মৌলবাদী শক্তিগুলোর তৎপরতা খুবই সাময়িক তা তিনি বলেছেন বটে, কিন্তু তিনি নিজে জানেন যে তা সাময়িক নয়। বিএনপির মধ্যে দুটো দল আছে, একটি নরমপন্থী আরেকটি কট্টরপন্থী। দুদলে দ্বন্দ্ব চলছে। কট্টরদের দলটিতেই বেশি লোক। নরম বলছে মৌলবাদীদের হরতাল রোধ করতে, ওদের আস্কারা না দিতে। কট্টর বলছে হরতাল হচ্ছে হোক, রোধ করার প্রয়োজন নেই। তা না হয় হল, বিএনপি কোনওকালেই এমন কোনও আদর্শবাদী দল ছিল না, দলটি জন্মের শুরু থেকেই মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তির সঙ্গে আঁতাত করে গেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ চুপ করে আছে কেন এখন, প্রশ্নটি এখানেই। গতকাল প্রেসক্লাবের সামনে লেখক শিল্পীদের একটি সমাবেশে আওয়ামী লীগের সমালোচনা করা হয়। সমাবেশে শামসুর রাহমান বলেছেন, ফতোয়াবাজ, মৌলবাদী ও ফ্যাসিস্ট শক্তির আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য নারী সমাজ ও মুক্তচিন্তার অধিকারী শিল্পী সাহিত্যিকরা। এদের বিরুদ্ধে প্রত্যেক শিল্পীকে সতর্কতার সঙ্গে লড়াইয়ে নামতে হবে। ধর্মকে পুঁজি করে মৌলবাদীরা ক্ষমতায় যেতে চায়। তারা ক্ষমতায় গিয়ে দেশকে মধ্যযুগীয় অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে চায়। তারা আমাদের হত্যার হুমকি দিচ্ছে। তাই লেখক শিল্পীদের আজ চুপ করে বসে থাকলে চলবে না। এই লড়াইয়ে জয়ী হতেই হবে।..এই সরকার নিজেই মৌলবাদী। তাদের আচার আচরণ মৌলবাদীর মতই। যে দল স্বাধীনতার যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিল, আমাদের আশা সে দল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকবে ্এবং মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখবে। সেই দলের উদাসিনতার জন্য আজ মৌলবাদীরা ধরাকে সরা জ্ঞান করছে এবং মুক্তমতি লেখকদের ওপর হামলার পাঁয়তারা করছে। ফ্যাসিবাদী মৌলবাদী অশুভ শক্তিকে স্তব্ধ না করা হলে সামনে সমূহ সর্বনাশ। এই সংকট থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে। ফ্যাসিবাদী-মৌলবাদী অশুভ শক্তিকে স্তব্ধ করার জন্য প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
সৈয়দ শামসুল হকও ছিলেন সমাবেশে। বলেছেন, সরকারি বা বিরোধী দল কেউই লেখকের চিন্তা, বিজ্ঞানমনস্কতার স্বাধীনতার বিরুদ্ধাচারণকারীদের সম্পর্কে একটি কথাও বলেনি। যারা ক্ষমতায় যাবার এবং ক্ষমতায় থাকার রাজনীতি করছেন, তারা প্রকৃত অর্থে কাকে ক্ষমতাবান করছেন তা দেখতে হবে। সৈয়দ হাসান ইমাম বলেছেন, জামাত শিবির ফ্রীডম পার্টিসহ ধর্মব্যবসায়ীরা আমাদের বুদ্ধিজীবীদের নামে ফতোয়া জারি করেছে। অথচ সরকার নিশ্চেষ্ট নিষিক্রয় বসে আছে। ধর্মান্ধতার নামে তারা আবার রাস্তায় নেমেছে। মসজিদে মসজিদে অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং ফতোয়া দিচ্ছে। আওয়ামী লীগ খুব ভুল করছে এ সময়, তাদের জামাতের সঙ্গ ছেড়ে আসতে হবে এবং ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের উৎখাত করতে হবে। সমাবেশের ঘোষণায় বলা হয়, ১৯৭১ সালের ঘাতক দালাল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তি হতে হবে। প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক বীমা সহ সকল ক্ষেত্র থেকে তাদের অপসারণ করতে হবে। এদেরকে রাজনৈতিক সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। ধর্মকে রাজনীতি, সন্ত্রাস, খুন, নির্যাতন, কুৎসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে আইন প্রণয়ন করতে হবে। সকল নাগরিকের তার নিজস্ব ধর্ম পালনের পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কারও ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে কটাক্ষ করা কিংবা কাউকে ধর্মদ্রোহী কাফের আখ্যা দেওয়াকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ধর্মকে রাষ্ট্র ও রাজনীতির আওতা থেকে মুক্ত করতে হবে। সার্বজনীন পারিবারিক আইন চালু করতে হবে। সংবিধান অনুযায়ী সকল ক্ষেষেন নারী পুরুষের সমানাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। অভিন্ন, বিজ্ঞানভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক সার্বজনীন শিক্ষা চালু করতে হবে। লেখক সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে জারিকৃত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। লেখক শিল্পীর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, শিল্প সাহিত্য, সাংবাদিকতাসহ সৃজনশীল চিন্তাশীল সকল কাজের ক্ষেত্রকে প্রত্যক্ষ পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করতে হবে। চিন্তার প্রকাশ বাধামুক্ত হলে, মতের আদান প্রদান বিতর্কের সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করলেই কেবল সকলের পক্ষে সঠিক ও ভ্রান্তচিন্তাকে শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
মৌলবাদীরা কী করছে? তারা এখন ক্ষেপে আছে জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্লাউস কিনকেলের ওপর। জার্মানী এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। জার্মানীর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা পালন করবেন। ক্লাউস কিনকেল বলেছেন আমাকে যেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতগণ ভিসা দিয়ে বাংলাদেশ থেকে বের হওয়ায় সাহায্য করেন। মোল্লারা ক্রোধের চোটে লাফাচ্ছে এসব শুনে। মতিউর রহমান নিজামী জার্মান মন্ত্রী আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলানোর নিন্দা করেছেন। বলেছেন, যে মুহূর্তে এদেশের ধর্মপ্রাণ জনগণ ধর্মদ্রোহিতার শাস্তির দাবিতে সোচ্চার এবং জনগণের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অপরাধে তসলিমার বিরুদ্ধে সরকার দেশের আইন অনুযায়ী মামলা দায়ের করেছে সে সময় ইউরোপীয় ইউনিয়নের এ নির্দেশ শিক্ষা, সভ্যতা, গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। নিজামী বলেন, পশ্চিমা বিশ্ব কুখ্যাত সালমান রুশদির মত তসলিমাকেও আশ্রয় দেওয়ার পায়তারা করে তাদের ইসলাম বিরোধী চরিত্র পুনর্বার প্রকাশ করেছে। নিজামী ইউরোপীয় ইউনিয়নকে বাংলাদেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের আহবান জানান। এ দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলানো থেকে তাঁদের তিনি বিরত থাকতে বলেন। জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিন্দা কেবল জামাতে ইসলামী থেকে নয়, সব ইসলামী দল থেকেই চলতে থাকে।
