে সমর্থন করেন, আমার যে কোনও বিপদে তাঁরা আমার পাশে থাকবেন।
ঝ এই মন্তব্যগুলো পড়ে খুব খুশি, বললেন, দেখেছো, তোমাকে কতজন সাপোর্ট করছে! তোমার আর চিন্তা কি!
এসময় প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের কেউ যে বলেননি যে আমার মুন্ডুটা কেটে নেওয়া উচিত সেটিই আমার সৌভাগ্য অবশ্য।
আজকের বাকি খবরগুলো হল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এস এম মুস্তাফিজুর রহমান বলেছেন হুলিয়া জারির পর তসলিমা আত্মগোপন করে আছে, আদালতে আত্মসমর্পণ করছে না, তার মানে সে এ দেশের আইন লঙ্ঘন করছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এ মন্তব্যটি ছাপা হয়েছে ফ্রান্সের ল মন্দ পত্রিকায়। আরেকটি খবর, ফ্রান্সে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আন্তর্জাতিক হেরাল্ড ট্রিবিউনে চিঠি লিখেছেন যে তসলিমা নাসরিন কোনও হয়রানির শিকার হননি বরং সরকার তাঁকে রক্ষার জন্য আইনের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। যেহেতু আমাকে নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে বিদেশের পত্রিকায়, বলা হচ্ছে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে বাংলাদেশের সরকার। তাই সরকারি আদেশে এখন বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোর কাজ হল খবরগুলোর প্রতিবাদ করা। এদিকে তাহফুজে হারমাইন পরিষদের সভাপতি মাওলানা সাদেক আহমেদ সিদ্দিকী সরকারকে সাবধান করে দিচ্ছেন এই বলে যে তসলিমা নরওয়ের সাহিত্যঅনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে, তাকে কিছুতেই যেন দেশ ছাড়তে দেওয়া না হয়। যদি এই সরকার তসলিমাকে দেশ ছাড়তে দেয়, তবে এই সরকারের সব্বনাশ করে ছাড়বে দেশের মানুষ। ২৯ তারিখের লং মার্চের আগে যে করেই হোক তসলিমাকে গ্রেফতার করার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানান মাওলানা।
মৌলবাদীদের নতুন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ১৩টি মৌলবাদী দল ও সংগঠনের সমন্বয়ে বায়তুল মোকাররমের খবিতের নেতৃত্বে গড়া সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ আগামী ২৯ তারিখ লং মার্চ করবে বলে বলেছে। শহরের সবচেয়ে প্রশস্ত রাস্তা মানিক মিয়া এভিনিউতে মহাসমাবেশ হবে, সারা দেশ থেকে লং মার্চ করে লোক আসবে এখানে। প্রথম এই লং মার্চের ঘোষণা দিয়েছিল খেলাফত মজলিশ। এখন লুফে নিচ্ছে অন্য দলগুলো।
এ কি খেলা শুরু হয়েছে দেশে! এ খেলার শেষ কোথায়! জানিনা কিছুই।
৩. অতলে অন্তরীণ – ৫২
পঁচিশ জুলাই, সোমবার
মৌলবাদীরা যেদিন প্রথম ব্লাসফেমি আইনের দাবি করেছে, আমি শিউরে উঠেছিলাম। কী ভয়ংকর দাবি। দেশের কজন মানুষ জানে এই আইন এলে কি রকম সর্বনাশ হবে দেশের। বেশির ভাগই জানে না। সেদিনই মনে মনে বলেছিলাম, আমার ফাঁসি হয় হোক, তবু ব্লাসফেমি আইনটি যেন পাস না হয় এ দেশে। আমার মৃত্যু হয় হোক, তবু দেশটি বেঁচে থাক, দেশের মানুষগুলো দুর্ভোগ না পোহাক। কাগজে আঁকিবুকি করতে করতে লিখেছিলাম, সংসদ ভবন থেকে সড়সড় করে নেমে এল একটি মস্ত অজগর/নগরের বড় রাস্তায় রাজার মত চলল, ডানে গেল, বামে গেল/অলিগলি ঘুরল আর মানুষ খেল/যে মানুষ সত্য বলে, তাকে/যে মানুষ সভ্যতা চায়, তাকে/ যে মানুষ নোংরা ঘাঁটে না, তাকে।/ অজগরের ক্ষিধে মেটে না তবু, সে এক নগর থেকে/আরেক নগরে গেল, বড় শহর থেকে ছোট শহরে,/ সেখানেও তাজা মাংসের স্বাদ পেল/যে মানুষ ছবি আঁকে, /যে মানুষ কবিতা লেখে,/ যে মানুষ গান গায়।/অজগর বিষম খুশি। সে এঁকে বেঁকে নেচে নেচে/গঞ্জে গ্রামে নদী হাওড় ক্ষেত খামার পেরিয়ে আরও খাদ্য পেল/যে কৃষক পাঁচবেলা লাঙল চালায়,/যে নারী মাঠে কাজ করে/যে রাখাল বাঁশি বাজায়।/খেতে খেতে পেট যখন ভরল অজগরের/তখন আর মানুষ নেই দেশে, কিছু কেবল শ্বাপদ আছে/শ্বাপদ আর অজগরে বেশ ভাব হল, তারা দীর্ঘ দীর্ঘকাল বেঁচে থাকল।
জামাতে ইসলামী ব্লাসফেমি এক্ট বিল পেশ করেছে সংসদে। এখন ভয়, দেশজুড়ে ব্লাসফেমি আইনের দাবি উঠছে, যদি সংসদে এই বিল পাস হয়েই যায়। কলাম লেখা চলছে এই আইন প্রণয়ন করার বিরুদ্ধে। আবদুল মতিন খান আজ চমৎকার একটি কলাম লিখেছেন ব্লাসফেমি আইনের ইতিহাস নিয়ে। —জ্ঞমধ্যযুগের ইওরোপের ব্লাসফেমি আইন যে কি রকম জঘন্য ছিল কি করে মানুষকে পুড়িয়ে মারা হত এবং এই আইনের বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহের ফলে গির্জার পুরোহিতদের অপকর্ম শেষ পর্যন্ত কি রকম ভাবে বন্ধ হল তা বর্ণনা করে শেষে বলেছেন, ইসলাম ধর্মে আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক সরাসরি। কে নেককার, কে গুনাহগার, তার বিচারের ভার আল্লাহ কারও ওপর ন্যস্ত করেননি। কে ধর্মদ্রোহী, কে নয় তার বিচার জামাতীদের আল্লাহ দেননি। কোনও সরকারকেও দেননি। ব্লাসফেমি আইন ইসলামী আদর্শের খেলাফ একটি আইন। ইসলামে যাজকতন্ত্র নেই, চার্চ নেই এবং মধ্যযুগের পোপের মত স্বর্গের চাবিওয়ালা কেউ নেই। প্রত্যেক মুসলমানের বেহেসতের চাবি তার নিজের হাতে। অনৈসলামিক ব্লাসফেমি আইন যারা প্রস্তুত করেছে তাদের সঙ্গে আর যাই হোক ইসলামের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই। থাকলে মধ্যযুগের খ্রিস্টান যাযকদের সঙ্গে আছে। মধ্যযুগীয় এ বর্বরতা এ দেশে কিছুতেই সহ্য করা হবেনা। সালাম, বরকত, জব্বার, রফিক শফিউদ্দিনের দেশে কিছুতেই এ আইন পাস হতে দেয়া হবে না। এ আইন যারা জারি করবে বলে ভেবেছে গণশত্রু হিসেবে তাদের বিচারের সম্মুখিন করা হবে। মধ্যযুগের চার্চের মত মানুষের জীবনের ওপর কাউকে সর্বেসর্বা হয়ে উঠতে দেয়া হবে না। হবে না। হবে না।’
